২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 14 Jun 2026, 09:50 AM
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুত হওয়া, শরণার্থী শিবির, কাকুমার কষ্টের জীবন, অস্ট্রেলিয়া এসে সংগ্রাম- জীবনে কী দেখেননি আওয়ার মাবিল? তবে, এতকিছুর মধ্যেও তিনি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছেন। ফুটবলকে আকঁড়ে ধরেছেন ক্ষণিকের জন্য হলেও দুঃখ ভুলে থাকতে। সেই ফুটবলই মাবিলকে তুলে এনেছে বিশ্বকাপের আঙিনায়। পাদপ্রদীপের আলোতে।
জীবনের শুরুটা যার ছিল আলোহীন; নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা। জন্ম দক্ষিণ সুদানে। যুদ্ধ আর হানাহানি যেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বাস্তুচ্যুত হয়ে সেখান থেকে মাবিল পালিয়েছেন। আশ্রয় নিয়েছেন শরণার্থী শিবিরে। দিন-রাত কাটিয়েছেন নোংরা ঘরে। একদিন সৌভাগ্য কড়া নাড়ল দুয়ারে। নতুন ঠিকানা হলো অস্ট্রেলিয়া। এখন ‘সকারুজ’দের আক্রমণভাগের নির্ভরতা তিনি।
শৈশব কাটিয়েছেন কেনিয়ার কাকুমা শরণার্থী শিবিরে। সুদানের স্বশস্ত সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা হাজারো মানুষের আশ্রয়স্থল ছিল এটি। এমন পরিবেশে স্বপ্ন দেখা কঠিন, কিন্তু মাবিল দেখলেন, ফুটবল নিয়ে। শরণার্থী শিবিরের পরিবেশ যেমন হয় আর কি? ক্ষুধা-তৃষ্ণা যেখানে নিত্যসঙ্গী, সেখানে সবুজ মাঠ কোথায়? শক্ত ও নোংরা মাঠে, নগ্ন পায়ে ফুটবল খেলতেন। অবশ্য সেটাকে ফুটবল না বলাই ভালো। প্লাস্টিকের ব্যাগের মধ্যে মোজা, ছেঁড়া কাপড় ভরে গোলাকৃতি রূপ দেওয়া বস্তু আরকি!
সেই সময়ের স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে মাবিল একাধিকবার বলেছেন, দুঃখগুলো ক্ষণিকের জন্য ভুলে থাকতে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভুলে কিছুক্ষণের জন্য মুক্ত বিহঙ্গের অনুভুতি নিতে, মেতে থাকতেন ফুটবল নিয়ে।
শরণার্থী শিবিরের দুঃসহ জীবনে একটু স্বস্তির পরশ এলো, যখন মাবিলের বয়স ১০ বছর। একটি মানবিক কর্মসূচীর আওতায় তার পরিবার রাজনৈতিক আশ্রয় পেল অস্ট্রেলিয়ায়। অ্যাডিলেডে পাড়ি জমালেন। এখানেও আরেক বিপত্তি। অপরিচিত ভাষা, নতুন সংস্কৃতি এবং একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। এখানেও ফুটবলই মাবিলকে দেখাল পথ।
ফুটবল খেলার সুবাদে স্থানীয়দের সাথে মেলামেশার সুযোগ এলো। কিছু বন্ধু জুটে গেল। স্বস্তির জায়গাটুকু খুঁজে পেলেন মাবিল। তার মেধা দ্রুতই দৃষ্টি আকর্ষণ করল সকলের। স্থানীয় তরুণদের লিগে পথচলা শুরু হয়ে হলো। আর পিছু ফিরে দেখা নয়, দুঃস্বপ্নের সাগর পেরিয়ে কেবলই সামনের পানে ছুটে চলা।
একটু বয়স বাড়লে মাবিল যোগ দিলেন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে। ২০১৩ সালে অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেকও হয়ে গেল। কিছুদিন পর পা রাখলেন ইউরোপিয়ান ফুটবলের আরও বড় আঙিনায়।
ডেনমার্ক, পর্তুগাল, স্পেন, তুরস্ক এবং সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন মাবিল। তার এই যাত্রাও মসৃণ ছিল না। সঙ্গী ছিল উত্থান-পতনের গল্প। ক্লাব ক্যারিয়ার সেরা সময়টা মাবিল কাটিয়েছেন মিটজিল্যান্ডে। ডেনমার্কের এই দলটির হয়ে তিনি জিতেন লিগ শিরোপা, খেলেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। নিজের প্রজন্মের অস্ট্রেলিয়ার প্রতিশ্রুতিশীল ফুটবলার হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পান। ২০২৩ সালে জিতেন ইয়ং অস্ট্রেলিয়ান অব দ্যা ইয়ার খেতাব।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের দরজা মাবিলের জন্য খুলে যায় অবশ্য আরও আগে, ২০১৮ সালে। শুরু থেকে সেরা একাদশে নিয়মিত তিনি। ‘সকারুজ’দের হয়েও তার আছে দারুণ স্মৃতি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের বাছাইয়ে পেরুর বিপক্ষে টাইব্রেকারে মাবিলের শটেই মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া।
ওই গোলের পর, একবাক্যে মুহূর্তটি তুলে ধরেছিলেন মাবিল। তার সেই একান্ত অনুভূতির প্রকাশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া জুড়ে। তিনি বলেছিলেন, “আমার পরিবারের পক্ষ থেকেই এটাই ছিল অস্ট্রেলিয়াকে ধন্যবাদ জানানোর একমাত্র উপায়।”
মাঠের বাইরের মাবিল আরও বিনয়ী; তার জীবনের গল্পের মতোই অনুপ্রেরণাদায়ী। আজও তিনি ভোলেননি, তার শেকড়, শরণার্থী জীবনের কষ্টের স্মৃতি। ভাইয়ের সাথে মিলে গড়েছেন ‘বেয়ারফুট টা বুটস ফাউন্ডেশন।’ নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, যাদের পায়ে জুতা নেই, তাদের স্বপ্ন দেখার সাহসটুকু যোগাচ্ছে তার ফাউন্ডেশন।
মাবিল গিয়েছিলেন কাকুমার সেই শরণার্থী শিবিরে। নিজের চোখে দেখে আসেন, শৈশবে তার ভোগ করা কষ্ট এখনও হাজার হাজার মানুষের সঙ্গী। সেখান থেকে ফিরে গড়েন এই ফাউন্ডেশন। শরণার্থী ও অসহায় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সংস্থাটি কাজ করে চলেছে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অসহায়দের মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রী দান ও চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে ফাউন্ডেশনটি।
ফিরিয়ে দেওয়ার পর্ব অবশ্য এখনও শেষ হয়নি মাবিলের। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া যে তাকিয়ে আছে তার দিকে।