Published : 13 Jan 2026, 01:07 PM
বিশ্বের সবচেয়ে ছোট স্বয়ংক্রিয় রোবট তৈরি করেছেন বিশেষজ্ঞরা, যা নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে ও টানা কয়েক মাস সচল থাকতে পারে বলে দাবি তাদের।
অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখার মতো ক্ষুদ্র এ রোবটটি লবণের দানার চেয়েও ছোট।
রোবটি তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান’-এর একদল গবেষক। তাদের দাবি, এসব রোবটের বিশাল দল চিকিৎসা থেকে শুরু করে উৎপাদন শিল্প পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
রোবটটির ভেতরেই সেন্সর ও কম্পিউটার রয়েছে। সেই সঙ্গে এতে রয়েছে ছোট ছোট সৌর প্যানেল, যার ফলে কোনো বাইরের বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই তা নিজে নিজেই চলতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্ট।
এসব সম্ভব করার জন্য গবেষকদের নতুন করে ভাবতে হয়েছে, বিশেষ করে এক মিলিমিটারের চেয়েও ছোট আকারের একটি রোবট কীভাবে কাজ করতে পারে তা নিয়ে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া’র ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও এ রোবট তৈরির নেতৃত্বে থাকা মার্ক মিসকিন বলেছেন, “রোবটিক্স ক্ষেত্রটি মূলত গত ৪০ বছর ধরে এই একটি সমস্যাতেই আটকে ছিল।
আসল জটিলতা হচ্ছে ‘সারফেস ফোর্স’ বা পৃষ্ঠতল-সংশ্লিষ্ট বল নিয়ে, যা অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখার মতো ক্ষুদ্র পর্যায়ে চলাফেরার ধরনকে বদলে দেয়।
ক্ষুদ্র বস্তুর ক্ষেত্রে মাধ্যাকর্ষণ বা জড়তার চেয়ে বাতাসের বাধা ও তরলের ঘনত্ব বা আঠালো ভাব বেশি প্রভাব ফেলে। মানে সাধারণ রোবটের মতো হাত-পা বা অন্য কোনো প্রচলিত নকশা এসব ছোট রোবটের ক্ষেত্রে কাজ করে না।
মিসকিন বলেছেন, “আপনি যদি যথেষ্ট ছোট হন তবে পানির ওপর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেকটা আলকাতরার মধ্য দিয়ে ঠেলে যাওয়ার মতো কঠিন হবে। এ আকারের জন্য খুব ছোট ছোট হাত-পা তৈরি করা যেমন কঠিন তেমনই সেগুলো ভেঙে ফেলাও খুব সহজ।”
এর বদলে এসব রোবটের চলাচলের জন্য এমন নতুন এক পদ্ধতি তৈরি করেছে গবেষক দলটি, যা পদার্থবিজ্ঞানের পরিবর্তনজনিত এসব বাধাকে কাটিয়ে উঠতে পারে।
নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র অনুসারে, প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। আর তা ব্যবহার করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বদলে এসব রোবট একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ব্যবহার করে, যা রোবটটির সামনের চার্জওয়ালা বিভিন্ন কণাকে গতিশীল করার মাধ্যমে একে এগিয়ে নিয়ে যায়।
এদের যখন কোনো তরল পদার্থের মধ্যে রাখা হয় তখন এসব গতিশীল কণা এদের আশপাশের বিভিন্ন কণাকেও টেনে নিয়ে যায়। ফলে টানের তৈরি হয়, যা রোবটটিকে কার্যকরভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
মিসকিন বলেছেন, “বিষয়টি এমন যেন রোবটটি বহমান এক নদীতে আছে। তবে নদীটি যে প্রবাহিত হচ্ছে তা ওই রোবটটিই ঘটাচ্ছে।”
পদ্ধতিটি ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন রোবট দিক পরিবর্তন, অন্যান্য রোবটের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাফেরা এবং প্রতি সেকেন্ডে নিজেদের শরীরের দৈর্ঘ্যের সমান গতিতে ছুটতে পারে। এসব কিছুই সম্ভব হয় কোনো নড়াচড়া করার মতো যন্ত্রাংশ, যেমন পা বা চাকা ছাড়াই।
মিসকিন বলেছেন, “এ কেবল শুরু। আমরা প্রমাণ করেছি, খালি চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্র কোনো কিছুর ভেতরেও মস্তিষ্ক, সেন্সর ও মোটর বসানো সম্ভব এবং তা মাসের পর মাস টিকে থেকে কাজও করতে পারে।
“একবার এ কাঠামোটি তৈরি হয়ে গেলে এর ওপর সব ধরনের বুদ্ধিমত্তা ও কার্যকারিতা যোগ করা সম্ভব। অণুবীক্ষণিক বা মাইক্রোস্কেল রোবোটিক্সের ক্ষেত্রে নতুন ভবিষ্যতের দুয়ার খুলে দিচ্ছে এ পদ্ধতি।”
এ রোবটের মস্তিষ্ক ক্ষুদ্র এক ইলেকট্রনিক কম্পিউটার, যাতে রয়েছে প্রসেসর, মেমরি ও সেন্সর। এক মিলিমিটারের চেয়েও ছোট প্রথম রোবট এটি, যা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান’-এর অধ্যাপক ডেভিড ব্লউ বলেছেন, “রোবটটি তৈরিতে আমাদের কম্পিউটার প্রোগ্রামের বিভিন্ন নির্দেশনা নিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ভাবতে হয়েছে।” কম্পিউটারটি তৈরি হয়েছে তার গবেষণাগারেই।
“সাধারণত চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক নির্দেশের প্রয়োজন হয়। সেগুলোকে একটিমাত্র বিশেষ নির্দেশে রূপান্তর করতে হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, প্রোগ্রামের আকার ছোট করা, যাতে তা রোবটের অতি ক্ষুদ্র মেমরিতে ধরে যায়।”
এ রোবটে থাকা বিভিন্ন সেন্সরের মধ্যে একটি সেন্সর তাপমাত্রা মাপতে পারে, যা মানবদেহের ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট বা একক কোনো কোষ পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
তাপমাত্রা কত তা জানানোর জন্য অধ্যাপক ব্লউ বলেছেন, এসব রোবট এক ধরনের ‘ছোট্ট নাচ’ করে, যা ক্যামেরাওয়ালা একটি মাইক্রোস্কোপ বা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে দেখে এর মানে উদ্ধার করা সম্ভব।
‘মাইক্রোস্কোপিক রোবটস দ্যাট সেন্স, থিঙ্ক, অ্যাক্ট, অ্যান্ড কম্পিউট’ শিরোনামে রেকর্ড তৈরিকারী এ রোবটটির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স রোবোটিক্স’-এ।