Published : 03 Aug 2026, 01:00 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো নিখুঁত ও চটকদার জীবনযাত্রার ভিড়ে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘একাকী জীবন’ বা সলো লিভিং।
লোকলজ্জা কাটিয়ে নিজেদের পছন্দসই নির্জন জীবন তুলে ধরে ইন্টারনেটে নতুন সাড়া ফেলেছেন একদল নারী ইনফ্লুয়েন্সার, যাদের মূল বার্তা, একাকীত্ব মানেই হতাশা বা নিঃসঙ্গতা নয়, বরং স্বাধীনভাবে বাঁচার এক নতুন স্বস্তি।
বিবিসি লিখেছে, টিকটকে ৭০ লাখেরও বেশি দেখা এক জনপ্রিয় ভিডিওর কেন্দ্রে রয়েছেন লানা ইসা নামের একজন নারী, যিনি টরন্টোর একজন সফটওয়্যার সেলস ম্যানেজার।
প্রতি রাতের ‘সেলফ-কেয়ার’ রুটিন সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারের পাশাপাশি টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের প্রায় চার লাখ অনুসারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গভীর রাতে ফাস্টফুড কিনতে গাড়ি নিয়ে বেরানো, লেকের পাড়ে পাথরে বসে বই পড়া, মাঝরাতে অ্যাপার্টমেন্টে তালা লেগে আটকে পড়ার মতো ব্যক্তিগত জীবনের বৈচিত্র্যময় মুহূর্তগুলোও ফ্রেমবন্দি করেন লানা।
সামাজিক মাধ্যমের চাকচিক্য ও অতিরিক্ত কোলাহলের বিপরীতে গিয়ে লানা ইন্টারনেটের এমন এক উদীয়মান ও বিশেষ ভাবধারার অংশ হয়ে উঠেছেন, যেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা, বিশেষ করে নারীরা নিজেদের একাকী বসবাসের দৈনন্দিন জীবনের গল্প শেয়ার করেন। সেইসব ভিডিওতে ফুটে ওঠে শান্তি ও নির্জনতাকে গুরুত্ব দেওয়া এক জীবনধারা।
লানার কাছে জীবনের এই ‘কোনো বন্ধু না থাকা’ বিষয়টি স্রেফ কোনো নজরকাড়া ক্যাপশন নয়, বরং গত কয়েক বছর ধরে বাস করা তার জীবনের বাস্তবতা।
একা, কিন্তু নিঃসঙ্গ নন
বেশ কয়েকবার হাই স্কুল বদল, কলেজ জীবনে কোভিডকালের বিচ্ছিন্নতা ও জীবনে প্রথম হৃদয়ভাঙার পর দেশজুড়ে নতুন শহরে পাড়ি দেওয়ার মতো ঘটনার পর লানা নিজেকে এমন এক পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করেন, যেখানে কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়াই সম্পূর্ণ একা মানিয়ে নিতে শেখা ছাড়া তার উপায় ছিল না।
তিনি বলেছেন, “মানুষ বন্ধু না থাকার বিষয়ে খুব একটা কথা বলেন না... আমার মনে হয় মানুষ এটাকে এখনও কিছুটা লোকলজ্জার বিষয় বা ট্যাবু বলেই মনে করেন।”
সামাজিক মাধ্যমে কোনো বন্ধু না থাকা বা একা থাকার এসব গল্প শেয়ার করতে করতে লানা অনেক মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন। টিকটকে কেবল দুই হাজার অনুসারী নিয়ে যাত্রা শুরু করা লানার ফলোয়ার সংখ্যা আট মাসের মধ্যে পৌনে দুই লাখে গিয়ে ঠেকেছে।
লানা বলেছেন, “আমারই মতো একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্য মানুষদের দেখতে পাওয়াটা ছিল চোখ খুলে দেওয়ার মতো এক অভিজ্ঞতা... আর এতদিন পর আমার মনে হল, অবশেষে আমি অন্যদের জীবনের সঙ্গে নিজের অনুভূতিগুলো মেলাতে পারছি।”
অনেক অনুসারীই লানার এ জীবনযাত্রায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছেন। তার ভিডিওর কমেন্ট বক্সে প্রতিদিন জমে উঠতে থাকে একই ধরনের একা থাকা বা বন্ধুহীন মানুষের অনুভূতির প্রকাশ, যারা এতদিন পর অবশেষে নিজেদের ‘উপলব্ধি করতে পারা’ কোনো জায়গা খুঁজে পেয়ে মানসিক স্বস্তি পাচ্ছিলেন।
ইন্টারনেটের আর ১০টি ট্রেন্ডের মতোই শুরুতে কৌতূহল থাকলেও দ্রুতই তা সমালোচনার মুখে পড়ে। লানা ও তার মতো অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ‘লোনলিনেস ইনফ্লুয়েন্সার’ বা নিঃসঙ্গতার প্রভাবক হিসেবে বর্ণনা করেছেন সমালোচকরা।
অনেকেই তাদের সামাজিক সংকটে থাকা ‘হতাশ, একাকী ও সন্তানহীন নারীদের’ দলের অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
কেউ কেউ আবার অভিযোগ করে বলেছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগ বা মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলে একাকী জীবনকে রোমান্টিক রূপ দিচ্ছেন এবং এক ধরনের আরামদায়ক ‘পরাজয়বাদী মানসিকতাকে’ উৎসাহিত করছেন।
তবে তাদের তৈরি এসব ভিডিও এমন এক জীবনযাত্রাকে তুলে ধরে, যা অনেকের স্বীকার করার চেষ্টার চেয়েও বেশি বাস্তব ও অনুভূতির কাছাকাছি। এসব নারী একা একাই ডেটে যান, হুটহাট একা দূরদূরান্তে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন, দলবেঁধে বা একা অনুষ্ঠানে যাওয়ার অস্বস্তিটুকু কাটিয়ে ওঠেন নিজে নিজেই।
একাকীত্বের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রয়াস
যুক্তরাষ্ট্রে অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সে বসবাসকারী দেবন নোয়ারিং পেশায় একজন ফুল-টাইম কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ। পোষা কুকুরকে নিয়ে ছুটির দিনে ঘরে রান্না করা আর অলস সময় কাটানোর মতো ঘটনাকে যখন স্রেফ ‘নারীদের একাকীত্বের লক্ষণ’ হিসেবে ছোট করে দেখা হয় তখন তা বেশ হতাশাজনক বলে মনে করেন তিনি।
এমন মন্তব্য আর আমরা যে বার্তা দিতে চাই এরা সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি স্রেফ ‘একা থাকা মানেই নিঃসঙ্গ হওয়া’ এ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটাকে ঘৃণা করি।”
দেবনের কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছে তবে ছোটবেলা থেকেই সামাজিক উদ্বেগ বা ‘সোশাল অ্যাংজাইটি’র কারণে চুপচাপ থাকায় নিজেকে নিয়ে তিনি সবসময় এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগতেন।
তবে ইন্টারনেটে নিজের এসব দ্বিধার কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করার পরই তিনি খুঁজে পান হাজার হাজার এমন অনুসারী, যারা নিজেরাও অন্তর্মুখী ও দেবনের এ লড়াইয়ের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারেন।
দেবনের ভাষায়, “একা থাকার বিভিন্ন মুহূর্ততেই আমি নিজেকে সবচেয়ে স্বাধীন ও নিজের আসল রূপ খুঁজে পাই। এভাবেই আমি শক্তি পাই। এভাবে স্বাধীন হতে পেরে এবং একা একা সব কাজ করতে পেরে আমি নিজেকে নিয়ে গর্বিত... আমার মনে হয় এ স্বাধীনতাকে উদযাপন করা উচিত।”
গবেষকদের মত ও সতর্কবার্তা
স্বাস্থ্য খাতের গবেষকরাও একাকীত্বের এ সামাজিক কুসংস্কার বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে কাজ করছেন। তাদের মতে, পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে হওয়া ‘দীর্ঘমেয়াদী একাকীত্ব’ ও নিজস্ব পছন্দে বা স্বাধীনভাবে একা সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত এই দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি’র সামাজিক যোগাযোগ ও একাকীত্ববিষয়ক গবেষক ও এপিডেমোলোজিস্ট অধ্যাপক মেলোডি ডিং বলেছেন, “জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রত্যেকেই একা বা নিঃসঙ্গ অনুভব করেন তবে অনেকেই সেটা স্বীকার করতে চান না। এর ফলেই মিথ্যা প্রত্যাশার জন্ম হয় যে, আপনাকে সবসময় মানসিকভাবে সুখী ও সবার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।”
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইনফ্লুয়েন্সাররা একা থাকাকে যতটাই ‘আকর্ষণীয়’ করে তুলুক না কেন, মানুষ দিনশেষে সামাজিক প্রাণী। অতিরিক্ত বিচ্ছিন্নতার চক্রে আটকে পড়া একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
“আমরা সামাজিক প্রজাতি, সঙ্গী ও আশপাশে মানুষ থাকলে আমাদের টিকে থাকা ও বেঁচে থাকা সহজ ও স্বাভাবিক হয়।”
অধ্যাপক মেলোডি ডিং বলেছেন, জীবনের বিভিন্ন ধাপে মানুষের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা একেক রকম হতে পারে। তবে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলা বা বন্ধহীন মানুষের ক্ষেত্রে তার পরামর্শ হচ্ছে, তারা যেন জীবনের এ ‘বন্ধুহীন’ দিকটিকে গুরুত্ব দেওয়া কমিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে নতুন ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।