১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

চাঁদে ‘এয়ারপোর্ট’: শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষজ্ঞদের নতুন নীতিমালা

চাঁদে আসা-যাওয়ার সময় মহাকাশযানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিতে বিভিন্ন সংস্থাকে এখন থেকেই নিজস্ব ধরনের মহাকাশযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

চাঁদে ‘এয়ারপোর্ট’: শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষজ্ঞদের নতুন নীতিমালা
আগামী দুই দশকের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠ নভোচারীদের যাতায়াতে এক ব্যস্ত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ছবি: নাসা

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Aug 2026, 06:10 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

চাঁদের বুকে একেবারেই নতুন ধরনের ‘বিমানবন্দর’ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রাথমিক নিয়মকানুন বা দিকনির্দেশনা তৈরি করেছেন একদল মহাকাশ বিশেষজ্ঞ।

আগামী দুই দশকের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠ নভোচারীদের যাতায়াতে এক ব্যস্ত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও অন্যান্য সংস্থা সেখানে স্থায়ী আবাসন গড়ার পরিকল্পনা করছে, যাতে চাঁদকে আরও ভালোভাবে জানার পাশাপাশি মহাকাশের গভীরে অভিযানের ক্ষেত্রে সেটাকে একটি বিরতিস্থল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

তবে এসব ফ্লাইট ভবিষ্যতে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, কারণ চাঁদের কক্ষপথে নভোচারী, মহাকাশযান ও মালামাল পরিবহনকারী যানসহ সার্বিক যাতায়াত অনেক বেড়ে যাবে।

ফলে, নিয়মিত রকেট উৎক্ষেপণ ও অবতরণ সহজ করতে চাঁদে ইতিহাসের প্রথম মহাকাশবন্দর ‘গেটওয়ে’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে নাসার।

চাঁদে আসা-যাওয়ার সময় মহাকাশযানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিতে বিভিন্ন সংস্থাকে এখন থেকেই চাঁদের জন্য নিজস্ব ধরনের ‘এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল’ বা প্লেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

এ প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর সঙ্গে চাঁদ ও মহাকাশের অন্যান্য অংশের নিরাপদ যোগাযোগ ধরে রাখতে গাণিতিক নিয়মের ওপর ভিত্তি করে এক গুচ্ছ নতুন নিয়মের প্রস্তাব দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

নাসার জনসন স্পেস সেন্টার, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি ও পারডু ইউনিভার্সিটির গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে এ নতুন গবেষণাটি তৈরি হয়েছে।

গবেষণায় একটি ফ্লাইট ম্যানুয়াল ও কক্ষপথে চলাচলের ‘ট্রাফিক নিয়মাবলী’ প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে একাধিক মহাকাশযান নিরাপদে চাঁদের আশপাশের পথ ব্যবহার করতে পারে।

গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ও টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি’র স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডায়ান ডেভিস বলেছেন, “চাঁদে অভিযানের ভবিষ্যৎ ঠিক কতটা সফল হবে তা রকেট বিজ্ঞানের পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপরও সমানভাবে নির্ভর করছে।”

গবেষকরা বলছেন, মহাকাশযানের এ চলাচল নির্ভর করবে অভিকর্ষ বলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এক ‘মহাজাগতিক মহাসড়ক’ বা ‘সেলেস্টিয়াল হাইওয়ে’র ওপর।

নাসার গেটওয়ে ও সেখানে যাতায়াতকারী বিভিন্ন মহাকাশযানের ভ্রমণপথ হবে বিশেষ এক কক্ষপথ, যার নাম ‘নিয়ার রেক্টিলিনিয়ার হালো অরবিট’ বা এনআরএইচও।

ড. ডেভিস বলেছেন, “গেটওয়ের এ এনআরএইচও হচ্ছে চাঁদের আশপাশে একটি প্রায়-স্থির ও দীর্ঘায়িত কক্ষপথ, যা পৃথিবীর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং এই পথে মহাকাশযান ধরে রাখতে জ্বালানিও কম খরচ হয়।”

তবে সমস্যা হচ্ছে, ডিম্বাকৃতির এ কক্ষপথে ভারসাম্য ধরে রাখা বেশ জটিল। কারণ, একইসঙ্গে পৃথিবী ও চাঁদ উভয়ের অভিকর্ষ বল একে নিজের দিকে টানতে থাকে।

এ অদ্ভুত আকারের কক্ষপথের কারণে মহাকাশযান কখনও চাঁদের উত্তর মেরু থেকে কেবল ১ হাজার মাইল দূরত্বে থাকবে। আবার পর মুহূর্তেই হয়ত তা দক্ষিণ মেরু ছাড়িয়ে প্রায় ৪০ হাজার মাইল দূরে চলে যাবে।

একটিমাত্র মহাকাশ স্টেশন হলে মাঝেমধ্যে থ্রাস্টার চালনা করে এ ভারসাম্য সামলে নেওয়া সম্ভব।

তবে যখন একাধিক মহাকাশযান, যার মধ্যে কয়েকটি হয়ত চালকহীনও হতে পারে একই জায়গায় চলাচল করবে, তখন একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে নিরাপদে পথচলা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

এর জন্য মহাকাশযানগুলোকে এক নির্দিষ্ট স্থানে ‘অপেক্ষা’ বা সাময়িক হোল্ডিংয়ে থাকতে হবে, ঠিক যেমনটা রানওয়েতে নামা বা উড়াল দেওয়ার আগে বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ আকাশে চক্কর দেয় বা গেটে অপেক্ষা করে।

মহাকাশে এ অপেক্ষার সময়টি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় এ এমন এক পরিবেশ যেখানে সবকিছু প্রতি মুহূর্তে সচল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

ড. ডেভিস বলেছেন, “প্রতিটি মহাকাশযানই অনবরত গতিশীল, যা আদতে আদর্শ সামঞ্জস্যের বিষয়, যেখানে ‘পার্ক’ করা বিভিন্ন যানকে নিরাপদে রাখতে একে অপরের থেকে যথেষ্ট দূরে আবার জ্বালানি ও সম্পদের অপচয় ঠেকাতে গন্তব্যের কাছাকাছিও রাখতে হবে।”

এ সমস্যার সমাধানে গবেষকরা কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন।

অবতরণের অপেক্ষায় থাকা যানগুলোর মধ্যে কীভাবে নির্দিষ্ট দূরত্ব ধরে রাখা যায় ও ন্যাভিগেশন বা থ্রাস্টারের যান্ত্রিক ত্রুটির মতো অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি কীভাবে সামলানো যায় তা এতে খতিয়ে দেখা হয়।

তারা বলছেন, সামান্য কিছু সুনির্দিষ্ট ম্যানুভার বা কৌশলগত গতি পরিবর্তনের মাধ্যমেই বিভিন্ন মহাকাশযানকে নির্ধারিত স্থানের কাছাকাছি রাখা সম্ভব।

ফলে মহাকাশযানগুলোর গতিপথ আগে থেকে নির্ধারণ করা সহজ ও এদের মধ্যে সমন্বয় ধরে রেখে নিরাপদে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

‘সিসলুনার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট: অরবিট মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড লোইটারিং ইন দ্য গেটওয়ে এনআরএইচও’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাক্টা অ্যাস্ট্রোনটিকা’তে ।