Published : 03 Jul 2026, 04:04 PM
শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার সময় প্যারাগুয়ের যে কারও চেয়ে জিততে হয়তো আরেকটু বেশি উন্মুখ থাকবেন ওর্লান্দো হিল।
শেষ আটে জায়গা করে নেওয়ার একটা লক্ষ্য তো অবশ্যই থাকবে। এর পাশাপাশি কয়েক বছর আগে চরম আর্থিক সঙ্কটে বাধ্য হয়ে বেচে দেওয়া যুব ক্যারিয়ারের জার্সি ফেরত পাওয়ার লক্ষ্যও থাকবে প্যারাগুয়ে গোলরক্ষক হিলের।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারাগুয়ের হয়ে অভিষেক হয় হিলের। এরপর তার স্ত্রী মেলিসা আভালস ইনস্টাগ্রামে এক বার্তায় তুলে ধরেন তাদের কঠিন সংগ্রামের কথা। বলেন বাধ্য হয়ে নিজের সব ক্রীড়া সামগ্রী বেচে দিতে হয়েছিল হিলকে।
২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরে হিল-মেলিসা দম্পতির ছেলের পৃথিবীর আলোয় আসার কথা ছিল, কিন্তু স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে আগেভাগে, ৩০ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় মেলিসাকে। ৭ ডিসেম্বরে কৃত্রিমভাবে প্রসব বেদনা তৈরি করা হয়।
জটিলতার কারণে, একদিন পর জরুরি অস্ত্রোপচার করে লাউতারোকে আনা হয় পৃথিবীর আলোতে। রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে।
বড়দিনের আগেই ছেলে নিয়ে ঘরে ফেরেন হিল-মেলিসা, কিন্তু হিলের অবস্থা তখন কপর্দকহীন! হাসপাতালের খরচ মেটাতে প্রিয় সবকিছু বেচতে বাধ্য হয়েছিলেন সেদিন। মেলিসা কয়েক মাসে আগে নিজেই বলেছেন এসব কথা।
“আমাদের ছেলে জীবনের জন্য পাঞ্জা লড়ছিল এবং তার বাবা, সবসময় পাশে ছিল। হিল তার সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিল। সবকিছু বেচে দিয়েছিল: তার জামাকাপড়, তার স্নিকার্স, এমনকি তার অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সি, যেটা সে স্মৃতি হিসেবেও রাখতে পারেনি।”
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে নকআউট পর্ব শুরু করেছে জার্মানিকে নাটকীয় টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে। পাঁচ শটের পর্বে দুটি সেভ করে, দলের জয়ের নায়ক হিল। অথচ, এই ম্যাচের আগেও তিনি সেভাবে ছিলেন না পাদপ্রদীপের আলোয়।
ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা এই গোলরক্ষকের জাতীয় দলে আসার পথ মসৃন ছিল না। প্যারাগুয়ের ক্লাব থার্টিন দে জুনিও এবং সিএস সান লরেন্সোর যুব দলের হয়ে ক্লাব ফুটবলে যাত্রা শুরু হিলের। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ আমেরিকান অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের প্যারাগুয়ে দলে ডাক পান তিনি।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সান লরেন্সোর সিনিয়র দলে অভিষেক, কিন্তু ম্যাচ খেলতে পেরেছিলেন মাত্র দুটি। আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগের ক্লাব সান লরেন্সো ধারে দলে নেয় এই ‘অখ্যাত’ গোলরক্ষককে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ফাকুন্দো আলতামিরানোর চোট এবং সান লরেন্সোর ডাকে কেইলর নাভাস ও আন্দ্রিয়ান নোপোর্ত সাড়া না দেওয়ায় ভাগ্য খুলে যায় হিলের।
২০২৫ সালে এসে মূল দলে নিয়মিত হন তিনি। ১৬ ম্যাচের নয়টিতে ‘ক্লিন শিট’ রাখেন তিনি এবার নজরে পড়েন প্যারাগুয়ে কোচ গুস্তাভো আলফারোর। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
বিশ্বকাপ অভিষেক অবশ্য তার জন্য আনন্দের হয়নি; সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪-১ গোলে হেরে যায় প্যারাগুয়ে।
কিন্তু এর পরের তিন ম্যাচে দারুণভাবে পোস্ট আগলে রাখেন হিল। গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচ জাল অক্ষত রাখেন। তৃতীয় সেরা আট দলের একটি হয়ে প্যারাগুয়ে উঠে নকআউট পর্বে, ১৬ বছর পর প্রথমবার।
জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে সবশেষ তিন ম্যাচে কেবল একটি গোল হজম করেন হিল, লক্ষ্যে থাকা ১৭ শটের ১৬টিই রুখে দেন তিনি। টাইব্রেকারে দারুণ বীরেত্বে জার্মানিকে বিদায় করে দিয়ে জেতেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার।
অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সি প্রায় ৩৩ ডলারে কিনেছিলেন হিলেরই বন্ধু পেদ্রো সুয়ারেস। প্যারাগুয়ে গোলরক্ষককে এক বার্তায় তিনি বলেছেন, বিনামূল্য ওই জার্সি ফিরিয়ে দেবেন তিনি।
“আমি তাকে বলছি, জার্সি নিয়ে চিন্তা করো না। আমি তোমার জন্য সেটা নিরাপদে রাখব। তবে এর জন্য তোমার ফ্রান্সকে হারাতে হবে।”
সম্ভবত টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগের মুখোমুখি হতে হবে হিলের। জার্সি ফিরে পেতে হলে কঠিনতম পরীক্ষাই দিতে হবে তার।