Published : 29 Aug 2026, 01:42 PM
বেইজিংয়ের হিউম্যানয়েড রোবট গেইমসে উসাইন বোল্টের বিশ্বরেকর্ড ভাঙার দাবি তুলে আলোড়ন তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইওয়ালা হিউম্যানয়েড রোবট।
তবে, গতি বা উচ্চতার রেকর্ডে মানুষকে পেছনে ফেললেও একে খেলার আসল সাফল্য বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, যান্ত্রিক গতির সঙ্গে মানবদেহের লড়াই, মানসিক চাপ ও জয়ের আবেগের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, একশ মিটার স্প্রিন্ট কেবল ৯ দশমিক ৩৯ সেকেন্ডে দৌড়ে পার করার ঘটনা বিস্ময়কর শোনালেও বাস্তবে এমনটাই ঘটিয়েছে হিউম্যানয়েড রোবটটি।
এ সপ্তাহে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেইমস’-এ দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের সর্বকালের বিশ্বরেকর্ড ভেঙেছে রোবট। একই প্রতিযোগিতায় আরেকটি হিউম্যানয়েড রোবট হাই জাম্পে হারিয়ে দিয়েছে হাভিয়ের সোতোমেয়রের বহু বছরের পুরানো বিশ্বরেকর্ডকে।
ওপর ওপর দেখলে এসব সাফল্যকে ক্রীড়াজগতের নতুন দিগন্তের সূচনা বলে মনে হতে পারে। তবে রোবটের সঙ্গে মানুষের পারফরম্যান্সের তুলনা করার এমন মানসিকতা মৌলিকভাবেই ভুল।
‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেইমস’-এ অ্যাথলেটিক্স, ফুটবল, বক্সিং ও ভারোত্তোলনের মতো নানা ইভেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দুই হাজারটিরও বেশি রোবট এক ছাদের নিচে জড়ো হয়েছিল।
প্রতিযোগিতার বড় পরিসর ও প্রদর্শিত প্রযুক্তির অগ্রগতি ছিল সত্যিই দেখার মতো। আয়োজকরা বলছেন, আগের আসরগুলোর তুলনায় এবার রোবটের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং বিভিন্ন খেলায় এদের সক্ষমতার স্তরেও উন্নতি এসেছে।
গঠন, বাহ্যিক রূপ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য সব দিক থেকেই মানবদেহের আদলে তৈরি এসব যন্ত্র। তবে এদের অভাবনীয় পারফরম্যান্স একেবারে ভিন্ন ধরনের মেকানিক্স বা যান্ত্রিক কারিগরি সক্ষমতার ফল। এ কারণেই পেশাদার অ্যাথলেটদের সঙ্গে এদের সরাসরি তুলনা টানাটা বিভ্রান্তিকর।
এ ছাড়া, খেলাধুলা কখনোই কেবল দ্রুততম সময়ে দৌড় শেষ করা, সর্বোচ্চ উঁচুতে লাফানো বা সবচেয়ে ভারী বস্তু তোলার মধ্যে আটকে নেই। মানুষ যখন কোনো ক্রীড়াবিদকে প্রতিযোগিতায় লড়াই করতে দেখে তখন কেবল তার শারীরিক কসরতই দেখে না।
এর সঙ্গে একটি মানুষের ক্লান্তি, মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা, আবেগ ও ঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতাও মানুষ দেখে। অলিম্পিক সংস্থা নিজেও কেবল ফলাফল নয়, বরং মানুষের বিকাশ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই খেলাধুলার আসল সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।
শারীরিক দক্ষতায় পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে এসব প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ জয় করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের এ বাস্তব অভিজ্ঞতাই ক্রীড়া অর্জনগুলোকে অর্থবহ করে তোলে এবং অ্যাথলেট, দর্শক ও সার্বিক ক্রীড়াবিশ্বের মধ্যে এক আত্মিক মেলবন্ধন তৈরি করে।
একটি রোবট দেখতে মানুষের মতো হলেও মানুষের মতো খেলাধুলার অনুভূতি উপভোগের সক্ষমতা এর নেই।
স্টার্ট লাইনে দাঁড়ানোর সময় নার্ভাস হওয়া, চোটের ধাক্কা সামলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া বা জয়ের আনন্দ ও পরাজয়ের গ্লানি কোনোটাই রোবটের পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়।
ঠিক এ কারণে কোনো রোবটের দৌড়ের সময়কে উসাইন বোল্টের বিশ্বরেকর্ডের সঙ্গে তুলনা করাটা বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে এসব ইভেন্ট অ্যাথলেটিকসের শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বড় এক নিদর্শন।
হিউম্যানয়েড রোবটের এ দ্রুত বিকাশ খেলার ভবিষ্যতকে প্রযুক্তি কীভাবে রূপ দেবে সেই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
রোবোটিক্স প্রযুক্তি আগামী দিনে কোচদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে সাহায্য, অনুশীলনের ধরন উন্নত ও মানুষের শারীরিক দক্ষতার সীমানাকে আরও ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করতে পারে।
তবে, খেলাধুলার সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক কখনোই খুব একটা সহজ ছিল না। যেমন, ফুটবলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে ‘ভিএআর’ প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও বিতর্কিত।
প্রযুক্তি কি খেলাধুলাকে সমৃদ্ধ করছে নাকি খেলোয়াড়, রেফারি ও ভক্তদের আসল রোমাঞ্চ নষ্ট করছে তা নিয়ে আলোচনা চলছেই।
এমন পরিস্থিতিতে হিউম্যানয়েড রোবোটিক্স আরও বড় কিছু প্রশ্ন তুলে ধরছে। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আসলে কার থাকবে? এ প্রযুক্তি কি সব দেশের সব দলের জন্য উন্মুক্ত হবে নাকি কেবল ধনী দেশ ও ক্লাবের অংশ হয়ে থাকবে?
অন্যান্য নতুন উদ্ভাবনের মতো এখানেও বড় ঝুঁকি থেকে যায় যে, এ রোবোটিক্স প্রযুক্তি কেবল সামর্থ্যবানদের বাড়তি সুবিধা দিয়ে বর্তমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের একাংশ ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেইমস’ ও হিউম্যানয়েড রোবটের সমালোচনা করে চলেছে, তবে মনে রাখা জরুরি পশ্চিমা ক্রীড়াসংস্কৃতিই বিশ্ব ক্রীড়াজগতের শেষ কথা নয়। প্রযুক্তি ও খেলাধুলা নিয়ে বিভিন্ন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশা ভিন্ন হতে পারে।
ক্রীড়াজগৎ সবসময়ই সর্বজনীন ও সবার জন্য সহজলভ্য এক মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়িত হয়ে এসেছে।
ফুটবলকে ‘জনগণের খেলা’ বলা হয় কারণ বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে এটা খেলা সম্ভব। তবে, উন্নত প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা খেলাধুলার মূল ভিত্তিগুলোকেই হয়ত দূরে ঠেলে দিতে পারে।
এবারের রোবট গেইমমে ইঙ্গিত মিলেছে, প্রযুক্তির পথ এখনও অনেক দীর্ঘ। যেমন রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দেখা গেছে অনেক রোবট ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছে, কোনো বাধার সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে, যন্ত্রপাতির ওপর আছড়ে পড়ছে ও প্রতিযোগিতা চলাকালীন কোনো কোনো রোবট ভেঙেও পড়ছে।
এক রোবট সেইফটি ব্যারিয়ারে ধাক্কা খেয়ে আগুন ধরে যাওয়ার পর সেটাকে চাদরে মুড়ে সরিয়ে নিতে হয়েছিল। ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতায় আরেকটি রোবট বিচারকদের টেবিলের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ে।
এসব দৃশ্য হাসির খোরাক জোগালেও চরম এক সত্যকে সামনে আনে যে, হিউম্যানয়েড রোবোটিক্স এখনও বিকাশমান প্রযুক্তি, পূর্ণাঙ্গ কোনো প্রস্তুত পণ্য নয়।
তবে, প্রযুক্তি যে দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে তা স্পষ্ট। চীনে রোবোটিক্স এরইমধ্যে দৈনন্দিন জীবন ও শিল্প খাতের অংশ হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে এ প্রযুক্তি যত ছড়িয়ে পড়বে, খেলাধুলায় এর অবস্থান নিয়ে তর্ক-বিতর্কও তত জোরালো হবে।
আপাতত এসব রোবট ক্রীড়াবিদদের স্থান দখল করছে না। তবে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কিছু খেলা পরিচালনা পরিষদকে বেশ কিছু কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
যেমন, খেলায় রোবটের অবস্থান ঠিক কোথায়, এদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত ও প্রতিযোগিতাগুলোতে রোবটের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?