ই-বাইকের চল বাড়ছে, সঙ্গে কেন বাড়ছে আগুনের ভয়?

“একটি নিরাপদ ব্যটারি প্যাক যদি ভুল চার্জার দিয়ে চার্জ করা হয় তাহলেও ওই নিরাপদ ব্যাটারিই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে আর ‘থার্মাল রানওয়ে’ তে পৌঁছে যেতে পারে।”

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Feb 2024, 09:21 AM
Updated : 12 Feb 2024, 09:21 AM

বর্তমানে নতুন সব প্রযুক্তির উদ্ভাবনে যাত্রা ও যোগাযোগের খাত পৌঁছে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। তারই পথ ধরে এসেছে ই-বাইক বা ব্যাটারি চালিত বাইক।

তবে, ব্যাটারি চালিত এসব বাইকের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়ার সঙ্গেই বেড়ে চলেছে ব্যটারি সংক্রান্ত ত্রুটি বা গোলযোগ থেকে আগুন লাগার শঙ্কা। সে প্রসঙ্গেই বিস্তারিত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। 

ইংল্যান্ডের ইয়র্ক শহরের একজন ডেলিভারি বাইক চালক, ওলি, যখন ২০২২ সালে তার প্রথম ই-বাইক কিনেছিলেন, সেটি কিছুটা বিস্ময়েরই ছিল। বাইক কোম্পানিটির সঙ্গে দর কষাকষি করে ডিসকাউন্টে বাইকটি কিনেছিলেন তিনি।  ডিসকাউন্টের পরেও বাইকটির দাম পড়েছিল প্রায় এক হাজার পাউন্ড, যা বর্তমান ডলার মূল্য অনুসারে ১২৬০ ডলার বা প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা।

“সবচেয়ে বড় সমস্যা ই-বাইকগুলোর চড়া দাম। আর নিরাপদ ব্যাটারিগুলো তো আরও দামী। তাই অনেকে প্রায়ই সস্তা, কম নির্ভরযোগ্য ও বিপজ্জনক ব্যাটারি বেছে নেন,” – বলেন ওলি।

তবে, তিনি প্রথমে সস্তা মডেলগুলোর লোভে পড়েলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন একটি ভাল ই-বাইকে খরচ করার, যেখানে তিনি পাবেন ‘বেশি রেঞ্জ, নিরাপদ ব্যাটারি, মেরামতের সহজ উপায় ও নিশ্চিত ওয়ারেন্টি।’

ওলির এ ধারণা সত্য হতে পারে, কিন্তু এ কারণেই বাইকটি ছিল চোরদের নজরে। তার ই-বাইকটি সম্প্রতি এক সুপারমার্কেটের বাইরে থেকে চুরি হয়েছে বলে লিখেছে বিবিসি৷

বিদ্যুচ্চালিত বাইক, স্কুটার ও মপেডের বাজার বড় হচ্ছে, যা কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক। গবেষণায় দেখা গেছে এসব বাইক থেকে কম কার্বন তৈরি হয়।

“সকল পরিবহনের তুলনায় ই-বাইকগুলোই জলবায়ুর সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল সমাধান,” – বলেছেন ‘ইকুইটেবল কমিউট প্রজেক্টে’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা মেলিন্ডা হ্যানসন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ সংগঠনটি নিউ ইয়র্কের স্বল্প আয়ের মানুষদের নিরাপদ ই-বাইক পেতে সাহায্য করে থাকে। উদাহরণ হিসাবে, একটি আয়োজনের মাধ্যমে যেখানে ডেলিভারি কর্মীরা তাদের নন-সার্টিফায়েড ই-বাইকগুলো ডিসকাউন্টযুক্ত নতুন বাইকের সঙ্গে বদল করতে পারবেন যেগুলো নিরাপত্তার মান ভালো।

এতে আসলে ই-বাইকের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টিই উঠে আসে। ই-বাইকের কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত চীন, ও লন্ডনের মতো শহরগুলোতে ই-বাইক ও ই-স্কুটারঘটিত অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে বলে উঠে এসেছে বিবিসি’র প্রতিবেদনে।

লন্ডনভিত্তিক বীমা কোম্পানি ‘আভিভা’র সমীক্ষায় উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের অন্তত ৭১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জানেনই না ই-বাইক বা ই-স্কুটারের ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার আগাম লক্ষণ। এসব লক্ষণের মধ্যে রয়েছে ব্যাটারি গরম হওয়া, ফুটো হওয়া, ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক গন্ধ ও বিভিন্ন শব্দ।

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির থেকে সৃষ্ট আগুন ভয়ঙ্কর। “এ আগুনগুলো এতটা প্রথাগত আগুন নয়। এগুলো বিস্ফোরক, আর এতে প্রচুর গ্যাস থাকে, " – ব্যাখ্যা করেন নিরাপত্তা বিজ্ঞানবিষয়ক কোম্পানি ‘ইউএল সলিউশনসের’ সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট স্লোন।

এই আগুন অবিশ্বাস্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের পক্ষে ঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

ই-বাইকের দ্রুত উত্থানের অর্থ হল বাজারের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন নিয়ন্ত্রকরা।  উদাহরণ হিসাবে, সাধারণ বাইকগুলোকে ই-বাইকে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, চার্জার ও কিট পরিবর্তনের বিষয়ে নিয়ম বা প্রবিধানের অভাব রয়েছে বিভিন্ন দেশে।

নকল, মানহীন বা অপ্রমাণিত ব্যাটারি আগুনের ঝুঁকির প্রধান কারণ। উদাহরণ হিসাবে, ‘নিউ ইয়র্ক শহরে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাটারি মডেলের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হল এটির নকল মডেলে বাজার সয়লাব হয়ে গিয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেছেন হ্যানসন।

“থার্ড পার্টি ব্যাটারিগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ব্যাটারিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় হল বাইকের ব্যাটারি, মোটর ও চার্জার সব একসঙ্গে মিলিয়ে নকশা করা।”

এমনকি, একটি ই-বাইক কিট বিক্রয়ের সময় নিরাপদ থাকলেও পরবর্তী পরিবর্তনগুলো অসঙ্গতি তৈরি করতে পারে।

“একটি নিরাপদ ব্যটারি প্যাক যদি ভুল চার্জার দিয়ে চার্জ করা হয় তাহলেও ওই নিরাপদ ব্যাটারিই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে আর ‘থার্মাল রানওয়ে’ তে পৌঁছে যেতে পারে।” – ব্যাখ্যা করেন স্লোন।

থার্মাল রানওয়ে হল এক ধরনের বিস্ফোরক চেইন বিক্রিয়া যেখানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ভিতরের একটি কোষ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, যা পরে ব্যাটারির অন্যান্য অনেক কোষে ছড়িয়ে যায়।

এমন চালক যাদের বাইক বাড়িতে ছাড়া চার্জ করার বিকল্প নেই, তাদের আগুনের ঝুঁকি কমানোর উপায় রয়েছে। 

“আপনার বাড়ির বাইরে যাওয়ার দরজা বন্ধ করবেন না,” – জোর দিয়ে বলেছেন স্লোন।

এ ছাড়া, চালকদের ব্যাটারি রিচার্জ করার আগে সেটি ঠাণ্ডা করতে, সমতল শক্ত পৃষ্ঠে চার্জ করতে, চরম তাপমাত্রা এড়াতে ও ফায়ার অ্যালার্ম ভালো অবস্থায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে লন্ডন ফায়ার ব্রিগেড।

প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায়ই আসা আরেকটি উপদেশ হল চার্জ হতে থাকা ব্যাটারির দিকে খেয়াল রাখা, বিশেষ করে রাতে।

“একজন ডেলিভারি সাইকেল চালকের জন্য ১৪ ঘন্টা শিফটের কাজ শেষে সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজটি হবে বাড়িতে এসে সাইকেলটি চার্জে লাগিয়েই বিছানায় চলে যাওয়া।” – বলেন স্লোন। তবে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।

এ শঙ্কার প্রতিক্রিয়া হিসাবে গত বছর থেকে বিভিন্ন প্রবিধান ও নিয়ম চালু করা হচ্ছে বলে লিখেছে বিবিসি। ই-বাই ও ব্যাটারির প্রধান রপ্তানিকারক চীন সম্প্রতি ই-বাইক চার্জার ও  বৈদ্যুতিক সিস্টেমের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা মান প্রয়োগ করেছে। 

“নিরাপদ বাইক ও ভাল মানের ব্যাটারি পরিচালনা ব্যবস্থা আছে এমন নিরাপদ ব্যাটারি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি শক্তি টানার চেষ্টা করে না এ ব্যাটারিগুলো।,” –  বলেন হ্যানসন।

"যদি কোন সমস্যা হয়, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিজেদের বন্ধ করে দেয়, এর ফলে ঝুঁকি কমে যায়।"

রবার্ট স্লোন আরো ধারণা প্রকাশ করেছেন, ভালো মানের চার্জিংয়ের ফ্যাসিলিটি বা ফ্যাক্টরি থাকলে অনেককিছু বদলে যেতে পারে। এর ফলে মানুষদের বাড়িতে নিজেদের ব্যাটারি প্যাক বা বাইক চার্জ দিতে হবে না।

বিভিন্ন মডেলের ই-বাইক চার্জ করা যায় এমন চার্জিং হাব এশিয়ার কিছু দেশে বেশি দেখা যায়। ব্যাটারি সোয়াপ ক্যাবিনেটও বেশি রয়েছে এশিয়ায়, যেখানে রাইডাররা তাদের চার্জ ছাড়া ব্যাটারি একই মডেলের একটি চার্জযুক্ত ব্যাটারির সঙ্গে বদলে নিতে পারেন।

ভয় দেখিয়ে মানুষকে ই-বাইক থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার বদলে উপযুক্ত সতর্কতা ও সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি করে শহরগুলো ই-বাইকে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবন রক্ষাও করতে পারবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

এ খাতে ডেলিভারি কোম্পানি, খাবারের বড় চেইন রেস্তোরা ও সরকারের থেকে অর্থায়ন আসা উচিত বলে মনে করেন হ্যানসন।

“এটি এমন এক প্রযুক্তি যা রক্ষা করা প্রয়োজন। এটি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি ভালো বিনিয়োগ হতে পারে।” – বলেন তিনি।