Published : 13 Apr 2026, 05:08 PM
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্কগুলোতে বিলুপ্তপ্রায় পাখির সংখ্যা বাড়াতে অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম পালক ও বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে হুবহু আসল পাখির মতো দেখতে রোবট পাখি।
এসব রোবট নাচের ভঙ্গিতে চলাফেরা করে এবং ডাক নকল করে আসল পাখিদের নতুন ও নিরাপদ আবাসস্থলে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
কাজটি সফল হলে বন্যপ্রাণী রক্ষায় এ প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
বিজ্ঞানীরা ও পার্ক ব্যবস্থাপকরা এখন ক্রমেই এমন সব রোবটিক ডিকয় বা কৃত্রিম পাখির সাহায্য নিচ্ছেন, যা দেখতে হুবহু আসল পাখির মতো, বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে বা পাখিরা এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে, সেখানে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।
বর্তমানে ওয়াইয়োমিং অঙ্গরাজ্যের ‘গ্র্যান্ড টিটন ন্যাশনাল পার্ক’-এ এমনই এক উন্নত প্রকল্পের কাজ চলছে, যার লক্ষ্য বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ ও পুনর্গঠিত পরিবেশে ফিরিয়ে আনা।
এসব কৃত্রিম পাখিকে বাস্তবসম্মত রূপ দিতে বেশ কিছু চমৎকার কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, কিছু পাখিতে ‘ওয়াইয়োমিং গেইম অ্যান্ড ফিশ ডিপার্টমেন্ট’-এর দেওয়া আসল পালক লাগানো হয়েছে।
আবার কিছু পাখি তৈরি হয়েছে সাধারণ সব জিনিস দিয়ে, যেমন ‘টিজে ম্যাক্স’ থেকে কেনা সাদা কম্বল বা ‘হ্যালোফ্রেশ’ মিল কিটের ফোম।
এসব যন্ত্র তৈরিতে স্থানীয় হাই স্কুল শিক্ষার্থীদের সাহায্য করেছেন রোবোটিক্স মেন্টর গ্যারি ডুকেটে। তিনি মজার ছলে এগুলোকে ‘ফ্রাঙ্কেনবার্ড’ বা জোড়াতালি দিয়ে বানানো পাখি বলে বর্ণনা করেছেন।
এসব রোবট-গ্রাউসগুলোকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে, যাতে এরা পাখিদের বিশেষ প্রজননকালীন আচরণ বা নাচ নকল করতে পারে। এগুলো রেকর্ড করা ডাকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচের ভঙ্গিতে চলাফেরা করে।
ডুকেটে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এসব যন্ত্র অনেকটা ‘একবার ঘোরে, আবার ঘোরে, তারপর তাদের ডানা ঝাপটায়’, বিষয়টি ঠিক যেমন আসল পাখিরা করে থাকে।
পার্কের মুখপাত্র এমিলি ডেভিস বলেছেন, তারা আশা করছেন এসব যন্ত্র জ্যান্ত প্রজনন ক্ষেত্রের পরিবেশ তৈরি করবে। ফলে আসল ‘সেজ গ্রাউস’ বা বড় ধরনের চাতক বা বনমোরগ পাখিগুলো উদ্বুদ্ধ হবে এবং এ পুনর্গঠিত এলাকায় নিজেদের প্রদর্শন ও বাসা বাঁধার কাজ শুরু করবে।
যেহেতু এ পাখিদের ছানারা প্রজনন কেন্দ্রের আশপাশেই বড় হয় ফলে কৃত্রিমভাবে পাখিদের আকৃষ্ট করতে পারলে ধীরে ধীরে স্থানীয়ভাবে এদের সংখ্যা আবার বাড়িয়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইয়োফাইল’-এর তথ্য অনুসারে, ১৯৬৫ সাল থেকে আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে এই গ্রাউস পাখির সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। জ্যাকসন হোলের এক প্রজনন কেন্দ্রে ১৯৫০ সালে যেখানে ৭৩টি পুরুষ সেজ গ্রাউস দেখা যেত গেল বছর সেখানে কেবল তিনটির দেখা মিলেছে।
এ প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ এদের আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ড। উদ্যানের দক্ষিণ অঞ্চলের ঝোপঝাড়পূর্ণ সমতল বিভিন্ন ভূমি একসময় পাখিদের জন্য আদর্শ ছিল তা কয়েক দশক ধরে গবাদি পশুর অবাধ বিচরণ ও ঘাস খাওয়ার ফলে নষ্ট হয়েছে। ফলে পাখিদের খাবারের উৎস ও জায়গা কমেছে।
বর্তমানে সেখানে গবাদি পশু পালন বন্ধ করা হয়েছে ও বছরের পর বছর ধরে প্রকৃতি পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে, বিশেষ করে কাছের জ্যাকসন হোল বিমানবন্দরটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জাতীয় উদ্যানের ভেতর অবস্থিত একমাত্র বিমানবন্দর।
ডেভিসের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্লেন সংক্রান্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৩২টি পাখি মারা গেছে।
এসব ঝুঁকি কমাতে পার্কের কর্মকর্তা ও বিমানবন্দরের কর্মীরা রানওয়ের দক্ষিণ দিকে প্রায় ১০০ একর চারণভূমি পুনর্গঠনের কাজ করেছেন। সেখানে তারা আদি ও স্থানীয় গাছপালা পুনরায় রোপণ ও পাখিদের অবাধ প্রজননের জন্য উন্মুক্ত মাঠের ব্যবস্থা করেছেন।
ডেভিস বলেছেন, “প্রকৃতি পুনর্গঠনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আপনি হয়ত বন্যপ্রাণীদের জন্য চমৎকার এক আবাসস্থল তৈরি করে দিলেন। তবে তার মানে এই নয় যে, এরা সঙ্গেই সঙ্গেই সেখানে চলে আসবে।”
এ বছরের প্রজনন মৌসুম মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। এ সময়ে গবেষকরা ট্রেইল ক্যামেরা বা এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করবেন।
তারা দেখবেন, আসল ‘সেজ গ্রাউস’ পাখিরা রোবটিক প্রদর্শনীর প্রতি কোনো সাড়া দেয় কি না ও পুনর্গঠিত বিভিন্ন প্রজনন ক্ষেত্রে ফিরে আসে কি না।
কর্মকর্তারা বলেছেন, এ উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়া অন্যান্য জাতীয় উদ্যানগুলোতেও এ ধরনের রোবটিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।