১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

মঙ্গলে গাড়ি চালনায় রেকর্ড গড়ল নাসার রোভার ‘পার্সিভ্যারেন্স’

মঙ্গলে কোনো অণুজীবের উপযোগী পরিবেশ অতীতে ছিল কি না তা অনুসন্ধানের এই বৈজ্ঞানিক অভিযানে সাড়ে পাঁচ বছর পূর্ণ করার পরই এ অভাবনীয় মাইলফলক ছুঁল রোভারটি।

মঙ্গলে গাড়ি চালনায় রেকর্ড গড়ল নাসার রোভার ‘পার্সিভ্যারেন্স’

নিজের এই দীর্ঘ অভিযানের অংশ হিসেবে রোভারটি সৌরজগতের এ যাবৎকালের সবচেয়ে প্রাচীন ভূখণ্ডের বেশ কিছু অঞ্চল পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করেছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Oct 2026, 12:12 PM

Updated : 14 Oct 2026, 12:12 PM

পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহের পৃষ্ঠে দূরনিয়ন্ত্রিত যান বা রোভার চালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পথ পেরনোর মাইলফলক স্পর্শ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তৈরি রোবোটিক রোভার পার্সিভ্যারেন্স।

মঙ্গলবার নাসা বলেছে, ২০২১ সালে মঙ্গল গ্রহে নামার পর থেকে এ পর্যন্ত ছটি চাকার গাড়ি আকৃতির রোভারটি মোট ৪৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ পেরিয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, লাল গ্রহ মঙ্গলে কোনো অতিক্ষুদ্র বা অণুজীবের উপযোগী পরিবেশ অতীতে কখনো ছিল কি না তা অনুসন্ধানের এই বৈজ্ঞানিক অভিযানে সাড়ে পাঁচ বছর পূর্ণ করার পরই এ অভাবনীয় মাইলফলক ছুঁল যানটি।

নিজের এই দীর্ঘ অভিযানের অংশ হিসেবে রোভারটি সৌরজগতের এ যাবৎকালের সবচেয়ে প্রাচীন ভূখণ্ডের বেশ কিছু অঞ্চল পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত নাসার ‘জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি’র বা জেপিএলের স্টিভেন লি বলেছেন, “পার্সিভ্যারেন্সের ভেতরের যন্ত্রপাতি ও প্রকৌশল সামগ্রীগুলো এখনো চমৎকার অবস্থায় কাজ করছে ও এর প্রতিটি বিকল্প বা জরুরি সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ সচল রয়েছে।”

নাসার দুটি মঙ্গল রোভার পার্সিভ্যারেন্স ও কিউরিওসিটি’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক স্টিভেন লি বলেছেন, “আমাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, যানটির সব ব্যবস্থা ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত বা তার পরেও নির্বিঘ্নে কাজ করে যেতে পারবে।”

এর মাধ্যমে পার্সিভ্যারেন্স ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মঙ্গলের বুকে নাসারই অপর রোভার ‘অপারচুনিটি’র চালিত ৪৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের আগের রেকর্ডটি ভেঙে দিল।

এই দুটি রোভারের অতিক্রান্ত দূরত্ব চাঁদের বুকে চালিত যে কোনো লুনার রোভারের পাড়ি দেওয়া দূরত্বের চেয়েও বেশি।

জেজেরো ক্রেটার পেরনোর অভিযান

আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির বহর নিয়ে পার্সিভ্যারেন্স মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধের ‘জেজেরো ক্রেটার’ নামের অঞ্চলে গবেষণা চালিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শত কোটি বছর আগে অঞ্চলটি পানিতে প্লাবিত ছিল ও সেখানে বড় হ্রদ বা লেক অববাহিকার অস্তিত্ব ছিল।

‘লাক দ্য চার্মস’ ডাকনামের একটি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ক্রেটারের পশ্চিম প্রান্ত অতিক্রম করে ‘ইদুবি’ নামের এলাকার দিকে যাত্রাপথে এ মাইলফলক স্পর্শ করেছে রোভারটি।

বর্তমানে মঙ্গলের বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থিত ‘গেল ক্রেটার’ এলাকায় ঘুরে ঘুরে কাজ করে চলেছে নাসার আরেক সহচর রোভার ‘কিউরিওসিটি’।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক স্টিভেন লি বলেছেন, পার্সিভ্যারেন্সের গতি কমার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। যানটির চলাচল ব্যবস্থার মূল কৌশল পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, যাতে এটা অন্তত ১০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি পথ পেরতে পারে।

এজন্য হার্ডওয়্যারগুলোকে ১৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পথ চলাচলের উপযোগী করে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

পার্সিভ্যারেন্সের এ অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে এর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি চালানোর সক্ষমতাকে বড় কৃতিত্ব দিচ্ছে নাসা।

‘অটোনেভ’ নামের এই বিশেষ ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার সাহায্যে মানুষ বা গবেষকদের কোনো রকম সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই ৯০ শতাংশ দূরত্ব অতিক্রম বা ড্রাইভিং সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান লি।

“পার্সিভ্যারেন্সের সামনের ভূখণ্ডের স্টিরিও ছবি তুলে তা থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ম্যাপ তৈরি করে গন্তব্যে পৌঁছানোর সবচেয়ে নিরাপদ পথটি নিজেই বেছে নেয়।”

পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হচ্ছে ‘ভিশন কম্পিউট এলিমেন্ট’। এটা দ্রুতগতির প্রসেসর কম্পিউটার, যা রোভারটিকে ছবি বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং সফটওয়্যার একনাগাড়ে খুব দ্রুত চালাতে সাহায্য করে।

পুরনো বিভিন্ন রোভারের সঙ্গে তুলনা করে লি বলেছেন, আগের রোভারগুলোকে চলাচলের প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যাওয়ার আগে থামতে ও পরবর্তী পথ ঠিক করার জন্য ‘চিন্তা’ করতে সময় নিতে হত। কিন্তু পার্সিভ্যারেন্স সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছে।

“সোঝোর্নার, স্পিরিট, অপারচুনিটি ও কিউরিওসিটি নামের অতীতের ৪টি মঙ্গল রোভার ২৯ বছরের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই পার্সিভ্যারেন্স তৈরি হয়েছে, যেখানে আগের প্রতিটি অভিযানের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে অন্য গ্রহের বুকে চালনা সক্ষমতাকে আরও উন্নত করা হয়েছে।”

প্রাচীন প্রাণের সম্ভাব্য আলামত

স্টিভেন লি বলেছেন, রোভারটির এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য হচ্ছে গেল বছর উন্মোচিত প্রাচীন কোনো অণুজীবের ‘সম্ভাব্য জীবাশ্ম’ বা প্রাণের বায়োসিগনেচার আবিষ্কার করা।

জেজেরো ক্রেটারকে একসময় প্লাবিত করা সেই হ্রদের মুখে ৩২০ থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে গড়ে ওঠা লালচে শিলার মধ্যে এই সম্ভাব্য আলামতের সন্ধান মেলে।

লি বলেছেন, ‘লাক দ্য চার্মস’ এলাকার ভূপ্রকৃতি থেকে গ্রহের প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যেমন বড় ধরনের উল্কাপাতের প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে। মঙ্গলের প্রাথমিক ইতিহাসে এমনই এক বড় উল্কাপাতের ফলেই তৈরি হয়েছিল জেজেরো ক্রেটার।

মহাকাশ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেছেন, ক্রেটারের এ প্রান্তভাগের কিছু এলাকায় একসময় উষ্ণ বা উত্তপ্ত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা ছিল।

“এসব অঞ্চলে হয়ত একসময় মাটির নিচে উষ্ণ ও পানিময় এমন এক পরিবেশ ছিল, যা প্রাণ ধারণের জন্য অনুকূল। বেশ কয়েকজন প্রত্নজীববিজ্ঞানীর ধারণা, পৃথিবীতেও প্রাণের সূচনা হয়েছিল ঠিক এই ধরনের পরিবেশেই।”

রোভারটির প্রাথমিক মিশনে কেবল ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে নাসা সম্প্রতি ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ এই ক্রেটারের অনুসন্ধান চালিয়ে নেওয়ার জন্য মূল মিশনের মেয়াদ বাড়াতে অনুমোদন দিয়েছে।

রোভারটিতে ব্যবহৃত প্লুটোনিয়ামভিত্তিক পাওয়ার সিস্টেমটি প্রত্যাশা অনুসারে নিখুঁতভাবে কাজ করছে জানিয়ে লি বলেছেন, “এতে এখনও বহু বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে শক্তি পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে।”