Published : 04 Jun 2026, 04:22 PM
দেশের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ শক্তিশালীকরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কাজ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন সংস্থার নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো ব্যাপকভাবে খুচরা বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ উন্নত পুঁজিবাজারে পেনশন তহবিল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাজারে স্থিতিশীলতা, তারল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ করে। আমরা মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পকে আরও শক্তিশালী করব।
“প্রভিডেন্ট ও গ্রাচুইটি তহবিলের পেশাদার ব্যবস্থাপনা উৎসাহিত করব। বীমা খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করব এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেব। আমরা এটিও স্বীকার করি যে, মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে আমরা সুশাসন জোরদার করব, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করব, ন্যায্য সম্পদ মূল্যায়ন নিশ্চিত করব এবং শিল্পজুড়ে জবাবদিহিতা বাড়াব।”
বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কমিশনার নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান ও নাফিজ আল তারিককে নিয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে পৌঁছান চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এদিন সকালেই পদত্যাগ করেন। একইদিন চার কমিশনারও দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন। এরপর দুপুরে নতুন চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার নিয়োগ দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
বিএসইসি কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে মাসুদ খান বলেন, “বিনিয়োগকারী সুরক্ষা আমাদের নিয়ন্ত্রণ দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু থাকবে। আমরা যে প্রতিটি সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করব, তার সফলতা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে—এটি কি বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করছে?
“আমরা তথ্য প্রকাশের মান উন্নত করব, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করব, বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করব। আমরা এটাকে অনেক ঢেলে সাজাব—ইনভেস্টর এডুকেশন যেটা এবং নিশ্চিত করব যে বিনিয়োগকারীরা সময়োপযোগী, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে পেতে পারে।”
মাসুদ খান বলেন, “একটি ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর পুঁজিবাজার তখনই গড়ে উঠতে পারে, যখন বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করবেন যে—তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত এবং বাজারের নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।”

নতুন কমিশনের যতো ভাবনা
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, “আমরা নীতিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কখনো স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা হতে পারে না।
“তাই ভবিষ্যতে কখনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে যাতে বাজার স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়ায় ফিরে যেতে পারে।”
নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো প্রবর্তনের উদ্যোগ নেব, যার মাধ্যমে উপযুক্ত কোম্পানিগুলো নতুন মূলধন সংগ্রহ ছাড়াই শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।
“আমাদের লক্ষ্য হলো—দ্রুত ভালো মানের সিকিউরিটিজ সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা। একইসঙ্গে আমরা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করব, যাতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।”
তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ‘প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা’ নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে একটি সুযোগ হিসেবে নয়, বরং একটি বাধ্যবাধ্যকতা হিসেবে দেখেছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবেই।
“আমরা সরকার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে একটি সমন্বিত তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুবিধা কর্মসূচি ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেব।
“এর আওতায় থাকতে পারে—এটা আমাদের প্রস্তাব, আমরা এটি নিয়ে কাজ করব—তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর হারের আরও বড় পার্থক্য, পৃথক কর প্রশাসন ব্যবস্থা, আলাদা ট্যাক্স সার্কেল আলাদা করা উচিত ফর লিস্টেড কোম্পানি, ঝুঁকিভিত্তিক কর মূল্যায়ন, অটোমেটিক অডিট হবে না কিন্তু, অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্ত অডিট হ্রাস, তারপরে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, মূলধন সংগ্রহের সহজতর প্রক্রিয়া, দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নীতিগত সুবিধা।”
হিসাববিদ ও ঝানু করপোরেট পেশাদার থেকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হওয়া মাসুদ খান বলেন, “এসব সুবিধার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উচ্চতর সুশাসন ও তথ্য প্রকাশের মানকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
“করপোরেট বাংলাদেশের প্রতি আমাদের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট; একটি ভালো কোম্পানির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া—ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হওয়া উচিত।”
মাসুদ খান ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের বোর্ডে প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
কমিশনার হিসেবে তার সঙ্গী হওয়া নাফিজ আল তারিক এতদিন ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। আরেক কমিশনার নাহিদ মাহতাব ২০১০ সালে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। নতুন কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান আশা ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক (অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, “জনসাধারণের মালিকানা ভিত্তিক কোম্পানি উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি এখনো ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য প্রয়োজনে ভালো মানের সিকিউরিটিজের পর্যাপ্ত সরবরাহ।
“তাই আমরা বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ স্থানীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান—আমরা বলব যে একটা ক্যাপের উপরে গেলে ইন টার্মস অফ ইকুইটি এবং লোন- ওদেরকে তালিকাভুক্ত করতে হবে। কারণ এটা পাবলিক মানি নিয়ে তারা কাজ করছে; সো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করব এবং তাদের পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করব।”
পুঁজিবাজার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেবেন জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, “যারা বাজারের মধ্যস্থকারী আছে (আমরা স্টক মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারি যাদের বলি) ওদের সাথে ধারাবাহিক সংলাপ। আমরা বিনিয়োগকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বাজার মধ্যস্থকারী, স্টক এক্সচেঞ্জ, পেশাজীবী সংগঠন এবং নীতিনির্ধারণের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হতে চাই।
“… আমরা বিশ্বাস করি, একটি শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত পুঁজিবাজার গড়ে উঠতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বাজার অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এটা গড়ে উঠবে। সে লক্ষ্যে কমিশন সকল অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখবে, তাদের উদ্বেগ ও মতামত জানবে, বাজার উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করবে এবং যৌক্তিক সমস্যাগুলোর সময়োপযোগী ও গঠনমূলক সমাধানে কাজ করবে।
“তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—পরামর্শ ও সংলাপের অর্থ এই নয় যে- বাজারের সততা বা শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে। আমরা বাজার শৃঙ্খলা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং সিকিউরিটিজ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা যখন এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করব, তখন বাজারের সততা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর তদারকি ও আইন প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
“সেই কারণে আমরা বাজার তদারকি এবং আইন প্রয়োগ ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করব। আমরা ডিএসই, সিএসই এবং সিডিবিএল’কে সমন্বিত করে একটি আধুনিক নজরদারি কাঠামো (সারভেইল্যান্স সিস্টেম) গড়ে তুলব, যেখানে রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা থাকবে।
“যদিও তদারকি পুরো বাজার জুড়ে পরিচালিত হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে ‘জেড’ ক্যাটাগরি সিকিউরিটিজের ওপর, যেখানে সুশাসন, তথ্য প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা সংক্রান্ত ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।”
মাসুদ খান বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা নয়; আমাদের উদ্দেশ্য বাজারের স্বাভাবিক উত্থান-পতন ঠেকানো নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো —ন্যায্য মূল্য আবিষ্কার, যেটাকে বলি আমরা ‘ফেয়ার প্রাইস ডিসকভারি’ এবং তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
“মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার, কারসাজি নয়। সব বিনিয়োগকারী এবং সৎ ব্যবসায়ীদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নাই। কিন্তু যারা বিনিয়োগকারীদের আস্থার অবমাননা করবে, বাজারে কারসাজি করবে অথবা সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর আইন প্রয়োগের মুখোমুখি হতে হবে।”
এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক।