Published : 07 Dec 2025, 04:31 PM
১৮ হাজারের বেশি বৃদ্ধ মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছেন তাদের বাসা থেকে। তারা আর ফেরেননি। এর মধ্যে পাঁচশ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। সংক্ষেপে এই হচ্ছে জাপানের ডিমেনশিয়ার ভয়াবহতা।
নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১২ সালের পর থেকে এমন ঘটনার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
জনসংখ্যা কমে যাওয়া আর বিদেশি কর্মী আনার সীমাবদ্ধতার কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। জাপান সরকার ডিমেনশিয়াকে এখন সবচেয়ে জরুরি নীতিগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসাবে দেখছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হিসাব করে বলেছে, ২০৩০ সালে ডিমেনশিয়া সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার ব্যয় দাঁড়াবে ১৪ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার।
সর্বশেষ পরিকল্পনায় দেশটির সরকারের এ বিপদের প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধানের দিকে জোর দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
দেশের নানা অঞ্চলে পরিবারগুলো জিপিএসভিত্তিক সিস্টেম ব্যবহার করছে। এর ফলে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত কেউ নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়লেই স্থানীয় প্রশাসন খেবর পেয়ে যায়। কিছু শহরে খুচরা পণ্যের দোকান কর্মীরাও সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ট পায়। এর ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হারানো মানুষকে খুঁজে পাওয়াও গেছে।
রোবট তত্ত্বাবধায়ক ও এআই
প্রযুক্তির আরেক দিক আগেভাগে রোগ শনাক্ত করা। ফুজিৎসুর ‘এআইগেইট’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভঙ্গি আর হাঁটার ধরন বিশ্লেষণ করে ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ ধরে। যেমন হাঁটার সময় পা টেনে নেওয়া, ধীর শরীর ঘোরানো বা দাঁড়াতে কষ্ট হওয়া।
ডাক্তাররা নিয়মিত চেকআপে এই ডেটা দেখে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারেন। ফুজিৎসুর মুখপাত্র হিদেনোরি ফুজিওয়ারা বললেন, “বার্ধ্যক্যজনিত রোগ আগেভাগে শনাক্ত করাই মূল চাবিকাঠি। চিকিৎসকেরা যদি মোশন-ক্যাপচার ডেটা ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া যায় আর মানুষকে আরও দীর্ঘ সময় সক্রিয় রাখা যায়।”
ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা তৈরি করছেন ‘আইরেক’ নামের দেড়শ কেজি ওজনের মানবাকৃতির রোবট, যেটাকে ভবিষ্যতের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এটি মোজা পরানো, ডিম ফেটানো, জামাকাপড় ভাঁজ করার মতো কাজে সাহায্য করে। গবেষকেরা আশা করছেন ভবিষ্যতে এটি ডায়াপার বদলানো বা বেডসোর প্রতিরোধ করতেও পারবে।
এরইমধ্যে বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে ছোট রোবট সঙ্গীত শোনানো বা হালকা ব্যায়ামের নির্দেশনা দেওয়ার কাজ করছে। কিছু রোবট আবার রাতে রোগীদের বিছানার নিচে থেকে ঘুম আর নড়াচড়ার তথ্য নেয়, ফলে কর্মীদের বারবার রাউন্ড দেওয়া লাগে না।

ওয়াসেদার সহকারী অধ্যাপক তামন মিয়াকি বললেন, “এর জন্য পুরো শরীর সেন্সিং আর অভিযোজিত বোঝাপড়ার ক্ষমতা লাগে, প্রতিটি মানুষ আর পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ বদলাতে জানতে হয়।” সেইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, মানুষের সঙ্গে নিরাপদে কাজ করতে সক্ষম উন্নত রোবট পেতে আরও অন্তত পাঁচ বছর লাগবে।
একা মানুষদের জন্য সঙ্গী রোবট
মানসিক সাপোর্টের দিকেও কাজ হচ্ছে। ১২ সেন্টিমিটার লম্বা ‘পোকিতমো’ নামের ছোট রোবট ব্যাগে বা পকেটে রাখা যায়। এটি ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়, বাইরে আবহাওয়া অনুযায়ী কীভাবে প্রস্তুত হতে হবে বলে দেয় আর একা থাকা প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে।
প্রযুক্তি কোম্পানি শার্প–এর উন্নয়ন ব্যবস্থাপক মিহো কাগেই বললেন, “আমরা সামাজিক সমস্যাগুলো সামনে রেখে কাজ করছি আর নতুন প্রযুক্তি দিয়ে সেগুলোর সমাধান খুঁজছি।”
তবে মানবিক সম্পর্কের জায়গা প্রযুক্তি এখনও নিতে পারছে না। মিয়াকি মনে করিয়ে দিলেন, “রোবট মানুষের বিকল্প নয়, তারা শুধু সাহায্যকারী। তারা কিছু কাজ ভাগ করে নেবে, আর তত্ত্বাবধায়ক ও রোগী দুজনেই তাদের সহায়তা থেকে উপকৃত হবে।”
এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কমিউনিটির ভূমিকা
টোকিওর সেঙ্গাওয়ায় আকিকো কান্না’র তৈরি করেছেন ভুলভাল অর্ডারের এক রেস্তোরাঁ। এখানে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত লোকজন খাবার পরিবেশন করেন। কানা নিজের বাবার অভিজ্ঞতা থেকে জায়গাটি তৈরি করেন, যেখানে প্রবীণরা এখনো কাজে যুক্ত থাকতে পারে।
তোসিও মরিতা নামের একজন সার্ভার ফুল ব্যবহার করে মনে রাখেন কোন টেবিলে কী অর্ডার গেছে। জ্ঞানীয় সমস্যা বাড়লেও তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসেন। তার স্ত্রী বলেন, এই ক্যাফে তাকে স্বস্তি দেয় আর মরিতাকে সক্রিয় রাখে।
এই ক্যাফে দেখিয়েছে যে প্রযুক্তি সহায়তা দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সংযোগ আর অংশগ্রহণই ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের জীবনের আসল ভরসা। নিজের ভাষায় মরিতা বললেন, “সত্যি বলতে কি, আমি একটু পকেটমানি চেয়েছিলাম। আর নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার ভালো লাগে। প্রত্যেকে আলাদা, আর এটিই আসলে সবকিছুকে আরও আনন্দদায়ক করে।”