Published : 01 Jul 2026, 12:14 PM
নকআউটের ম্যাচে তিন গোলের ব্যবধান মানে বিশাল জয়। তবে ম্যাচটি যারা দেখেছেন, তারা জানেন, বড় বাঁচা বেঁচে গেছে সুইডেন। আরও গোটা পাঁচেক গোল তো অনায়াসেই ঢুকতে পারত তাদের জালে! তাদেরকে স্রেফ যেন ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে চেয়েছে ফ্রান্স। দুটি শট লেগেছে পোস্টে, একটি গোল হয়নি অফসাইডের কারণে। সুইডিশ গোলকিপার ঠেকিয়েছেন ৯টি শট!
এই ম্যাচ একটি উদাহরণ মাত্র। এটিই আসলে ফ্রান্স দলের নিয়মিত চিত্র। প্রতি ম্যাচে হয়তো আক্রমণের জোয়ার এত তীব্র থাকে না বা গোলকিপারকে এত সেভ করতে হয় না। তবে প্রতি ম্যাচেই তাদের দাপট স্পষ্ট। প্রতিদ্বন্দ্বিদের সঙ্গে ব্যবধানও পরিষ্কার। ফ্রান্স ছুটছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। সেই পথচলার অগ্রভাগে আছেন চেনা সেনাপতি, কিলিয়ান এমবাপে।
সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচটি দিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে টানা পাঁচ ম্যাচে তিন বা এর বেশি গোল করেছে ফ্রান্স। এই ম্যাচে জোড়া গোলের পর এমবাপের গোল এবারের বিশ্বকাপে ছয়টি। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে যৌথভাবে শীর্ষে তিনি লিওনেল মেসির সঙ্গে।
তবে আর্জেন্টাইন জাদুকরের চেয়ে একটি জায়গায় এগিয়ে ফরাসি রাজপুত্র। দুটি গোলে সহায়তাও করেছেন তিনি।
তবে তিনি একাই নন। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিয়ে দুয়ে, বাহডলে বার্কোলাদের সমন্বয়ে আক্রমণভাগ যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই বিভীষিকা। রক্ষণ ও মাঝমাঠেও তাদের শক্তির গভীরতার তল পাওয়া কঠিন।
সব মিলিয়ে গত বিশ্বকাপেরর রানার্স আপ ও এর আগেরবারের চ্যাম্পিয়নদের মনে হচ্ছে অন্য সব দলের চেয়ে ভিন্ন উচ্চতার দল।
তবে এমন জমাট পারফরম্যান্স, গোছানো ও গতিময় ফুটল এবং বিধ্বংসী ফিনিশিং ছাড়াও এই ফ্রান্স দলে চোখে পড়ার মতো আরও অনেক কিছু আছে। তাদের একতা, দল হিসেবে খেলা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং তাদের স্পিরিট, সবকিছুই নজর কাড়ার মতো।
সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচেই সেটি দৃশ্যমান হয়েছে দারুণভাবে। চমৎকার প্রথম গোলটির পর এমবাপে সোজা ডাগআউটের দিকে ছুটে যান দিদিয়ে দেশোঁর দিকে। মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিয়ে ফ্রান্স থেকে ফেরার পর ফ্রান্সের প্রধান কোচের প্রথম ম্যাচ ছিল এটি।
তাকেই গোলটি উপহার দেন ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা গোলস্কোরার। আবেগঘন এক মুহূর্ত সেটি।

এরপর এমবাপে ও দেশোঁর সঙ্গে যোগ হন দলের বাকিরা। সবাই পরস্পরকে জড়িয়ে আনন্দবৃত্তে উৎসব করতে থাকেন। বিষাদের সময়টাতেও কোচ দেশোঁ হাসির উপলক্ষ পান তার দলের সৌজন্যে।
ফ্রান্স দলটা একটা একপ্রাণ, সেটিই ফুটে ওঠে সেখানে। ম্যাচের পর দেশোঁর কণ্ঠে সেই তৃপ্তি।
“এই দলটা ঐক্যবদ্ধ এবং আমি যখন এখানে ছিলাম না (আগের ম্যাচে), তখনও তারা ভালো খেলেছে। স্রেফ এই দলীয় চেতনা হয়তো ম্যাচ জেতার নিশ্চয়তা দেয় না। কিন্তু আমি জানি, ব্যাপারটা উল্টো হলে সেই দল ম্যাচ হেরে যেতে পারে। সম্মিলিত শক্তিই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।”
মিডফিল্ডার অহেলিয়া চুয়ামেনি যোগ করেন, “আমরা জানি, কোচ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, আমরা তাকে যথাসম্ভব খুশি করার জন্য আমাদের সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
অসাধারণ ফুটবল সামর্থ্যের সঙ্গে এই একতা ও চেতনা যোগ হওয়ায় ফ্রান্স দলটা হয়ে উঠছে আরও অপরাজেয়। এই দলকে কীভাবে থামানো সম্ভব, বুঝে উঠতে পারছেন না ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট।
“এই ধরনের দলের সামর্থ্যকে থামাতে পারবেন না। এবারের টুর্নামেন্টে আমি যতগুলো দল দেখেছি, তার মধ্যে ফ্রান্স সুস্পষ্ট ফেভারিট।”
রাইটের সাবেক আর্সেনাল সতীর্থ এবং ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী পাত্রিক ভিয়েরা যোগ করেন, “তারা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই দলকে হারানো কঠিন।”
তিনি ভুল বলেননি।
যদিও শেষ কথা বলে কিছু নেই। একটি বাজে দিন আসতেই পারে এই দলেরও। তবে আপাতত সেই দিনটিকে মনে হচ্ছে অনেক দূর। গ্রুপ পর্বের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর নকআউটের প্রথম ম্যাচে তাদের ঘোর জাগানো পারফরম্যান্স দেখে প্রশ্নটা উঠেই যাচ্ছে, ফ্রান্সের ‘ক্লাস অফ ২০২৬’-কে কি কেউ থামাতে সক্ষম?
ধারাভাষ্যের কবি পিটার ড্রুরি তো সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের তৃতীয় গোলটির পর বলেই দিয়েছেন, "এটি স্বর্গের ফুটবল, পৃথিবীর কেউ থামাবে কী করে!"