Published : 30 Sep 2025, 12:54 PM
উইলিয়াম টেইনটন ছিলেন স্রেফ এক সাধারণ অফিস সহকর্মী, বয়স কেবল ২০। লন্ডনের সোহোর ২২ ফ্রিথ স্ট্রিটে এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচতলায় তার কাজ। কিন্তু ১৯২৫-এর শরতে ভাগ্য হঠাৎ তাঁকে টেনে নিয়ে গেল। কোথায়? মাত্র এক তলা ওপরে। তার জন্য সেখানেই অপেক্ষা করছিল ইতিহাস।
উপরে, ছোট্ট এক ঘরোয়া ল্যাবরেটরিতে, নিরলস পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন প্রায় খ্যাপাটে এক ‘গবেষক’। নাম জন লোগি বেয়ার্ড।
এই বেয়ার্ড এর আগে কাঠের পুতুলে পরীক্ষা চালিয়েছেন বটে, তবে এখন তার দরকার ছিল জ্যান্ত মানুষ! না, ইন্ডিয়ানা জোন্সের অমরেশ পুরির মতো বলি দেওয়ার জন্য নয়, স্রেফ একটা যন্ত্রের সামনে বসার জন্য। তবে, ভয়াবহ গরম সে যন্ত্র!
উত্তেজনায় তিনি প্রায় ছুটে গিয়ে টেইন্টনকে ডাকলেন বেয়ার্ড। বরং বলা ভালো, টেনে নিয়ে গেলেন সেই ঘরে। টেইন্টন পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করেছিলেন, “মি. বেয়ার্ড এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে, কোনো কথাই যেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শুধু চাইছিলেন আমি যেন তৎক্ষণাৎ তাঁর সঙ্গে যাই।”
সেই ঘরে দাঁড়িয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর যন্ত্র, যার তীব্র আলো আর উত্তাপে দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকা কঠিন। তবু টেইনটন সাহস করে বসলেন বেয়ার্ডের সামনে। মুহূর্ত কয়েক পরে ধাতব যন্ত্র থেকে ছুটে বেরোল আলোর কম্পন, আর কালো-সাদা রেখার ভেতর ফুটে উঠল টেইনটনের মুখ। এ ছিল পৃথিবীর প্রথম মানবচিত্র, যা ভেসে উঠেছিল টেলিভিশনের পর্দায়।
তারিখটি ছিল ১৯২৫ সালের ২ অক্টোবর। বৃহস্পতিবার পূর্ণ হচ্ছে টেলিভিশন যুগের একশ বছর।
রোমাঞ্চকর সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ৪০ বছর পর ১৯৬৫ সালে টেইনটন আবার টেলিভিশনে এসে বিবিসিকে নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন।
বিজ্ঞানীরা ১৮৫০ সাল থেকেই টেলিভিশন উদ্ভাবনের ওপর কাজ করছিলেন। কিন্তু টেলিভিশনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য যে ঘাড় গুঁজে কাজ করা একাগ্র উদ্যোগীর দরকার ছিল, তিনি সেই চেষ্টা চালিয়েছেন পুরানো সাইকেলের বাতি, ভাঙা কাঠ আর বিস্কুটের টিন বক্স ব্যবহার করে।
এ বড় সাফল্যের আগেও বেয়ার্ড টুকটুক নানা জিনিস উদ্ভাবন করেছেন, যার সাফল্যের পারদ এক জায়গায় স্থির থাকেনি কখনও। অধিকাংশ সময় অসুস্থতায় ভুগতে থাকা এই ধর্মযাজকের ছেলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে সৈনিক হতেও পারেননি।

ব্যর্থতার মধ্যেও ১৯২৩ সালে নিজের মোজা ও সাবানের ব্যবসা থেকে আসা অর্থের সাহায্যে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে ছোট এক অফিস ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক ল্যাবরেটরি তৈরি করেছিলেন বেয়ার্ড, যেখানে টেলিভিশন নিয়ে নানা পরীক্ষা শুরু এবং পুরানো চা বাক্সের মতো বর্জ্য সামগ্রী থেকে যন্ত্রাংশ তৈরি করেছিলেন তিনি।
তার এ সিস্টেমের কেন্দ্রে ছিল বড় এক ডিস্ক, যা দ্রুত ঘোরে এবং ফটোডিটেক্টর ও শক্তিশালী আলো ব্যবহার করে লাইন ধরে ছবি স্ক্যান করে। এসব সিগনাল পাঠানো ও তা পুনরায় গঠন করে চলমান ছবি তৈরি করা হয়। যখন তিনি সিলুয়েট পাঠাতে সফল হন তখন টেলিভিশন উদ্ভাবনের সেই বহু দশক ধরে স্বপ্ন দেখার বিষয়টি বাস্তবতার কাছাকাছি চলে আসে।
৪০ বছর পর ঠিক সেই দিনটির কথা স্মরণ করে টেইনটন বিবিসিকে বলেছিলেন, “বেয়ার্ড উত্তেজিত হয়ে দৌড়ে নিচে এসে আমাকে তার ল্যাবরেটরিতে টেনে নিয়ে গেলেন। আমার মনে হয় তখন তিনি এতটাই উত্তেজিত ছিলেন যে, কথা বলতে পারছিলেন না। তিনি কেবল আমাকে বললেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উপরে চল।”
বেয়ার্ডের ল্যাবরেটরির ভগ্নদশা দেখে টেইনটনের মন চাইল সরাসরি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেতে। কিন্তু তাকে ছাদের থেকে ঝুলে থাকা তার আর মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যন্ত্রাংশের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হল।
টেইনটন বলেছিলেন, “ওই সময় তার যন্ত্রপাতি ছিল একেবারে বিশৃঙ্খল। ল্যাবরেটরিতে কেবল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কার্ডবোর্ডের ডিস্ক যার মধ্যে সাইকেলের বাতির লেন্স আর বিভিন্ন জিনিসপত্র। সঙ্গে ছিল আরও নানা ধরনের ল্যাম্প, পুরনো ব্যাটারি, আর কিছু পুরানো মোটর, যা ডিস্ককে ঘোরানোর কাজ করত।”
টেইনটনকে নিজের ট্রান্সমিটারের সামনে বসিয়ে দিলেন বেয়ার্ড। ওই সময় তাপ অনুভব করেছিলেন ও ভয় পেয়েছিলেন টেইনটন। তবে বেয়ার্ড তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, চিন্তার কিছু নেই।
“বেয়ার্ড ছবি দেখতে নীচে রিসিভিং সাইডে চলে গেলেন। আমি টেলিভিশনের ফোকাসে এলাম। তবে ল্যাম্পগুলোর তীব্র তাপের কারণে এক মিনিটের বেশি সময় সেখানে বসে থাকতে পারলাম না। আমি সরে এলাম। এ পরীক্ষার জন্য টেইনটনের হাতে অর্ধেক ক্রাউন দিলেন বেয়ার্ড, যা ছিল আমার প্রথম টেলিভিশন ফি। এরপর আমাকে আবার ঠিক জায়গায় বসতে রাজি করালেন তিনি।”
চেহারার কিছু গতিবিধি ধারণের জন্য টেইনটনকে জিহ্বা বের করে মজার কিছু করতে বললেন বেয়ার্ড। ক্রমেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে টেইনটন চিৎকার করে বললেন, “আমি গরমে জীবন্ত পুড়ে যাচ্ছি।” বেয়ার্ডও চিৎকার করে বললেন, “কয়েক সেকেন্ড ধৈর্য ধরো টেইনটন, কেবল কয়েক সেকেন্ড।”
টেইনটন চেষ্টা করলেন যতটা সম্ভব সেখানে বসে থাকতে। তবে তীব্র গরমের কারণে ফোকাস থেকে বেরিয়ে এলেন টেইনটন। তখনই বেয়ার্ড রিসিভিং সাইড থেকে দৌড়ে এসে হাত উঁচু করে বলে উঠলেন, “আমি তোমাকে দেখেছি, উইলিয়াম, আমি তোমাকে দেখেছি! অবশেষে আমি সফল হয়েছি টেলিভিশনে সত্যিকারের ছবি পাঠাতে!”
টেইনটন বুঝতে পারেননি ‘টেলিভিশন’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে। বেয়ার্ড তখন টেইনটনকে নিজেদের জায়গা বদলের পরামর্শ দিলেন। টেইনটন খুশি হয়েই জায়গা বদল করলেন এবং একটি ছোট নল থেকে দেখলেন ‘প্রায় ২ ইঞ্চি × ৩ ইঞ্চি বা ৫ সেমি × ৮ সেমি’ সাইজের একটি ছোট ছবি।
টেইনটন বললেন, “হঠাৎ করেই বেয়ার্ডের মুখ স্ক্রিনে ভেসে এল। আমি তার চোখ বন্ধ করা, মুখের হাবভাব দেখতে পাচ্ছিলাম। অবশ্য তা খুব স্পষ্ট ছিল না। কেবল ছায়া আর নিচে নামা বিভিন্ন লাইন দেখা যাচ্ছিল। তবে তা ছিল এক চলমান ছবি, আর এটিই ছিল বেয়ার্ডের বড় সফলতা। তিনি সত্যিকারের টেলিভিশন ছবি তৈরি করতে পেরেছিলেন।”
টেইনটনের ১৯৬৫ সালের এই স্মৃতিচারণার কিছু বছর পরেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ টিভির সামনে মুখিয়ে ছিলেন চাঁদে অবতরণের ঘটনা দেখার জন্য, যা আগে কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর গল্প ছিল, সেটি বাস্তবে রূপ পেল।