টাইপিংয়ের চেয়ে হাতে লেখায় মস্তিষ্ক সংযোগ বেশি হয়: গবেষণা

শিক্ষার্থীরা যখন হাত দিয়ে লেখে তখন মস্তিষ্কের সামনের অংশ ও মস্তিষ্কের অস্থায়ী অংশগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘটেছে, যেটি মস্তিষ্কের মেমোরি বা স্মৃতি সংশ্লিষ্ট অংশ।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Jan 2024, 10:22 AM
Updated : 29 Jan 2024, 10:22 AM

হাতে লেখার চেয়ে টাইপিং অনেক দ্রুত করা গেলেও এটা মস্তিষ্কে কম উদ্দীপনা তৈরি করে থাকে — এমনই উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।

গেল শুক্রবার গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পিয়ার-রিভিউড জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’তে।

গবেষণায় ৩৬ জন শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করেন ‘নরওয়েইজিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এনটিএনইউ)’র গবেষকরা। হাতে লেখার মাধ্যমে মানুষ নিজের শেখার ক্ষমতার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তিরও উন্নতি ঘটাতে পারে বলে তারা গবেষণায় দেখেছেন।

শুরুতে শিক্ষার্থীদের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা যেন ডিজিটাল কলমের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক ডিভাইসের স্ক্রিনে ‘টাচ’ করে শব্দ লেখেন ও কিবোর্ডের মাধ্যমে একই শব্দ টাইপ করেন।

তাদের স্ক্রিনে ‘ফরেস্ট’ বা ‘হেজহগ’-এর মতো বিভিন্ন শব্দ ভেসে ওঠার পর তারা সেগুলো একাধিকবার লিখতে ও টাইপ করতে ২৫ সেকেন্ড সময় পাবেন।

এ ছাড়া, শিক্ষার্থীদের মাথায় একটি সেন্সর ক্যাপও পরানো হয়, যার কাজ ছিল, শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ পরিমাপ করা। এ ক্যাপের ২৫৬টি ইলেক্ট্রোড শিক্ষার্থীদের মাথার ত্বকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা তাদের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত রেকর্ড করেছে।

এর মাধ্যমে দেখা যায়, কীভাবে শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষ সক্রিয় হয় ও কীভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে।

“গবেষণায় আমাদের মূল প্রাপ্তি হচ্ছে, হাতে লেখার ক্ষেত্রে তাদের মস্তিষ্কের প্রায় পুরো অংশই সক্রিয় ছিল। সে তুলনায় টাইপরাইটিংয়ের বেলায় এমন খুব কমই ঘটেছে। আর হাত দিয়ে অক্ষর তৈরি করার চেয়ে কীবোর্ডে টাইপিং বেশি চ্যালেঞ্জিং, বিষয়টি এমনও নয়,” বলেন এ গবেষণার সহ-লেখক ও ‘এনটিএনইউ’র নিউরোসাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক অড্রে ভ্যান ডের মির।

এ গবেষণায় বিশেষ করে দেখা গেছে, হাতে লেখার জন্য মস্তিষ্কের তিনটি অংশ যেমন- ভিজ্যুয়াল, সেন্সরি ও মোটর কর্টিসের মধ্যে যোগাযোগ ঘটাতে হয়। যেসব শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল কলম দিয়ে লিখেছেন, তাদেরকে অক্ষরগুলো লিখতে আগে থেকেই কল্পনা করতে হয়েছে। পরবর্তীতে, লেখার সময় তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করতে হয়েছে মস্তিষ্কের ‘মোটর’ অংশের দক্ষতা।

“কেউ যখন হাতে একটি অক্ষর লিখবেন, তখন ‘এ’ অক্ষর লেখার ধরন ‘বি’ অক্ষর লেখার ধরনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখাবে। পাশাপাশি, এটি লিখতে তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পন্থাও অবলম্বন করতে হয়,” বলেছেন ভ্যান ডের মির।

এর বিপরীতে টাইপিংয়ের সময় বেশিরভাগ অক্ষরই একই রকম দেখায়। ফলে গবেষণায় দেখা যায়, টাইপিংয়ের জন্য মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল ও ‘মোটর কর্টিস’ অংশে কম যোগাযোগের প্রয়োজন হয়।

“কারণ টাইপরাইটিংয়ের সময় মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র অংশ সক্রিয় থাকে। ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না।”

এর আগে শিশু ও তরুণদের নিয়ে ভ্যান ডের মিরের আরেক গবেষণায় একইভাবে দেখা গেছে, টাইপিংয়ের চেয়ে হাতে লেখার সময় মানুষের মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয় থাকে। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি’র ওই গবেষণা থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল ও মোটর অংশের দক্ষতার মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে, যা শিশুর অক্ষর চেনার ক্ষেত্রেও সহায়ক।

কাগজে নোট নেওয়া বা ল্যাপটপে টাইপিং— কোনটা শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষের পাঠ ভালভাবে মনে রাখতে, বুঝতে বা পরীক্ষায় কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত খুবই মিশ্র প্রমাণ মিলেছে।

এ গবেষণার সঙ্গে জড়িত না থাকলেও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া মার্সেড’-এর স্নায়ুবিজ্ঞানি রামেশ বালাসুব্রামানিয়াম বলেছেন, নতুন গবেষণার মস্তিষ্কবিষয়ক তথ্য বাস্তব জীবনে শেখার বা স্মৃতি ধরে রাখার মতো আচরণ উন্নত করবে কি না, তা বলা জটিল।

এ গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা যখন হাত দিয়ে লেখে তখন মস্তিষ্কের সামনের অংশ ও মস্তিষ্কের অস্থায়ী অংশগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘটেছে, যা মস্তিষ্কের মেমোরি বা স্মৃতি সংশ্লিষ্ট বিষয়।

তবে ‘হাতের লেখা ও টাইপ করা বিষয়াদি থেকে অংশগ্রহণকারীরা কী কী বিষয় মনে রেখেছেন’, সে সম্পর্কে ভবিষ্যতের কোনো গবেষণায় আরও তথ্য মিলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যের একাডেমিক শিক্ষাক্রমে শিশুদের কিন্ডারগার্টেন ও প্রথম শ্রেণিতে হাতের লেখা শেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরকে টাইপিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা জুড়ে দেওয়া হয়।

“শিশুদেরকে এখন হাতের লেখা শেখানো হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তবে শিক্ষার্থীরা আসলে কী পরিমাণ হস্তাক্ষর ব্যবহার করে তা নির্ভর করে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ ও এর পর তারা কোন ক্লাসে উঠবে সে প্রত্যাশার ওপর,” বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউএসসি রসিয়ার স্কুল অফ এডুকেশন’-এর শিক্ষা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মরগান পোলিকফ।

তিনি আরও যোগ করেন, শিশুদের এক অংশের কাছে বেশি সুবিধাজনক হতে পারে হাতে লেখা।

“কিছু সংখ্যক শিশুর হয়ত মস্তিষ্কের ‘মোটর’ অংশে সমস্যা রয়েছে। তাই তাদের জন্য হাতে লেখা চ্যালেঞ্জিং বিষয় হবে।” অন্যদিকে, “হাতে লেখা ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বেশি সুবিধা দেয়, এমন প্রমাণও মিলেছে।”

এদিকে, শিশুদের ‘কার্সিভ’ মুদ্রণ বা টানা হাতে লেখা নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখেও পড়তে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু স্কুলকে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর একটি আইন পাস করেছে ক্যালিফোর্নিয়া, যেখানে পাবলিক স্কুলের শিক্ষকদেরকে প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের টানা হাতে লেখা শেখানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পোলিকফের অনুমান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি অঙ্গরাজ্যে শিক্ষার্থীদের টানা হাতে লেখা শেখানোর শর্ত রয়েছে।

তবে, কার্সিভ মুদ্রণে বা টানা হাতে লেখা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে অতিরিক্ত সুবিধা দেয় কি না, সে সম্পর্কে ধারণা নেই বিজ্ঞানীদের।