Published : 20 Apr 2026, 11:59 AM
মানুষ কেন কাঁদে—এই প্রশ্নের উত্তর চার্লস ডারউইনের কাছে ছিল এক উদ্দেশ্যহীন ধাঁধা। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, কান্না কেবল দুঃখের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে অন্যের আচরণ বদলানো যায়।
বিজ্ঞানীরা বলেন, কান্না মানুষের বিবর্তনের এক অদ্ভুত ‘সামাজিক প্রযুক্তি’, যা মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
১৮৭২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য এক্সপ্রেশন অফ দ্য ইমোশনস ইন ম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যালস’ বইতে চার্লস ডারউইন মানুষের আবেগের এই প্রকাশকে ‘উদ্দেশ্যহীন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি কান্নাকে ‘এপিফেনোমেনন’ বা নিছক জৈবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন। আচরণের প্রায় সব কিছুতেই অর্থ খুঁজে পাওয়া এই বিজ্ঞানীর কাছে কান্না ছিল ব্যতিক্রম।
দেড়শ বছর পর সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই পরিষ্কার। আর সেটি ডারউইনের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল বলে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লিখেছে ফোর্বস ম্যাগাজিন।
বিবর্তনের দৃষ্টিতে কান্না প্রথম দেখায় অযৌক্তিক মনে হয়। এটি দৃষ্টি ঝাপসা করে, দুর্বলতার সংকেত দেয়, এবং সরাসরি কোনো কাজেও লাগে না।
তারপরও কান্না সার্বজনীন। ইতিহাসের প্রতিটি নথিবদ্ধ মানব সংস্কৃতিতেই কান্নার উপস্থিতি রয়েছে। লাখ লাখ বছর ধরে এবং নানা সামাজিক পরিবেশে কান্নার টিকে থাকা কাকতালীয় নয়।
২০১৮ সালে ‘হিউম্যান নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, কান্না আসলে একটি বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এটি শব্দ, দৃশ্য ও রাসায়নিক সংকেত—সব মিলিয়ে কাজ করে।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষের চোখের পানি শুধু আবেগ প্রকাশের জন্য নয়, বরং আশপাশের মানুষের আচরণ প্রভাবিত করার জন্যও বিবর্তিত হয়েছে।
কান্নার শুরু হয়েছিল সাহায্যের সংকেত হিসেবে
কান্নার বিবর্তনীয় ইতিহাস শুরু হয়েছে শোক দিয়ে নয়; বরং ক্ষুধা, শীত বা ভয়ের মতো মৌলিক চাহিদা থেকে। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, এর শুরু শিশুর মাধ্যমে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে শাবক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তারা এক ধরনের ‘ডিসট্রেস ভোকালাইজেশন’ বা যন্ত্রণার আওয়াজ তোলে। এই সংকেতের মূল কাজ হলো সন্তান ও যত্নকারীর মধ্যকার দূরত্ব কমানো।
২০১৮ সালের ‘হিউম্যান নেচার’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের শিশুকালের কান্না সরাসরি এই বৈশিষ্ট্য থেকেই বিবর্তিত হয়েছে। এটি এক ধরনের পরিবর্তনশীল শব্দ সংকেত, যার তীব্রতা ও স্বর প্রয়োজন অনুযায়ী ওঠানামা করে এবং প্রয়োজনের গুরুত্ব বোঝাতে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
এই সংকেত সফল হওয়ার কারণ হলো, শিশু ও যত্নকারী উভয়েরই বিবর্তনীয় স্বার্থ এর সঠিকতার ওপর নির্ভর করে। সংকেত মিথ্যা হলে তা উপেক্ষিত হয়, আর সত্য হলে সাড়া পাওয়া যায়।
মানবীয় সামাজিক বিবর্তনের দীর্ঘ পথে এই সংকেত ধীরে ধীরে শৈশবের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দৃশ্যমান উপাদান—চোখের পানি গড়িয়ে পড়া, ঠোঁট কাঁপা, অসহায় ভঙ্গি। ফলে এটি আরও জটিল ও শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থায় রূপ নেয়।
আবেগপ্রবণ কান্নার ‘সামাজিক প্রযুক্তি’
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কাঁদলে আশপাশের মানুষ তার প্রতি ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। সহমর্মিতা বাড়ে, আক্রমণাত্মক মনোভাব কমে। এতে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
গবেষণাগুলো বলছে, চোখের পানি এক ধরনের ‘প্রোসোশাল সিগন্যালিং মেকানিজম’ বা সামাজিক সংকেত হিসেবে কাজ করে। এটি এমন বার্তা দেয়, যা সহজে নকল করা যায় না এবং বিশ্বাসযোগ্য।
কান্নার ভাষায় মানুষের মুখে যেন লেখা থাকে: “আমি কোনো হুমকি নই, আমার সাহায্য দরকার, এবং আমি আপনাকে এতটাই বিশ্বাস করি যে আপনার সামনে এই দুর্বলতা প্রকাশ করছি।”
‘পিএনএএস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেউ অন্য কাউকে কাঁদতে দেখলে উভয়ের মস্তিষ্কের একই অংশ সক্রিয় হয়। সহমর্মিতার সঙ্গে সম্পর্কিত ‘মিরর নিউরন নেটওয়ার্ক’ চোখের পানি দেখলে বিশেষভাবে সাড়া দেয়।
বিবর্তনের এক পর্যায়ে চোখের পানি এমন এক সংকেতে পরিণত হয়েছে, যা অন্যের মনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহানুভূতি জাগায়। পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল প্রজাতির জন্য এটি ছিল বড় সুবিধা।
তবে এর একটি কঠোর দিকও আছে। কান্না নতি স্বীকারের সংকেত হিসেবেও কাজ করে। সাদা পতাকা ওড়ানো বা খালি হাত দেখানোর মতোই এটি বোঝায়, ব্যক্তি আক্রমণাত্মক মনোভাব ছেড়ে দিয়েছেন।
দ্বন্দ্বের পরিস্থিতিতে কান্না এমনভাবে উত্তেজনা কমাতে পারে, যা অনেক সময় কথায় সম্ভব নয়। ফলে সংঘাত থামাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আবেগপ্রবণ কান্নার প্রাণরসায়ন
বিজ্ঞান এখানে আরও চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছে।
২০১১ সালে ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, আবেগজনিত চোখের পানিতে গন্ধহীন রাসায়নিক সংকেত থাকে। মানুষ সচেতনভাবে গন্ধ না পেলেও ঘ্রাণতন্ত্র তা শনাক্ত করতে পারে।
২০২৩ সালে ‘পিএলওএস বায়োলজি’-তে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষ অংশগ্রহণকারীরা অজান্তে এই চোখের পানির সংস্পর্শে এলে তাদের আক্রমণাত্মক আচরণ প্রায় ৪৩.৭ শতাংশ কমে যায়।
মস্তিষ্কের চিত্রায়ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় ঘ্রাণতন্ত্র ও আগ্রাসন-সম্পর্কিত স্নায়বিক নেটওয়ার্কের মধ্যে সংযোগ বেড়ে যায়, যা আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দমন করে।
রাসায়নিক দিক থেকেও আবেগপ্রবণ চোখের পানি আলাদা। এতে প্রোল্যাক্টিন, অ্যাড্রেনোকোর্টিকোট্রপিক হরমোন, লিউ-এনকেফালিন, পটাশিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা বেশি থাকে।
এই উপাদানগুলো অন্য ধরনের চোখের পানিতে থাকে না। ফলে চোখের পানি মানুষের অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থার এক ধরনের আণবিক ছাপ বহন করে, যা ‘সৎ সংকেত’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এই গবেষণা ক্ষেত্র এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়। কিছু ফলাফল পুনরায় পরীক্ষায় পুরোপুরি মেলেনি, যদিও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আরও শক্ত প্রমাণ দিচ্ছে।
জীববিজ্ঞান ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব
চোখের পানি এত কার্যকর হলে মানুষ তা চেপে রাখে কেন?
এর কারণ সামাজিক রীতি। অনেক পেশাগত পরিবেশে কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।
তবে বিজ্ঞান বলছে, কান্না একটি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি কাঁদেন—এমন প্রমাণ রয়েছে। এর পেছনে হরমোন ও সামাজিক প্রভাব কাজ করে।
তবে কান্নার জৈবিক সক্ষমতা সবার ক্ষেত্রেই একই। পার্থক্য শুধু এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতায়।
মানুষ কেবল বাস্তব কারণে নয়, শিল্পের কারণেও কাঁদে। সিনেমা, গান বা উপন্যাসেও চোখ ভিজে ওঠে। অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে এমন আচরণ দেখা যায় না।
গবেষণা বলছে, বাস্তব জীবনের যন্ত্রণার সংকেত দেওয়ার জন্য তৈরি এই ব্যবস্থা শিল্পের ক্ষেত্রেও সক্রিয় হয়।
অর্থাৎ, শিল্প সেই একই আবেগের ভাষায় কথা বলে, যা বিবর্তন আমাদের মধ্যে তৈরি করেছে।
কেন কান্না টিকে রইল
কান্না একাধিক কাজে লাগে বলেই এটি টিকে আছে।
এটি যন্ত্রণার শব্দ, সহমর্মিতার দৃশ্যমান সংকেত, আগ্রাসন কমানোর উপায়, সামাজিক বন্ধন গড়ার মাধ্যম এবং রাসায়নিক বার্তা—সব একসঙ্গে।
যে কোনো কার্যকর আচরণের মতোই কান্নাও সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন ভূমিকা নিয়েছে। প্রতিটি নতুন ব্যবহারই একে টিকে থাকার আরও কারণ দিয়েছে।
বিবর্তন সাধারণত এভাবেই কাজ করে।
এটি নতুন করে কিছু তৈরি করে না, বরং পুরোনো কাঠামোর ওপর নতুন কাজ যোগ করে।