Published : 17 Aug 2026, 04:45 PM
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে শুরু হওয়া শক্তিশালী জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো’র প্রভাবে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিক গরম হয়ে উঠেছে। আর এর ফলে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছে সামুদ্রিক পাখি।
পেরু ও চিলির ঠান্ডা ও পুষ্টিওয়ালা জলসীমার বাসিন্দা এসব পাখি খাবারের খোঁজে চেনা আবাসস্থল ছেড়ে শত শত মাইল দূরে পানামা উপসাগরে এসে ভিড় জমাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
উষ্ণ পানির কারণে অ্যাঙ্কোভি ও সার্ডিনের মতো প্রধান শিকারি মাছ তাদের বিচরণক্ষেত্র ছেড়ে সমুদ্রের আরও গভীরে ও দূরে চলে গেছে। ফলে ক্ষুধা নিবারণে সামুদ্রিক পাখিও নিজেদের স্বাভাবিক সীমানা ছাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন, পানামার উপকূলে এসব পাখির উপস্থিতি থেকে ইঙ্গিত মেলে, সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ও খাবার সহজে না মেলার পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র কতটা সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ।
পাশাপাশি, পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বন্যপ্রাণীকে কতটা দ্রুত নিজেদের জীবনযাত্রা বদলাতে হয় তা-ও এ ঘটনা স্পষ্ট করেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের পানির পর্যায়বৃত্তিক তাপমাত্রা বেড়ে পাওয়ার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ‘এল নিনো’, যা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে ও তাপমাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
জাতিসংঘের আবহাওয়া বিভাগ আগে থেকেই সতর্ক করে বলেছিল, অগাস্ট থেকে শক্তিশালী এক এল নিনো আরও তীব্র রূপ নিতে পারে।
পানামা সিটির দৃষ্টিনন্দন স্কাইলাইনের ওপর দক্ষিণ আমেরিকার এসব সামুদ্রিক পাখির ঝাঁক বেঁধে ওড়া পাখিপ্রেমীদের জন্য বিরল দৃশ্য হলেও পরিবেশবিজ্ঞানীরা একে খাদ্যশৃঙ্খলে তৈরি হওয়া বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।
পানামার ‘অডুবন সোসাইটি’র পরিচালক রোসাবেল মিরো বলেছেন, “পাখিরা আমাদের আগেই বার্তা দিচ্ছিল, আমরা এক শক্তিশালী এল নিনোর মুখে পড়তে যাচ্ছি।”
আবহাওয়া পূর্বাভাসে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো গড়ে ওঠার সংকেত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গেল জুন মাস থেকে পাখিপর্যবেক্ষকরা এই অস্বাভাবিক অতিথিদের আনাগোনা লক্ষ্য করতে শুরু করেন।
পানামার দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত পানামা উপসাগরে নীল-পায়ের ‘বুবি’ পাখির দেখা মেলা একদম নতুন কিছু নয়। তবে পানামা সিটির এত কাছাকাছি এত পাখি এর আগে খুব কমই দেখা গেছে।
নাগরিক-বিজ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘ই-বার্ড’-এর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে রোসাবেল মিরো বলেছেন, জুন মাস থেকে ‘পিনিওন দে স্যান হোসে’ দ্বীপ ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৬০ থেকে ৪০০টি নীল-পায়ের বুবি পাখি দেখা গেছে।
এর আগে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের এল নিনোর সময় এ এলাকায় এদের সংখ্যা ছিল ২১ থেকে ২০০টির মধ্যে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের এল নিনোর সময় দেখা গিয়েছিল কেবল ৩ থেকে ৬২টি।
পাখিগুলোর এ স্থানান্তরকে সাধারণ কোনো ঋতুভিত্তিক ভ্রমণ বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। রোসাবেল মিরো বলেছেন, “এগুলো কোনো পরিযায়ী পাখি নয়। খাবারের তীব্র অভাবের কারণেই এরা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।”
তিনি বলেছেন, স্থানচ্যুতির ফলে এই পাখিদের ওপর যে অভিঘাত পড়ছে তা কেবল বাসস্থান বদলের মধ্যেই সীমিত নয়। অতীতের শক্তিশালী এল নিনো পর্বগুলোতে দেখা গেছে, খাবারের অভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগে এসব পাখির প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল এবং নতুন পাখির জন্ম দেওয়ার হার কমেছিল।
এল নিনোর প্রভাবে তলানিতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র
সমুদ্রের উপরিভাগে খাদ্যের যে সংকট দেখা যাচ্ছে তার সূচনা সুগভীর তলদেশ থেকে, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে গোড়াতেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ুর এ রূপান্তর সামুদ্রিক প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে।
‘স্মিথসোনিয়ান ট্রপিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর আবহাওয়া কেন্দ্র ও মহাসাগর পর্যবেক্ষণ সেন্সর নেটওয়ার্কের পরিচালক স্টিভেন প্যাটন বলেছেন, উদীয়মান এল নিনোর প্রভাবে পানামায় এরইমধ্যেই নজিরবিহীন চরম আবহাওয়া ও জলবায়ুগত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
“মে মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি মাসই আমাদের রেকর্ডভুক্ত ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বা দ্বিতীয় উষ্ণতম মাস হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।”
বছরের শেষ নাগাদ এই ধারাবাহিকতা থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, “আমাদের কাছে বিগত ৫০ বছরের তাপমাত্রার তথ্য ও ১০০ বছরের বৃষ্টিপাতের ডেটা রয়েছে। এমনটা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, এ পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ ও আশঙ্কাজনক।”
পানামা খাল অববাহিকার বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে নিচে নেমেছে। একইসঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, এ বছরের শেষ ও সম্ভবত আগামী বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই দাবাদাহ ও শুষ্ক পরিস্থিতি থাকবে।
প্যাটন বলেছেন, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে ‘থার্মোক্লাইন’ বা সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণ পানিকে নিচের শীতল ও পুষ্টিওয়ালা পানি থেকে আলাদা করে রাখে এর গভীরতা আরও বেড়ে যায়। ফলে তলদেশের সেই পুষ্টিওয়ালা ঠান্ডা পানি আর সহজে উপরে উঠে আসতে পারে না, যা সার্বিক সামুদ্রিক উৎপাদনশীলতাকে এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমিয়ে দেয়।
উষ্ণ হয়ে ওঠা বৈশ্বিক জলবায়ু কীভাবে এল নিনো প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্যাটন বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি ‘এল নিনো-লা নিনা’ চক্রকে বদলে দিচ্ছে কি না সে বিষয়ে এখনও বিজ্ঞানীরা একমত হতে পারেননি।
তবে তিনি বলেছেন, ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর বেশ কয়েকটি ঘটেছে বিগত কয়েক দশকের মধ্যেই।
ইতিবাচক দিক হচ্ছে, সাগরের পরিস্থিতি পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে পানামার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ভিড় জমানো এসব বিরল সামুদ্রিক পাখি ঠিক যেমন হঠাৎ এসেছিল তেমনই আবার অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।