Published : 27 Jun 2026, 02:08 PM
ম্যাচ শেষে দেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরে মাঠে অনেকক্ষণ উদযাপন করেছেন বুবিস্তা। কেইপ ভার্ড কোচ পরে সংবাদ সম্মেলনে এলেন তিনি দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে। দেশকে হৃদয়ে ধারণ করে বিশ্বকাপে রূপকথার জন্ম দিয়েছে তার দল। গর্ব নিয়ে দেশের পতাকা তুলে ধরার সময় তো এখনই!
তার পুরো নাম পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো। তবে পরিচিত তিনি বুবিস্তা নামেই। খুবই মৃদুভাষী। অনেক ধীরস্থির ও ঠাণ্ডা চরিত্রেরও। বেশির ভাগ কোচ যেখানে ম্যাচজুড়ে ডাগআউটের সামনে ছুটোছুটি, চিৎকার ও নানা কিছু করেন, সেখানে তাকে শান্ত থাকতেই দেখা যায় বেশির ভাগ সময়। তার দলের অবিস্মরণীয় সাফল্যের কথা বলতে গিয়েও থার খই ফোটালেন না তিনি। তবে লো লাগার পরিধি, কতটা প্রতিজ্ঞা আর পরিশ্রম দিয়ে তারা সাফল্য আদায় করে নিয়েছেন, এসব শোনালেন কিছুটা। নকআউটে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লড়াই নিয়ে রোমাঞ্চের কথাও তুলে ধরলেন।
স্পেনের সঙ্গে ড্র করে যে স্বপ্নযাত্রার শুরু, পরে উরুগুয়ের সঙ্গে ড্রয়ের পথ ধরে সৌদি আরবের সঙ্গেও করে তা পেয়েছে পূর্ণতার ঠিকানা। বিশ্বকাপ অভিষেকে নকআউট পর্বে পা রেখেছে কেইপ ভার্ড।
মাত্র ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন ও ৬ লাখ জনসংখ্যার দেশটি নকআউটে পৌঁছানো বিশ্বকাপ ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম দেশ।
কোচ বললেন, রূপকথার মতো এই সাফল্য রাতারাতি ও আচমকা ধরা দেয়নি। বরং কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং চাপের মুখে ভেঙে না পড়ার দৃঢ় সংকল্পের ওপর ভিত্তি করেই অর্জিত হয়েছে।
৫৬ বছর বয়সী সাবেক এই ডিফেন্ডার সেখানেই খুঁজে নিচ্ছেন গর্ব। সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করলেও জয়ের আশাও দেখছিলেন তিনি।
“তারা যা অর্জন করেছে, তাতে আমি গর্বিত। একটি ম্যাচও না হেরে প্রথম পর্ব শেষ করতে পারায় আমাদের উচ্ছ্বসিত হতেই হবে। এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং দলীয় চেতনা।”
“আমাদের সমর্থকদের এই সবকিছুই প্রাপ্য। আরও ভালো কিছু করতে, আরও আনন্দ করার জন্য স্রেফ একটি গোল দূরে ছিলাম আমরা। জেতার জন্য ছেলেরা তাদের সাধ্যমতো সবকিছু করেছে। আমি সন্তুষ্ট।”
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এখনও পর্যন্ত তারাই। তারা নিজেরাও যে চমকে গেছেন, তা লুকাননি বুবিস্তা। তবে নিজেদের প্রতিজ্ঞার কথাও বললেন তিনি।
“একটু অবাক করার মতোই ব্যাপার। যদিও প্রথম দুটি ম্যাচের পর আমরা মনে মনে ভাবছিলাম, এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারব।”
“ছেলেরা আসলে সারা বিশ্বকে দেখাতে মরিয়া ছিল যে, আমরা কী দিয়ে তৈরি। আগেই যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমরা দারুণ গর্বিত ছিলাম। খুবই ছোট একটি দেশ আমরা। তবে যা অর্জন করতে চাই, তার জন্য লড়াই করি। আমাদের জন্য কিছুই অসম্ভব নয়।”
সৌদির সঙ্গে ড্রয়ের পর গ্রুপের অন্য ম্যাচের ফলের অপেক্ষায় ছিল তারা। মাঠেই ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে তারা দেখতে পান, স্পেনের কাছে হেরে ছিটকে পড়েছে উরুগুয়ে। এরপরই উল্লাসে ফেটে গোটা দল।
“অত্যন্ত কঠিন ম্যাচ ছিল এটি। প্রচুর মানসিক শক্তির প্রয়োজন ছিল, কারণ আমরা অন্য ম্যাচের ফলাফলের ওপরও নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের দল অবিশ্বাস্য দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে।”
অন্যদের ফলাফল তাদের পক্ষে এলেও নিজেদেরকেই বেশি কৃতিত্ব দিচ্ছেন কোচ। অনেক পরিশ্রমের পথ ধরেই এসেছে এই সাফল্য।
“মূল চাবিকাঠি? আমাদের দলের ঐক্য এবং সহনশীলতা। আমরা সবসময় আমাদের সাংগঠনিক দক্ষতার কথা বলেছি, কিন্তু তার সাথে নির্ভয়ে কাজ করার দৃঢ় সংকল্পের কথাও বলেছি।”
“পরিশ্রম মানুষকে মর্যাদা দেয়। সব ফুটবলারই প্রতিদিন, দিনের পর দিন ঘাম ঝরানোর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল।”
একসময় এই দলের অধিনায়ক ছিলেন বুবিস্তা। এখন দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সেরা সাফল্য এলো তার কোচিংয়ে। আটলান্টিক মহাসাগরের ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছোট্ট আফ্রিকান দেশটির জন্য গর্ব এনে দিতে পেরে তিনি উচ্ছ্বসিত।
“আমরা খেলোয়াড়দের বলেছিলাম যে, তাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে, কারণ পুরস্কার আসবেই। ঠিকই আমরা এখন এখানেই আছি। এই দল এখনও পর্যন্ত যা করেছে, তার জন্য কেপ ভার্ডের জনগণের গর্বিত হওয়া উচিত। এটা অবিশ্বাস্য কিছু।”
শুধু নিজ দেশের জন্যই নয়, তাতদের পারফরম্যান্সকে গোটা আফ্রিকার অর্জন হিসেবে দেখছেন তারা।
“আমরা আমাদের দ্বীপের প্রতিনিধিত্ব করি, কিন্তু আমরা আফ্রিকারও প্রতিনিধিত্ব করি। এটা আমাদের জন্য অপার গর্বের ব্যাপার। আমাদের উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল ছিল আমাদের ফুটবল এবং আমাদের দেশের মান তুলে ধরা। এটি প্রমাণ করে যে, শক্তি, সংকল্প, মনোযোগ, ইচ্ছাশক্তি এবং সহনশীলতা থাকলে ক্ষুদ্রতম দেশগুলোও প্রমাণ করতে পারে যে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।”
নকআউটে তাদের লড়াই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। কঠিন এক পরীক্ষা তাদের অপেক্ষায়। তবে বুবিস্তা ভড়কে যাচ্ছেন না।
“এটি এমন একটি দেশ, যাদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, কারণ অনেক কেপ ভার্ডিয়ান সেখানে অভিবাসন করেছেন।”
“আমরা সঠিক মনোভাব ও দায়িত্ববোধ নিয়ে খেলব, পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রও বজায় রাখব। তাদের দলে মেসি আছেন, যার পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”