Published : 04 May 2026, 04:51 PM
পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা এডিএইচডি’র মতো জটিলতায় অনেক শিক্ষার্থীই মানসিক অস্থিরতায় ভোগে। শিক্ষার্থীদের এ দুশ্চিন্তা কাটিয়ে মনকে শান্ত করতে লন্ডনের স্কুলগুলোতে এখন পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর প্রযুক্তি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, লন্ডনের সাটন বরোর ১৫টি মাধ্যমিক স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় এনএইচএস মেন্টাল হেলথ ট্রাস্টের সঙ্গে মিলে ‘ফেইজ স্পেস’ নামের এক প্রযুক্তি কোম্পানির তৈরি ভিআর হেডসেট ব্যবহার করছে এসব স্কুল।
ক্লাসের আগে বা ক্লাস চলাকালে খুব বেশি দুশ্চিন্তা বা অস্থিরতা অনুভব করলে আগে থেকে ঠিক করা সময়ে এ ‘ফেইজ স্পেস’ ভিআর প্রোগ্রামটি ব্যবহার করতে পারে শিক্ষার্থীরা। এ পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল সাত মিনিট সময় নেয়।
অল্প সময়ের জন্য হলেও এ ভিআর জগতের ভেতরে ডুবে থাকা তাদের শান্ত হতে সাহায্য করে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং পুনরায় পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।
এ প্রোগ্রামের অন্যতম নির্মাতা জিলা ওয়াটসন বলেছেন, যারা অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তায় ভুগছে সেসব শিক্ষার্থীকে সাহায্য করার জন্য ‘ফেইজ স্পেস’ তৈরি হয়েছে। এর আগে, বিবিসির ভিআর বিভাগের প্রধান ছিলেন জিলা ওয়াটসন।
নর্থ লন্ডনের আর্ক একাডেমি মাধ্যমিক স্কুলেও এসব হেডসেট ব্যবহৃত হচ্ছে। স্কুলটির ভাইস-প্রিন্সিপাল এলিশা নিডহ্যাম বলেছেন, যাদের সামাজিক, আবেগীয় বা মানসিক সমস্যা রয়েছে বা এডিএইচডি ও দুশ্চিন্তায় ভুগছেন সেসব শিক্ষার্থীদের জন্য এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করছেন তারা।
“আমরা সকালের দিকে প্রোগ্রামটি বেশি ব্যবহার করি। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা সকালে বেশ অস্থির বোধ করে, বিশেষ করে যখন তাদের প্রতিদিনের রুটিনে কোনো পরিবর্তন আসে। যেমন, হয়ত নিয়মিত শিক্ষকের বদলে অন্য কোনো শিক্ষক ক্লাস নিতে এসেছেন বা তারা পারিবারিক কোনো কারণে মন খারাপ করে আছে বা সকালে নাস্তা করে আসেনি এমন মুহূর্তে। আবার অনেক সময় বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া বা হোমওয়ার্ক না করার ফলেও তারা দুশ্চিন্তায় থাকে।
“ভিআর ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি শান্ত থাকে। আমরা দেখছি যে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ার হারও অনেক কমেছে। আগে শিক্ষার্থীরা অস্থির হয়ে পড়লে তাদের ক্লাস থেকে সরিয়ে নিতে হত। এখন শিক্ষার্থীরা যখনই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তারা নিজেরাই এ প্রোগ্রামটি ব্যবহারের অনুরোধ করে, যা ইতিবাচক পরিবর্তন।
“কারণ আগে তারা অস্থির হয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্কুলের আশপাশে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত।” শিক্ষার্থীরা নিজেদের মানসিক স্থিরতা ফিরে পেতে ও বাস্তবতায় থিতু হতে এ প্রোগ্রামটি ব্যবহার করে।
‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’ এর ভিজিটিং প্রফেসর ও এ প্রোগ্রামের সহ-উদ্যোক্তা জিলা ওয়াটসন বলেছেন, প্রথম ১০টি স্কুলে যারা এ হেডসেট ব্যবহার করেছে তাদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ তাৎক্ষণিকভাবে কমেছে।
এ প্রোগ্রামের ফলে শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতির হার ও আচরণে উন্নতি এসেছে এবং পরীক্ষা বা মূল্যায়নের কারণে তৈরি হওয়া দুশ্চিন্তাও কমেছে।
১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লোরা উইলসন বর্ণনা করেছেন, কীভাবে ‘ফেইজ স্পেস’ তার দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করেছে। সে বলেছে, “শুরুতে আপনি নিজেকে একটি খালি ঘরে দেখতে পাবেন যেখানে কিছুই নেই। এরপর ঘরের আলো আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসবে এবং আশপাশ প্রায় অন্ধকার হয়ে যাবে।
“ঠিক তখনই অন্ধকারের মাঝখান থেকে আলোর আভা আপনার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করবে, যা আপনাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি দেবে, যা ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন, তবে অভিজ্ঞতাটি দারুণ। মনে হয় যেন আমি অন্য কোথাও আছি যেখানে আমি কেবল শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারছি।”
শিক্ষার্থীরা বলেছে, এর ফলে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও কোনো নির্দেশ বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে। কারণ ভিআর ব্যবহারের পর তাদের মানসিকতা অনেক বেশি শান্ত ও ভারমুক্ত থাকে। অথচ এর আগে তাদের মন নানা এলোমেলো চিন্তায় জট পাকিয়ে থাকত।