Published : 28 Apr 2026, 06:25 PM
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে সংবাদের জন্য অর্থ না দিলে গুগল, মেটা ও টিকটকের ওপর ২ দশমিক ২৫ শতাংশ কর আরোপ করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
রয়টার্স লিখেছে, সংবাদ শিল্পের ভবিষ্যৎ রক্ষা ও প্রযুক্তি জায়ান্টদের থেকে ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে এমন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে দেশটি।
মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়া সরকার বলেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটা, গুগল ও টিকটক যদি তাদের প্ল্যাটফর্মে সংবাদ দেখানোর বিনিময়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে অর্থ দেওয়ার চুক্তিতে না আসে তবে তাদের কোটি কোটি ডলার জরিমানা বা মাশুল গুনতে হবে।
‘নিউজ বার্গেইনিং ইনসেন্টিভ’ নামের খসড়া আইন অনুসারে, এ তিনটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ না হলে তাদের স্থানীয় আয়ের ওপর ২ দশমিক ২৫ শতাংশ কর আরোপ হবে। এ কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ অস্ট্রেলিয়ার সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে সংবাদমাধ্যমগুলোকে দেবে দেশটির সরকার।
এক সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার যোগাযোগ মন্ত্রী আনিকা ওয়েলস বলেছেন, “মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি ফেইসবুক, টিকটক ও গুগল থেকে সরাসরি সংবাদ পড়ছে। আমরা মনে করি বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত যে, বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো যেন সেই সাংবাদিকতার পেছনে বিনিয়োগ করে, যা তাদের ফিডকে সমৃদ্ধ ও তাদের আয় বাড়াতে সাহায্য করছে।
“এসব প্ল্যাটফর্মের উচিত বিভিন্ন সংবাদ সংগঠনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এমনটা না করার সিদ্ধান্ত নিলে শেষ পর্যন্ত তাদের আরও বেশি অর্থ গুনতে হবে।”
অস্ট্রেলিয়া সরকারের এমন পদক্ষেপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা চাপের সম্ভাবনা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেছেন, “আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমার সরকার অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই সব সিদ্ধান্ত নেবে।”
ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের ওপর এ ধরনের ডিজিটাল সেবা কর আরোপের বিরোধীতা করেছে। যেসব দেশ এই পথ অনুসরণ করছে তাদের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
অস্ট্রেলীয় নিউজরুমে অর্থায়নের জন্য কর
খসড়া আইন অনুসারে, এ শুল্ক ব্যবস্থা ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে কার্যকর হবে, যা শুরু হচ্ছে ১ জুলাই থেকে।
যাদের অস্ট্রেলিয়ায় ‘ব্যাপকহারে’ সামাজিক মাধ্যম বা সার্চ ইঞ্জিন সেবা রয়েছে এবং যাদের স্থানীয় আয় ২৫ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার বা প্রায় ১৭ কোটি ৯৩ লাখ ডলারের বেশি, এ আইন সেসব কোম্পানির ওপর প্রযোজ্য হবে। মেটা, গুগল ও টিকটক এ তালিকায় রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার বলেছে, আইনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর প্রযোজ্য হবে না। তাদের জন্য আলাদা আইন হয়েছে।
যোগাযোগ মন্ত্রী আনিকা ওয়েলস বলেছেন, “নিউজ মিডিয়া বার্গেইনিং ইনসেন্টিভ আইনের মানে, কোনো প্ল্যাটফর্ম যদি সংবাদ প্রকাশকদের সঙ্গে চুক্তি না করে তবে সেই অর্থ আমাদের (সরকার) কাছে জমা হবে। এরপর কোন সংবাদমাধ্যমে কতজন সাংবাদিক কর্মরত আছেন সেই সংখ্যার ভিত্তিতে আমরা ওই অর্থ তাদের কাছে পৌঁছে দেব।”
ছোট সংবাদ সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তি করলে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম কর ছাড়ের ক্ষেত্রে বড় সুবিধা পেতে পারে।
এক যৌথ বিবৃতিতে ‘নাইন এন্টারটেইনমেন্ট’, ‘পাবলিক ব্রডকাস্টার এবিসি’ ও ‘নিউজ কর্প’ এর মতো অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় সংবাদ মাধ্যমের প্রধান নির্বাহীরা বলেছেন, এ পরিকল্পনাটি “অস্ট্রেলীয় সংবাদ শিল্পের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।
“ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো যাসব কনটেন্ট থেকে নিজেরা লাভবান হচ্ছে, তারা যদি সেই সংবাদ বা কনটেন্টের জন্য অর্থ দিতে না পারে, তবে সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
‘একেবারেই ভুল ধারণা’
মেটার একজন মুখপাত্র বলেছেন, তারা সংবাদ প্রকাশকদের থেকে কনটেন্ট নিয়ে নেয় এমন ধারণাটি ‘একেবারেই ভুল’। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তহবিল দিতে এই শুল্ক ব্যবহারের মানে হচ্ছে “এমন এক সংবাদ শিল্প তৈরি করা, যা সরকারি ভতুর্কি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল।
“আমাদের প্ল্যাটফর্মে সংবাদ থাকুক বা না থাকুক অস্ট্রেলিয়ার এ প্রস্তাবিত আইনটি সব ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে, যা আসলে ডিজিটাল সেবা কর ছাড়া আর কিছুই নয়।”
অস্ট্রেলিয়ার এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে গুগলও।
তাদের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা বর্তমানে খসড়া আইনটি পর্যালোচনা করছি। তবে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, আমরা এ করের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করি না।”
এদিকে, এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি টিকটকের একজন মুখপাত্র।
সরকার বলেছে, ২০২১ সালের আইনটি এখন আর ‘কার্যকরভাবে কাজ করছে না’। ফলে সেই আইনের পরিবর্তে এ নতুন ‘নিউজ বার্গেইনিং ইনসেন্টিভ’ আইন আনার পরিকল্পনা হয়েছে।
আগের বার এমন পদক্ষেপ নেওয়ার পর মেটা সাময়িকভাবে ব্যবহারকারীদের নিউজ শেয়ারিংয়ের সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছিল।
তবে পরে তারা বেশ কিছু অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, যার মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হয়ে গেছে।