Published : 11 Jan 2026, 03:25 PM
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিযোগিতার কথা উঠলে প্রথমেই মাথায় আসে ডেটা সেন্টারের মূল ভিত্তি বা জিপিইউ চিপ নির্মাতা মার্কিন কোম্পানি এনভিডিয়া ও টিএসএমসি’র নাম। এসব কোম্পানির কারখানায় মূলত চিপ তৈরি হয়। এরপর রয়েছে স্যামসাং, মাইক্রন ও এসকে হাইনিক্স-এর মতো কোম্পানি। সাধারণত মেমোরি চিপ সরবরাহ করে এসব কোম্পানি।
সম্প্রতি নিজস্ব টিপিইউ চিপের কারণে এই দৌড়ে শক্তিশালী নাম হিসেবে উঠে এসেছে গুগলও।
অনেকেই নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি এএসএমএল সম্পর্কে খুব একটা জানেন না। অথচ কোম্পানিটি আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বের প্রতিটি অত্যাধুনিক চিপের মেরুদণ্ড বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
এএসএমএল এমন উন্নত ‘লিথোগ্রাফি মেশিন’ তৈরি করে, যা সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এরাই বিশ্বের একমাত্র কোম্পানি যারা সবচাইতে আধুনিক ইইউভি লিথোগ্রাফি মেশিন সরবরাহ করে।
ঠিক এখান থেকেই বিষয়টিতে যোগ হচ্ছে নতুন রোমাঞ্চ।
এএসএমএল চাইলেই এসব উন্নত মেশিন চীনের কাছে বিক্রি করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নানা ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যাতে এআই দৌড়ে শীর্ষে থাকার জন্য উন্নত চিপের মতো অত্যন্ত জরুরি মৌলিক বিভিন্ন প্রযুক্তি চীনের হাতে না যায়। একই লক্ষ্যে এনভিডিয়া চিপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার বিক্রির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে দমে যায়নি চীন। আগে থেকেই অনেক পরিমাণে পুরানো চিপ সংগ্রহ করে রেখেছিল দেশটি এবং কিছু ক্ষেত্রে অবৈধভাবে চিপ পাচারও করে এনেছে। ফলে শত বাধার মধ্যেও ডিপসিক ও কোয়েন-এর মতো বিশ্বের সেরা মানের এআই মডেল তৈরি করতে পেরেছে চীন।
এ ছাড়া হুয়াওয়ের সাম্প্রতিক সাফল্য, বিশেষ করে তাদের তৈরি ‘কিরিন’ চিপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চীন এবং দেশটির স্থানীয় বিভিন্ন সেমিকন্ডাক্টর স্টার্টআপের উত্থানও বিশ্বজুড়ে নতুন উদ্বেগের তৈরি করেছে।
বাণিজ্যিক বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা চীনের উন্নতিকে খুব একটা দমাতে পারেনি। আসল ভয়ের কারণ হচ্ছে চিপ তৈরির ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতি। আর এখানেই এএসএমএল-এর প্রসঙ্গটি চলে আসে। কারণ, চীন যেসব মেশিন দিয়ে চিপ তৈরি করছে সেগুলোর একমাত্র সরবরাহকারী এএসএমএল।
তাত্ত্বিকভাবে এএসএমএল-এর এসব যন্ত্রপাতি যদি আটকে দেওয়া যায় তবে চীনের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে এসে থমকে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হয়নি।
আসল চিপ যুদ্ধ
রয়টার্স প্রতিবেদনে লিখেছে, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরিতে সক্ষম এমন এক মেশিনের প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক সংস্করণ তৈরি করেছেন চীনা বিজ্ঞানীরা, যা বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। মেশিনটি এমন একটি দল তৈরি করেছে, যেখানে এএসএমএল-এর সাবেক প্রকৌশলীরাও রয়েছেন।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, “চীনের মেশিনটি চালু হয়েছে ও সফলভাবে এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট বা ইউইভি আলো তৈরি করতে পেরেছে। তবে তা দিয়ে এখনও ব্যবহারযোগ্য চিপ তৈরি সম্ভব হয়নি।”
তাদের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্যকর এক চিপ তৈরি করা, যা বিশ্লেষকদের ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত। কারণ বিশ্লেষকদের অনুমান, চিপ প্রযুক্তিতে চীন এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
গোপন এ প্রজেক্টটিকে চীনের নিজস্ব ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
ম্যানহাটন প্রজেক্ট হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার পামাণবিক বোমা তৈরির সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগ। এএসএমএল-এর বেশ কয়েকজন সাবেক বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী প্রজেক্টে আছেন। পুরো বিষয়টি এতই গোপনীয়তায় ঘেরা যে, এখানকার কর্মীদের ছদ্মনাম বা ভুয়া পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং তাদের কঠোর নজরদারির ওপরও রাখা হয়।
দুই বছর আগে খবর বেরিয়েছিল, এএসএমএল-এর একজন কর্মী প্রযুক্তিগত গোপন তথ্য চুরি করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এএসএমএল-এর ওই প্রবাসী কর্মীই ‘রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কোনো যন্ত্র খুলে তার ভেতরের কৌশল বোঝার মাধ্যমে ইউইভি ও ডিইউভি মেশিনের প্রযুক্তি রপ্ত করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত চীনকে কার্যকরী এক প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেল তৈরিতে সাহায্য করেছে।
এএসএমএল থেকে দক্ষ কর্মীদের ভাগিয়ে এনে এই গোপন প্রজেক্টে যোগ করতে মোটা অংকের অর্থ ও আবাসন সুবিধার প্রলোভন দিয়েছে চীন সরকার। স্থানীয় মেধাবীদের জন্য বেতনের কোনো নির্দিষ্ট সীমা রাখা হয়নি, অর্থাৎ আকাশচুম্বী বেতন দেওয়া হচ্ছে তাদের এবং গবেষণার জন্য ৫ লাখ ডলার পর্যন্ত অনুদান দিচ্ছে চীন। এই প্রজেক্টের কাজ মূলত এএসএমএল-এর পুরানো বিভিন্ন মেশিন সংগ্রহ করে সেগুলোর অভ্যন্তরীণ কারিগরি কৌশল বা ‘রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা।
ফাইনান্সিয়াল টাইমসের ভিন্ন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এএসএমএল-এর সরবরাহ করা পুরানো বিভিন্ন মেশিনকে উন্নত করছে চীনের চিপ তৈরির কোম্পানি এসএমআইসি ও হুয়াওয়ে।
চীনা বিজ্ঞানীদের তৈরি এ প্রাথমিক মেশিনটি কার্যকারিতার দিক থেকে কিছুটা ‘অপরিণত’ ও আকারে সাধারণ এএসএমএল মেশিনের চেয়ে অনেক বড়। এ মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ প্রায়ই পরিচয় গোপন করে নিলাম বা সেকেন্ড-হ্যান্ড মার্কেট থেকে কেনা হয়। আর এ পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে হুয়াওয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এরপর কী?
চীনের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এ হুয়াওয়ের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কালো তালিকাভুক্ত হওয়া ও ব্যবসায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও কেবল ঘুরেই দাঁড়ায়নি, দ্রুত উন্নতিও করে চলেছে কোম্পানিটি।
কোয়ালকম বা ইনটেল প্রসেসর ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘কিরিন’ চিপ ও নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘হারমোনি’ ব্যবহার করে উন্নত মানের ফোন ও ল্যাপটপ বাজারে আনছে হুয়াওয়ে।
এ ছাড়া, হুয়াওয়ের নিজস্ব ‘অ্যাসেন্ড’ নামের এআই চিপ ডিপসিক আর-১-এর মতো বিভিন্ন এআই মডেলে চালানোর ক্ষেত্রে এনভিডিয়ার এআই চিপের চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স দিচ্ছে।
এনভিডিয়ার ‘এনভিলিংক’-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ‘সুপারপড কানেক্ট’ তৈরি করেছে হুয়াওয়ে। হাজার হাজার কম্পিউটিং ইউনিট ও চিপকে একে অপরের সঙ্গে যোগ করে এআই ট্রেনিংয়ের মতো কঠিন কাজে নিজেদের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়েছে কোম্পানিটি।
তবে শিল্প পর্যায়ে বড় পরিসরে চিপের উৎপাদন শুরু করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। কারিগরি ও যন্ত্রাংশের সরবরাহে নানা বাধা থাকার পরও এএসএমএল-এর ডিইউভি মেশিনগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিকল্প পথ খুঁজে বের করেছেন চীনা বিজ্ঞানীরা।
এরইমধ্যে ‘কোয়াড্রপল প্যাটার্নিং’ নামের এক নতুন প্রযুক্তির পেটেন্ট করেছে হুয়াওয়ে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে এএসএমএল-এর অত্যাধুনিক ইইউভি মেশিনের বদলে পুরানো ডিইউভি মেশিন ব্যবহার করেই ২-ন্যানোমিটার চিপ তৈরি করা সম্ভব, যা বর্তমানে এআই ও কম্পিউটিং চিপ তৈরির সবচেয়ে উন্নত উপায়।
তবে আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এসব পরিকল্পনা কত দ্রুত সত্যিকারের চিপ তৈরি করতে পারবে এবং তার চেয়েও বড় কথা বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে তা উৎপাদন করা যাবে কি না।