১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মার্কিন এআই দিয়ে নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করছে চীন?

মার্কিন এআই মডেলকে কারিগরি তথ্যের অন্যতম উৎস হিসেবে দেখছে চীনের প্রতিরক্ষা খাত, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমিয়ে আনতে সাহায্য করছে।

মার্কিন এআই দিয়ে নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করছে চীন?
আমেরিকা-চীন এআই গভর্ন্যান্স ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার ঠিক মুখে এ বিষয়টি এক বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Aug 2026, 11:48 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

যুক্তরাষ্ট্রের এআই কোম্পানি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলের আউটপুট ব্যবহার করে নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে চীনের গবেষকরা।

রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চীনের ৮০টিরও বেশি একাডেমিক গবেষণা ও পেটেন্ট পর্যালোচনা করে এই তথ্য মিলেছে।

প্রতিবেদন বলছে, ওয়াশিংটন উন্নত মেমরি চিপ ও কৌশলগত প্রযুক্তিতে বেইজিংয়ের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে বিধিনিষেধ জারির পরও চীনের সামরিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানি কীভাবে মার্কিন এআই মডেলগুলোকে ‘শর্টকাট’ হিসেবে ব্যবহার করে নিজস্ব বিশেষায়িত সিস্টেম তৈরি করছে তার এক বিরল চিত্র সামনে এসেছে।

গবেষণাপত্রগুলোতে ‘মডেল ডিস্টিলেশন’ নামের বহুল ব্যবহৃত কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী এআই সিস্টেমের আউটপুট ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত ছোট ও বিশেষায়িত মডেল তৈরি করে তা স্থানীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়।

ফলে একেবারে শুরু থেকে বড় ধরনের সামনের সারির এআই সিস্টেম তৈরিতে যে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং পাওয়ারের প্রয়োজন হয়, ‘মডেল ডিস্টিলেশন’-এ তার দরকার পড়ে না।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’-এর সংকলিত ও রয়টার্সের হাতে আসা তথ্য অনুসারে, চীনা লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ ও অন্যান্য সামরিক কোম্পানির গবেষকদের মধ্যে এই ‘ডিস্টিলেশন’ পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

গবেষণাপত্রগুলোয় ইঙ্গিত মিলেছে, মার্কিন বিভিন্ন এআই মডেলকে কারিগরি তথ্যের অন্যতম উৎস হিসেবে দেখছে চীনের প্রতিরক্ষা খাত, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের প্রযুক্তিগত ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে আনতে সাহায্য করছে।

মূল বিতর্কটি ‘ডিস্টিলেশন’ প্রক্রিয়া নিয়ে নয়, যা প্রযুক্তি খাতে বেশ সাধারণ একটি চর্চা; বরং বিতর্ক তৈরি হয়েছে মার্কিন বিভিন্ন মডেলের তথ্য নিষ্কাষণ অভিযোগ ঘিরে।

আমেরিকা-চীন এআই গভর্ন্যান্স ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার ঠিক মুখে এ বিষয়টি এক বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কিছু চীনা কোম্পানি মার্কিন এআই মডেলের সক্ষমতা অবৈধভাবে রপ্ত করে তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন ও মেধাস্বত্ত অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।

অন্যদিকে, চীন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ওয়াশিংটন প্রযুক্তির জগতে নিজেদের ‘আধিপত্য’ বা মোড়লপনা ধরে রাখতে চাইছে। সেই সঙ্গে চীনা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে আসন্ন এআই গভর্ন্যান্স ও নিরাপত্তা বিষয়ক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আগে এটি প্রধান বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চীনের কিছু কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের এআই মডেলগুলোর গভীর সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল গোপনে হাতিয়ে নিয়ে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গ ও মেধাস্বত্ত লঙ্ঘন করছে।

তবে চীন এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।

চীনা ডেভেলপাররাও তাদের প্রযুক্তিগত সাফল্য বিদেশি মডেলের ওপর নির্ভর করার দাবি নস্যাৎ করেছেন। এআই স্টার্টআপ ‘মুনশট’ গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসনের উত্থাপিত অভিযোগ খণ্ডন করে বলেছে, নতুন ‘কিমি কে৩’ মডেলটি তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনের ফসল, এ কোনো মার্কিন মডেলের কপি বা ডিস্টিলেশন নয়।

সংকলিত ৬০টিরও বেশি গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করে ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’-এর ফেলো সানি চেউং বলেছেন, চীনা সামরিক বিজ্ঞানীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পশ্চিমা বিভিন্ন এআই মডেলের সমস্যা সমাধানের প্রতিটি ধাপ বা ‘যুক্তি’ অনুকরণ করছে।

লক্ষ্য হচ্ছে, নজরদারি, সাইবার যুদ্ধ ও যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নিজেদের বিভিন্ন এআই মডেলকে উপযোগী করা।

চেউং বলেছেন, “এআই মডেলকে কেবল সঠিক উত্তরটি শিখিয়ে দেওয়া এক জিনিস, আর উত্তরের পেছনের সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার ‘যুক্তি’ তৈরি করতে শেখানো শতগুণ কঠিন কাজ।

“এসব গবেষণাপত্রে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, চীনের সামরিক গবেষকরা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবান ও স্বত্বাধিকারপ্রাপ্ত বুদ্ধিমত্তা চতুরতার সঙ্গে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ছোট ও স্থানীয় সিস্টেমে রূপান্তর করছেন।”

রয়টার্স এসব গবেষণাপত্রের সত্যতা যাচাই করার পাশাপাশি চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও দুই ডজন কেস স্টাডি শনাক্ত করেছে।

এর মধ্যে বেইজিংয়ে অবস্থিত পিএলএ-এর সামরিক গোয়েন্দা ও সাইবার যুদ্ধ বিষয়ক ‘ইউনিট ৯৬৯৪১’-এর গবেষকদের গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা সংবেদনশীল সামরিক সোর্স কোড বিশ্লেষণ করতে ওপেনএআইয়ের ‘জিটিপি-৩.৫’ ব্যবহার করেছিল।

গবেষকরা বলছেন, সরাসরি কোনো থার্ড-পার্টি মডেলের মাধ্যমে স্পর্শকাতর সামরিক ডেটা প্রসেস করা বিপজ্জনক। ফলে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে তারা প্রথমে ‘জিপিটি-৩.৫’ ব্যবহার করে সফটওয়্যার কোডগুলো সংক্ষেপ করেন এবং পরে সেই সারসংক্ষেপ ব্যবহার করে চীনের নিজস্ব স্থানীয় এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেন।

ফলে পুরো এআই সিস্টেমটি এখন কেবল চীনা সামরিক বাহিনীর নিজস্ব সুরক্ষিত নেটওয়ার্কের ভেতরেই স্বাধীনভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে।

এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পিএলএ বা ওপেনএআই।

কনটেন্ট মডারেশন থেকে ড্রোন যুদ্ধে ডিস্টিলেশনের ব্যবহার

রয়টার্স ও জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, সামজিক মাধ্যম মনিটরিং থেকে শুরু করে সরাসরি সামরিক অভিযান সবক্ষেত্রেই ডিস্টিলেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে চীনা গবেষকরা।

চীনের অস্ত্র শিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কওয়ালা ‘নর্থ ইউনিভার্সিটি অফ চায়না’-এর গবেষকরা অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড ৩ হাইকু’ মডেল ব্যবহার করে সিন্থেটিক ডেটা তৈরি করেছিলেন, যা সামাজিক মাধ্যম মনিটরিং ও কনটেন্ট মডারেশনের কাজ সহজ করেছে।

এ বিষয়ে অ্যানথ্রপিক বলেছে, চীনে বা বেইজিংনিয়ন্ত্রিত কোনো কোম্পানিতে নিজেদের প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সুবিধা তারা দেয় না এবং নীতিমালা লঙ্ঘন ঠেকাতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রেখেছে। ডিস্টিলেশন করা মডেলগুলো আসল এআইয়ের নিরাপত্তা সুরক্ষা হারিয়ে ফেলতে পারে। ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তির সক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে।

পিএলএ-এর ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ ডিফেন্স টেকনোলজি’র ২০২৪ সালের এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ড্রোনে ব্যবহারের জন্য তারা ডিস্টিলেশন প্রযুক্তি দিয়ে একটি ইমেজ-প্রসেসিং মডেলকে ছোট করে এনেছে।

ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকলেও এসব ড্রোন সরাসরি ভিডিও বিশ্লেষণ করে রিয়াল-টাইমে সিদ্ধান্ত নিতে ও লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে পারে।

একইভাবে, ‘অ্যাকাডেমি অফ মিলিটারি সায়েন্স’-এর গবেষকরা একটি লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ মডেল তৈরি করেছেন, যা ড্রোন, রণতরী ও সাবমেরিনের কৃত্রিম মহড়ায় সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে।

সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা

যুক্তরাষ্ট্রের চিপ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন চীনের কাছে শক্তিশালী কম্পিউটিং রিসোর্সের সংকট তৈরি হয়েছে তখন মার্কিন এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তারা ডিস্টিলেশনকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।

চীন সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় কর্তৃপক্ষও ‘মডেল লাইটওয়েটিং’ বা মডেল ছোট করা ও ‘এজ কম্পিউটিং’ বা অন-ডিভাইস প্রযুক্তিতে সরাসরি ভর্তুকি দিচ্ছে, যেন এসব ছোট এআই মডেল স্যাটেলাইট, ড্রোন বা কম শক্তিওয়ালা ডিভাইসেও চালানো যায়।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডিস্টিলেশন পদ্ধতির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

চীনা মডেলগুলো যত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে চীনা সামরিক গবেষকরা এই ডিস্টিলেশনকে নিজেদের জন্য সম্ভাব্য নিরাপত্তা সংকট হিসেবেও দেখছেন।

জানুয়ারিতে ‘আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা ‘ডেটা-ফ্রি ডিস্টিলেশন’ সংক্রান্ত হুমকি নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এ পদ্ধতিতে মূল ডেটা ছাড়াই রিপাবলিক আউটপুট বিশ্লেষণ করে এআইয়ের অ্যালগরিদম রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করা যায়। এ ঝুঁকি এড়াতে তারা মডেলে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন।

এ ছাড়া, ডিস্টিলেশন করা ছোট বিভিন্ন মডেল সামনের সারির এআই মডেলের কেবল নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাই রপ্ত করতে পারে। মূল এআইয়ের মতো সার্বিক বা ব্যাপক বুদ্ধিমত্তা পেতে পারে না।

এআই ডেটা কোম্পানি ‘স্যাপিয়েন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ট্রেভর কোভারকো বলেছেন, “শিক্ষক (মূল এআই) থেকে শিষ্য (ডিস্টিলেশন মডেল) সবসময় কম সক্ষমতার হয়। এটাকে বড় কোনো এআই থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা বলা যায় না, বরং কিছু নির্দিষ্ট সক্ষমতাকে সাশ্রয়ী ও স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এক সিস্টেমে রূপান্তর করা বলা চলে।”