১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

রোবটও চাচ্ছে বকশিশ, কিন্তু সেটা যাচ্ছে কার পকেটে?

গ্রাহকের দেওয়া এ অর্থের আসল সুফল কি কর্মীরা পাচ্ছেন, নাকি চলে যাচ্ছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পকেটে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

রোবটও চাচ্ছে বকশিশ, কিন্তু সেটা যাচ্ছে কার পকেটে?
উত্তরটি লুকিয়ে রয়েছে আপনার মানিব্যাগ থেকে কীভাবে অর্থ খরচ করবেন সেই সিদ্ধান্তের ওপরই। ছবি: এআই

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Aug 2026, 10:51 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:52 PM

মেশিনও এখন ডিজিটাল হাত বাড়িয়ে বকশিশ চাইছে! আর এর উত্তর কীভাবে দেবেন এর ওপরই হয়ত নির্ভর করছে সেবা খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা।

বিবিসি লিখেছে, সেবা খাতে রোবটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন নতুন উদ্বেগের নাম স্বয়ংক্রিয় মেশিনের বকশিশ বা ‘রোবো-টিপিং’ দাবি করা। গ্রাহকের দেওয়া এ অর্থের আসল সুফল কি কর্মীরা পাচ্ছেন, নাকি চলে যাচ্ছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পকেটে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

এমন প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের ‘টিপসি রোবট’ নামের এক বারে রয়েছে দুটি রোবোটিক বাহু, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ককটেল বানিয়ে দেয়। পানীয়র দাম ১৭ ডলার। বিলে চোখ বুলিয়ে দেখবেন অতিরিক্ত আরেকটি চার্জ যোগ হয়েছে, ১০ শতাংশ ‘সার্ভিস ফি’, অর্থাৎ রোবটও এখন বকশিশ বা টিপ দাবি করছে!

নিউ ইয়র্কের ‘আর্টলি কফি’র এক রোবট বারিস্তাও টিপ চেয়ে বসে। অন্যদিকে ‘নেওয়ার্ক লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’-এর এমন এক দোকান রয়েছে, যেখানে কোনো কর্মীই নেই, সেখানে সেলফ-চেকআউট মেশিন একটি পানির বোতলের ওপরও বকশিশ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

আবার পোর্টল্যান্ডে ‘টপ বার্মিজ’ রেস্তোরাঁয় খাবার অর্ডার নেন মানুষ। তবে রোবট ওয়েটার এসে টেবিল পর্যন্ত তা পৌঁছে দেয়। সেই মানব ওয়েটারের সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে অনেকে সানন্দে ২০ শতাংশ বকশিশ দেন।

তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। যখন রোবট এসে ডিজিটাল হাত বাড়িয়ে দেয় তখন বকশিশের পুরানো প্রথা বা নিয়ম আর কাজ করে না। কারণ, এই বকশিশের অর্থ আসলে কার পকেটে যাচ্ছে তা একেবারেই স্পষ্ট নয়।

এমনটা কি সেবা বাজারের নতুন স্বাভাবিক নিয়ম, নাকি স্রেফ রোবট যুগের এক ক্ষণস্থায়ী বাতিক? উত্তরটি লুকিয়ে রয়েছে আপনার মানিব্যাগ থেকে কীভাবে অর্থ খরচ করবেন সেই সিদ্ধান্তের ওপরই।

‘টিপসি রোবট’ ও ‘আর্টলি কফি’র প্রতিনিধিরা বলছেন, তাদের গ্রাহকদের দেওয়া সব টিপ কেবল কোম্পানির মানব কর্মীদের মধ্যেই ভাগ করা হয় এবং সেখান থেকে কোম্পানি কোনো অংশ নেয় না।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কর্মী ও গ্রাহক উভয়ের কাছ থেকেই অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক বড় চক্রান্তের অংশ হতে পারে এই ‘রোবো-টিপিং’।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিহাই ইউনিভার্সিটি’র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ও ‘গ্র্যাচুয়াইটি’ বইয়ের সহ-লেখক হোলোনা ওকস বলেছেন, “আমাদের কাছে যথেষ্ট সন্দেহ করার সুযোগ রয়েছে যে, কিছু অসাধু মালিক রোবটের নাম করে বকশিশের অর্থ নিজেদের পকেটে পুরছেন।

“এখন মূল প্রশ্নটা হচ্ছে, এ প্রক্রিয়ায় আদতে লাভবান হচ্ছে কে, আর কার পকেট থেকে অর্থটা যাচ্ছে?”

রোবোটিক টিপিংয়ের আইনি ফাঁকফোকর ও মানবিক দিক

করোনা মহামারীর পর থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের দৌলতে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি জায়গায় বকশিশ দিতে বলা হচ্ছে। টিপের এ প্রস্তাবিত শতাংশের হার দিন দিন বাড়তে থাকায় গ্রাহকরা বিষয়টিকে একপ্রকার ‘আবেগনির্ভর ব্ল্যাকমেইল’ বা বাধ্যবাধকতা বলে অভিযোগ করছেন।

আমেরিকায় লাগামহীন এই টিপ বা বকশিশ সংস্কৃতির যে চর্চা চলছিল তা এখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই নিয়ম নিয়ে চরম বিতর্ক চলছে। কারণ সেখানে গ্রাহকদের দেওয়া টিপ বা বকশিশের ওপর নির্ভর করে মালিকপক্ষ কর্মীদের মূল বেতন অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭ দশমিক ২৫ ডলার হলেও যেসব কর্মী নিয়মিত টিপ পান তাদের ক্ষেত্রে মূল বেতন নেমে আসে কেবল ২ দশমিক ১৩ ডলারে।

মার্কিন আইন অনুসারে, কোনো সাধারণ মানব কর্মীকে টিপ দেওয়া হলে তার কোনো অংশ কোম্পানির মালিক বা সুপারভাইজাররা কেড়ে নিতে পারেন না। তবে কেউ যখন কোনো যন্ত্র বা রোবটকে টিপ দিচ্ছেন তখন সেখানে বড় এক আইনি ফাঁক তৈরি হয়।

অধ্যাপক ওকস বলেছেন, “রোবটের নাম করে সংগৃহীত বকশিশের মালিকানা কার হবে এ বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি।”

ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে কর্মীদের টিপ সংক্রান্ত অভিযোগ তোলার আইনি বিভিন্ন পথ আরও কঠিন করে দেওয়া হয়েছে এবং চাকরি হারানোর ভয়ে অনেকেই তা গোপনে সহ্য করে নেন।

ওকস বলেছেন, “ফলে নিয়োগকর্তারা যদি রোবটের জন্য দেওয়া টিপ নিজেদের পকেটে ভরে থাকেন তবে তা জানার বা প্রমাণের কোনো উপায় এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই।

“অনেক ক্ষেত্রে রান্নাঘরে বা বারের পেছনে কর্মীদের কাজ করতে দেখা গেলেও সেই টিপ হয়ত চলে যাচ্ছে কোনো বড় করপোরেট তহবিলে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।”

তবে এর মানে এই নয় যে, স্বয়ংক্রিয় বিভিন্ন রোবট সেবা খাতের কর্মীদের জন্য কেবলই ক্ষতিকর। ‘টিপসি রোবট’ বা ‘আর্টলি কফি’র মতো জায়গায় রোবটের এই অভিনবত্বই গ্রাহকদের মূল আকর্ষণ, ফলে সেখানে রোবটের পাশাপাশি যেসব মানুষ কাজ করছেন এই প্রযুক্তি না থাকলে হয়ত তাদের সেই চাকরিই হতো না।

‘আর্টলি কফি’র কনটেন্ট ডিরেক্টর অ্যাবিগেইল স্মাদার্স বলেছেন, টিপ নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষের কারণেই তারা ডিজিটাল স্ক্রিনে টিপের অপশন বন্ধ করে দিয়ে কর্মীদের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বর্তমানে কিছু দোকানে টিপ জার রাখা হয়েছে, যার শতভাগ অর্থ পান মানব কর্মীরা। স্মাদার্সের ভাষ্য, “মানুষকে বঞ্চিত করে খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে আমরা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বাস করি না।”

সেবা খাতে কর্মী সংকট রয়েছে এবং মানুষের কর্মসংস্থান না কেড়েই রোবট সেখানে সহায়তা করতে পারে। তবে তিনি বলেছেন, বর্তমানে এমন অনেক জায়গায় এআই বা রোবট বসানো হচ্ছে, যেখানে আসলে তার প্রয়োজন নেই।

“মূল সমস্যাটা এখানেই। প্রযুক্তি নিজে কোনো মন্দ বিষয় নয়, এর নীতি-নৈতিকতা নির্ভর করে মানুষের করা প্রয়োগের ওপর। আমরা সততার সঙ্গে কাজ করতে চাই, যাতে এ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কেবল গুটি কতক মানুষের নয়, বরং সবার উপকারে আসে।”

‘ইউনিভার্সিটি অফ মিসিসিপি’র আতিথেয়তা প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ক্যাটেরিনা বেরেজিনা বলেছেন, এ শিল্পকে আরও কিছুটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত।

“প্রতিটি কোম্পানিই যে কোনো মূল্যে কেবল অর্থ বানানোর ধান্ধায় এগুলো করছে– এমনটা ভাবা ঠিক হবে না।

“রোবট বা যন্ত্রের মাধ্যমে সংগৃহীত টিপ সরাসরি সেই রোবটের মেরামত, আপডেট বা আনুষঙ্গিক শ্রমের খরচ চালাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।”

এ খাতে টিপিং স্বাভাবিক নিয়ম ও বিভিন্ন কোম্পানি বাজারের সীমাবদ্ধতা মেনেই কাজ করে। অন্যদিকে, ‘ওয়ান ফেয়ার ওয়েজ’-এর মতো কর্মী অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, রেস্তোরাঁ খাতে স্বল্প বেতন ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই রোবটের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে, যা কর্মী সংকটের আসল কারণ।

যে যুক্তিই মাঠপর্যায়ে থাকুক না কেন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে চালু থাকা এ ডিজিটাল টিপিং পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আপনার ও অন্যান্য গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়ার ওপর।

টিপ দেবেন, নাকি দেবেন না?

যুক্তরাষ্ট্রের ‘কর্নেল ইউনিভার্সিটি’র ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ‘সাইকোলজি অফ টিপিং’ বইয়ের লেখক মাইকেল লিন বলেছেন, “মানুষ কেন টিপ দেয় তার মূল কারণগুলো একটু ভেবে দেখুন।”

তিনি বলেছেন, সাধারণত ভালো সেবার পুরষ্কার হিসেবে বা কর্মীদের কম বেতনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সহানুভূতিশীল হয়ে মানুষ টিপ দেয়। এর বাইরে সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও লোকলজ্জার ভয় তো রয়েছেই।

লিনের ভাষ্য, মানুষ প্রায়ই ভাবেন ‘টিপ না দিলে তারা আমাকে অপছন্দ করবে’, অর্থাৎ এক ধরনের বাধ্যবাধকতা থেকেই মানুষ টিপ দেয়।

“রোবটের ক্ষেত্রে এর একটি কারণও খাটে না। ফলে রোবটকে টিপ দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণই নেই।”

তবে গবেষণায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। এক সমীক্ষায় কেবল ১১ শতাংশ মানুষ রোবট বারটেন্ডারকে টিপ দেওয়ার পক্ষে সায় দিলেও অধ্যাপক বেরেজিনা বলেছেন, বাস্তবে যারা সরাসরি রোবট বারটেন্ডারের সেবা নিয়েছেন তাদের মধ্যে টিপ দেওয়ার প্রবণতা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি দেখা গেছে।

আবার রোবটকে টিপ দিতে অস্বীকৃতি জানানো ৪২ শতাংশ মানুষ তাদের সিদ্ধান্ত বদলে টিপ দিতে রাজি হয়েছেন যখন তারা জানতে পেরেছেন এই অর্থ কোনো মানব কর্মীর পকেটে যাবে।

এরপরও লিনের যুক্তি, সেবা খাতে রোবটের টিপ নেওয়ার এই চর্চা একেবারেই জনপ্রিয় নয় ও আগামীতেও তাই থাকবে। ব্যবসা বাড়াতে ও মুনাফা তুলতে বিভিন্ন কোম্পানি রোবো-টিপিং চালু করলেও তা যদি গ্রাহকদের দূরে ঠেলে দেয় তবে এ চর্চা অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে।

“টিপিংয়ের কোনো ঈশ্বর নেই এবং কেউ আপনাকে জোর করে টিপ দেওয়াতে পারবে না। সমাজের এসব নিয়ম সাধারণ মানুষের মাধ্যমেই তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা শিগগিরই বিষয়টি বুঝতে পেরে এই ব্যবস্থা থেকে সরে আসবে।

“আমরা ইতিহাস ও সেবাবাজারের বিরক্তিকর এক ক্ষণস্থায়ী সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।”

তবে সবশেষে হাসিমুখে তিনি বলেছেন, “আমি মনে করি এমনটা সাময়িক। তবে হ্যাঁ, যারা ভবিষ্যৎ শতভাগ নিখুঁতভাবে পূর্বাভাস দেওয়ার দাবি করে তারা মিথ্যা বলছে!”