Published : 14 Sep 2026, 03:11 PM
ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির শুরুর দিনগুলোতে রাউটারে একটি অ্যান্টেনা থাকত, যা একবারে কেবল একটি ওয়্যারলেস ডেটা স্ট্রিম পরিচালনা করতে পারত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে ও প্রতিটি বাড়িতে ডিজিটাল ডিভাইসের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে।
এর ফলে রাউটারে অ্যান্টেনার সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বেড়ে বর্তমানে আটটি পর্যন্ত অ্যান্টেনাওয়ালা রাউটার বাজারে দেখা যায়।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রথম নজরে একাধিক অ্যান্টেনাওয়ালা রাউটারগুলোকে কেবল মার্কেটিং কৌশল বলে মনে হলেও একটি অ্যান্টেনা দিয়ে বর্তমান যুগের চাহিদা পূরণ না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও প্রযুক্তিগত কারণ রয়েছে।
সেই অদ্ভুত মাকড়সার মতো দেখতে আট অ্যান্টেনার বিভিন্ন রাউটারেও সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে সেটি সবার জন্য প্রয়োজন।
একটি অ্যান্টেনাকে সিঙ্গেল-লেন বা এক লেনের রাস্তার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে একটি ছোট শহরে ওই এক লেনের রাস্তাটিই যথেষ্ট। তবে একটি ব্যস্ত শহরে সেই একই রাস্তা থাকলে দ্রুত তীব্র যানজট তৈরি হয়।
ইন্টারনেটের শুরুতে যখন এর প্রধান কাজ ছিল ইমেইল আদান-প্রদান তখন একটি অ্যান্টেনা যথেষ্ট ছিল। তবে বর্তমান চিত্র আলাদা। ফলে নির্মাতারা কেবল এক লেনের রাউটার তৈরির পরিবর্তে এমন সব রাউটার তৈরি শুরু করেন, যা ‘মাল্টিপল ইনপুট, মাল্টিপল আউটপুট’ বা মিমো নামে বিশেষ এক কৌশলের সাহায্যে একসঙ্গে একাধিক লেনের ট্রাফিক পরিচালনা করতে পারে।
এ প্রযুক্তিটিই একাধিক অ্যান্টেনাকে কার্যকরী করে তোলে। কারণ, বেশিরভাগ মানুষের ধারণার বিপরীতে, মিমো প্রযুক্তি ছাড়া কেবল অতিরিক্ত অ্যান্টেনাওয়ালা করলে উপকারের চেয়ে সমস্যাই বেশি তৈরি হয়।
একাধিক অ্যান্টেনার কাজ ও কার্যকারিতা
মিমো প্রযুক্তির সুবাদে একাধিক অ্যান্টেনাওয়ালা রাউটার ‘স্পেসিয়াল মাল্টিপ্লেক্সিং’ নামের এক কৌশলের মাধ্যমে আরও বেশি ডেটা বহন করতে পারে। ফলে বেশি অ্যান্টেনার কারণে ডেটা চলাচলের জন্য অতিরিক্ত লেনের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে কেবল বেশি অ্যান্টেনা থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা লেন বেড়ে যায় না। এসব লেনকে আলাদা ডেটা পথে রূপান্তরের জন্য রাউটারে সঠিক অভ্যন্তরীণ হার্ডওয়্যারও থাকতে হয়।
একাধিক অ্যান্টেনার আরেকটি বড় ব্যবহার হচ্ছে ‘বিমর্মিং’। সহজ ভাষায়, একাধিক অ্যান্টেনার সাহায্যে রাউটার বুঝতে পারে আপনার ডিভাইসটি ঠিক কোথায় রয়েছে ও সরাসরি সেই নির্দিষ্ট ডিভাইসের দিকে সিগনাল ফোকাস করতে পারে।
যত বেশি অ্যান্টেনা থাকে, রাউটার কাজটি তত নিখুঁতভাবে করতে পারে। কারণ প্রতিটি অতিরিক্ত অ্যান্টেনা একে সিগনাল আরও ভালোভাবে সূক্ষ্মভাবে টিউন করার সুযোগ দেয়।
পুকুরে একাধিক ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট সময়ে পাথর নিক্ষেপের উদাহরণের মতো এদের তৈরি ঢেউগুলো যেমন নির্দিষ্ট স্থানে এসে আরও শক্তিশালী তরঙ্গ তৈরি করতে পারে, বিমর্মিং ঠিক একই কারণে একাধিক অ্যান্টেনা ব্যবহার করে।
রাউটার এসব অ্যান্টেনার সিগনালকে এমনভাবে সমন্বয় করে যেন তা ডিভাইসের আশপাশে একত্র হয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যেখানে একটিমাত্র অ্যান্টেনার সঙ্গে সিগনাল সমন্বয়ের কোনো সুযোগ থাকে না।
এ ছাড়া সিগনাল ডাইভারসিটি ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও একাধিক অ্যান্টেনার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি ঘরের ভেতর ওয়াই-ফাই সিগনাল সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না, বরং দেয়াল, আসবাবপত্র, ধাতব বস্তু ও মানুষের গায়ে বাধা পেয়ে চারদিকে প্রতিফলিত হতে থাকে।
ফলে ভিন্ন স্থানে ছড়ানো একাধিক অ্যান্টেনা থাকলে অন্যগুলোতে সিগনাল দুর্বল হলেও একটি অ্যান্টেনা পরিষ্কার সিগন্যাল নিশ্চিত করতে পারে।
পাশাপাশি, ‘এমইউ-মিমো’ প্রযুক্তির কার্যকারিতার জন্যও একাধিক অ্যান্টেনা জরুরি। পুরনো বিভিন্ন রাউটার এক সময়ে কেবল একটি ডিভাইসে সেবা দিত ও দ্রুত গতিতে পরবর্তী ডিভাইসে সাইকেল পরিবর্তন করত।
‘এমইউ-মিমো’ প্রযুক্তির মাধ্যমে রাউটার তার অ্যান্টেনা অ্যারে’কে এমনভাবে বিভক্ত করে যে এটা একইসঙ্গে একাধিক ডিভাইসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
কাদের জন্য কোন রাউটার উপযোগী
ব্যবহারকারী বা অধিকাংশ পরিবারের জন্য আট অ্যান্টেনার রাউটার ব্যবহার করা অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত। দুই থেকে চারটি অ্যান্টেনাওয়ালা একটি ভালো মানের রাউটারই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হতে পারে।
কেবল অ্যান্টেনার সংখ্যাই শেষ কথা নয়। একটি রাউটারের সার্বিক পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে ওয়াই-ফাই স্ট্যান্ডার্ড ও সফটওয়্যারও বড় ভূমিকা রাখে।
কারো যদি কভারেজ বা নেটওয়ার্কের পরিধি নিয়ে সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ থাকে তবে আট অ্যান্টেনার রাউটার যৌক্তিক পছন্দ হতে পারে। কারণ, কভারেজ উন্নত করার জন্য কারো কাছে তখন ব্যবহারের মতো বেশি অ্যান্টেনা থাকবে। কভারেজের সমস্যার ক্ষেত্রে কেবল অ্যান্টেনা বাড়ানোর চেয়ে ‘মেশ নেটওয়ার্ক’ সেটআপ করা বেশি নির্ভরযোগ্য সমাধান।
অন্যদিকে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, যেমন অফিস, ক্যাফে বা এমন কোনো স্থানে যেখানে একইসঙ্গে অনেক মানুষ সংযোগ থাকলে সেখানে বেশি অ্যান্টেনা ও ডেটা স্ট্রিমওয়ালা উচ্চ সক্ষমতার রাউটার বেশ কার্যকর হতে পারে।
এক্ষেত্রেও মনে রাখা জরুরি, অ্যান্টেনার সংখ্যার পাশাপাশি ওয়াই-ফাই স্ট্যান্ডার্ড ও সফটওয়্যারই একসঙ্গে বহু ডিভাইস সংযোগ থাকার পরও নেটওয়ার্ক সচল ও মসৃণ রাখতে প্রধান ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া, একাধিক অ্যান্টেনাওয়ালা নতুন ও দেখতে আধুনিক কোনো ওয়াই-ফাই রাউটার মানেই ইন্টারনেটের গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে এমন নয়।
দিনের শেষে কারো ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ গতি তার ব্রডব্যান্ড বা মোবাইল ডেটা প্ল্যানের ওপরই সীমিত থাকে। নতুন আট পায়ের মাকড়সার মতো দেখতে রাউটার জাদুকরী উপায়ে সেই সীমা লঙ্ঘন করতে পারবে না।