১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে প্রতিশোধ নয়’: মার্কিন আদালত

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সমালোচনা করার কারণেই এআই কোম্পানিটির ওপর প্রতিশোধমূলকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল সরকার।

‘জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে প্রতিশোধ নয়’: মার্কিন আদালত
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দেশীয় কোম্পানিকে প্রকাশ্যে ‘সাপ্লাই চেইন রিস্ক’ বা সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Aug 2026, 10:06 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:55 PM

আমেরিকান এআই গবেষণা কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জারি করা নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করেছে দেশটির এক ফেডারেল আদালত।

বৃহস্পতিবার আদালতের দেওয়া রায়ে বলা হয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সমালোচনা করার কারণেই এআই কোম্পানিটির ওপর প্রতিশোধমূলকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল সরকার।

সামরিক কার্যক্রমে নিজেদের চ্যাটবট ‘ক্লড’ ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া ও পেন্টাগনের সমালোচনা করার জেরে কোম্পানিটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।

বিচারক রিটা লিন তার রায়ে বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সরকারের সমালোচকদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

৫৯ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক লিন বলেছেন, “জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত তুলে সরকারের সমালোচকদের শাস্তি দেওয়া বা তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার অবাধ লাইসেন্স কাউকে দেওয়া হয়নি।”

এআই চ্যাটবট ক্লডের নির্মাতা কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন যেসব কড়াকড়ি আরোপ করেছিল বিচারক রিটা লিন সংশ্লিষ্ট ফেডারেল বিভিন্ন সংস্থাকে তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

একইসঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কোম্পানিটিকে যে ‘সাপ্লাই চেইন রিস্ক’ বা সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন, বিচারকের আদেশে তাও বাতিল হয়েছে।

এর আগে, এ ধরনের তকমা কেবল বিদেশি বা শত্রুভাবাপন্ন দেশের বিভিন্ন কোম্পানির ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বৃহস্পতিবারের এ রায়ের ফলে গেল মার্চে জারি করা সাময়িক স্থগিতাদেশটি স্থায়ীভাবে বাতিল হবে এবং আদেশটি অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

তবে মার্কিন সরকার চাইলে উচ্চ আদালতে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে।

আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অ্যানথ্রপিকের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “কোম্পানিটিকে ‘সাপ্লাই চেইন রিস্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্তটি বেআইনি ছিল– আদালতের এ রায়কে আমরা সাধুবাদ জানাই।”

মার্কিন সামরিক বাহিনীর নজরদারি কার্যক্রম বা স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্রে নিজেদের চ্যাটবট ‘ক্লড’ ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল অ্যানথ্রপিক।

এর জের ধরেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কোম্পানিটির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন এ পদক্ষেপ নেন, যার ফলে সামরিক খাতের বেশ কয়েকটি বড় চুক্তি থেকে বাদ পড়ে অ্যানথ্রপিক।

কোম্পানিটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের কারণে তারা শত শত কোটি ডলারের ব্যবসা হারানোর পাশাপাশি মারাত্মক প্রাতিষ্ঠানিক ও সুনামগত ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন।

সামরিক কার্যক্রমে এআই ব্যবহারের এই প্রস্তাব বাতিলের পর অ্যানথ্রপিকের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। গেল ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অ্যানথ্রপিককে ‘চরম বামপন্থী কোম্পানি’ ও ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

অ্যানথ্রপিকের ভাষ্য, স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্রে নিরাপদে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন এআই মডেল এখনও যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নজরদারিতে এর ব্যবহারকে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করে এর বিরোধিতা করেছে তারা।

তবে পেন্টাগনের দাবি, এসব কোম্পানির কোনোভাবেই সামরিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

বিদেশি নাশকতা থেকে সামরিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে প্রণীত সরকারি কেনাকাটা বিষয়ক এক আইনের অধীনে এ পদক্ষেপ নিয়েছিল পেন্টাগন। 

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দেশীয় কোম্পানি প্রকাশ্যে ‘সাপ্লাই চেইন রিস্ক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তবে, পেন্টাগনের এ পদক্ষেপকে ‘বেআইনি ও ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন জো বাইডেনের আমলে নিয়োগ পাওয়া বিচারক রিটা লিন।

৯ মার্চ দায়ের করা মামলায় অ্যানথ্রপিক অভিযোগ করেছিল, এআই নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের মতামতের ওপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে সরকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে থাকা বাকস্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করেছে।

কোম্পানিটি বলেছিল, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেওয়া এই তকমার বিরুদ্ধে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে থাকা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

মামলায় বলা হয়েছে, সরকারের এ সিদ্ধান্তটি ছিল পুরোপুরি বেআইনি, তথ্য-প্রমাণহীন ও অতীতে ক্লড নিয়ে সামরিক বাহিনীর প্রশংসার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

আদালতে জমা দেওয়া নথির বরাতে উঠে এষেছে, এর পাল্টা জবাবে মার্কিন বিচার বিভাগ দাবি করেছে, ব্যবহারের শর্ত শিথিল করতে অ্যানথ্রপিকের অস্বীকৃতির কারণে পেন্টাগন কীভাবে ‘ক্লড’ ব্যবহার করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ফলে অভিযানের সময় সামরিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

সরকারের দাবি, চুক্তির শর্তাবলি মেনে নিতে অ্যানথ্রপিকের অস্বীকৃতির কারণেই তাদের এই তকমা দিয়েছে তারা, বরং এআই নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের মতামতের কারণে নয়।

এদিকে, পেন্টাগনের দেওয়া আরেকটি আলাদা ‘সাপ্লাই চেইন রিস্ক’ তকমার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ডিসিতে অ্যানথ্রপিকের দ্বিতীয় আরেকটি মামলা এখনও বিচারাধীন। ওই তকমার কারণে কোম্পানিটি সরকারি বিভিন্ন চুক্তি থেকেও বাদ পড়তে পারে।