১৯৫০ বিশ্বকাপ: মারাকানার দুঃস্বপ্ন

ব্রাজিলের হৃদয় ভেঙে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে উরুগুয়ে।

ইকবাল শাহরিয়ারবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Nov 2022, 02:01 PM
Updated : 9 Nov 2022, 02:01 PM

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিষাদগ্রস্ত, হতাশায় বুদ গোটা বিশ্বের কাছে টনিক ছিল ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ। ফ্রান্স আসরের এক যুগ পর আয়োজিত হয় এই টুর্নামেন্ট। ফিফা সভাপতি হিসেবে জুলে রিমের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই আসর থেকে ফুটবল বিশ্বকাপের নামকরণ করা হয় ‘জুলে রিমে বিশ্বকাপ।’ ১৯৭০ পর্যন্ত এই নামেই পরিচিত ছিল ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিযোগিতা।

বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের কারণে স্বাগতিক হতে কোনো দেশই রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে ১৯৪৬ সালে ফিফা কংগ্রেসে স্বাগতিক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে ব্রাজিল এবং ফিফা চতুর্থ আসরের স্বাগতিক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় তাদেরকেই। সময় নির্ধারণ হয় ১৯৫০ সালের ২৪ জুন থেকে ১৬ জুলাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে না পারায় আর্জেন্টিনা, জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরির মত বড় দলগুলি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অংশ নেয়নি। ইউরোপের আটটি (ইতালি, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, যুগোস্লাভিয়া, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও তুরস্ক), উত্তর আমেরিকার দুটি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো) এবং লাতিন আমেরিকার পাঁচটি (স্বাগতিক ব্রাজিল, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও চিলি) এবং এশিয়া থেকে একটিসহ (ভারত) মোট ১৬টি দেশ চতুর্থ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয়।

এশিয়ার বাছাই পর্বে তিনটি দেশ (ফিলিপিন্স, বার্মা ও ইন্দোনেশিয়া) নিজেদের নাম প্রত্যাহার করায় ভারত সরাসরি বিশ্বকাপের মূলপর্বে যায়। তবে জুতা পরে খেলার বাধ্যবাধকতা থাকায় তারা দল প্রত্যাহার করে নেয়।

বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা পেলেও ইউরোপের স্কটল্যান্ড ও তুরস্ক টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ বিশ্বকাপে অংশ নেয় ১৩টি দেশ। সম্পূর্ণ ভিন্ন আমেজের এই বিশ্বকাপে ১৩টি দেশ চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে খেলে প্রথম পর্ব। চার গ্রুপ সেরা দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘ফাইনাল রাউন্ড।’ এটিই একমাত্র বিশ্বকাপ যেখানে ছিল না কোনো ফাইনাল! ফাইনাল রাউন্ডের সেরা দল জেতে শিরোপা।  

গ্রুপ পর্ব

গ্রুপ-১ : ব্রাজিল, যুগোস্লাভিয়া, মেক্সিকো, সুইজারল্যান্ড

গ্রুপ-২: স্পেন, ইংল্যান্ড, চিলি, যুক্তরাষ্ট্র

গ্রুপ-৩ : সুইডেন, ইতালি, প্যারাগুয়ে

গ্রুপ-৪ : উরুগুয়ে, বলিভিয়া

গ্রুপ-১ থেকে তিন ম্যাচে দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে পরের ধাপে যায় ব্রাজিল। দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় হয় যুগোস্লাভিয়া। একটি করে জয় ও ড্রয়ে তিন পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় সুইজারল্যান্ড। তিন ম্যাচেই হেরে শূন্য হাতে বিদায় নেয় মেক্সিকো।

গ্রুপ-২ থেকে তিন ম্যাচের সবগুলো জিতে ৬ পয়েন্ট পেয়ে ব্রাজিলের সঙ্গী হয় স্পেন। বাকি তিন দেশের ফল একই, এক জয়ের পাশে দুই হার।

গ্রুপ-৩ থেকে একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট পেয়ে ফাইনাল রাউন্ডে যায় সুইডেন। হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে ব্রাজিল আসা ইতালির আগেভাগেই বিদায় ছিল বড় অঘটন। এক জয়ে তাদের পয়েন্ট ২। এক ম্যাচ ড্র করে তিন দলের মধ্যে তৃতীয় হয় পারাগুয়ে।

গ্রুপ-৪-এর একমাত্র ম্যাচে বলিভিয়াকে ৮-০ গোলে উড়িয়ে দেয় উরুগুয়ে। হ্যাটট্রিক উপহার দেন অস্কার মিগেল।

ফাইনাল রাউন্ড

ব্রাজিল, স্পেন, সুইডেন ও উরুগুয়েকে নিয়ে শুরু হয় টুর্নামেন্টের ফাইনাল রাউন্ড। ৯ জুলাই প্রথম ম্যাচে ২-২ ড্র করে উরুগুয়ে ও স্পেন। সুইডেনকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে দুর্দান্ত সূচনা করে ব্রাজিল। আদেমির দে মেনেজেস করেন চার গোল।

১৩ জুলাই দ্বিতীয় রাউন্ডে একপেশে লড়াইয়ে ৬-১ গোলে স্পেনকে হারায় ব্রাজিল। রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে সুইডেনকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আশা বাঁচিয়ে রাখে প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে।

১৬ জুলাই তৃতীয় ও শেষ রাউন্ডে স্পেনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় সুইডেন। স্রেফ ড্র করলেই শিরোপা জিতত ব্রাজিল। আগের দুই ম্যাচে গোল বন্যায় বড় জয় পাওয়া দলকে সমর্থন দিতে গ্যালারিতে হাজির ছিলেন প্রচুর দর্শক। 

১ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ দর্শকের উপস্থিতিতে বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ফ্রিয়াকার গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। ৬৬তম মিনিটে শিয়াফিনোর গোলে সমতা ফেরায় উরুগুয়ে। ৭৯তম মিনিটে মারাকানাকে স্তব্ধ করে দিয়ে সফরকারীদের এগিয়ে নেন ঘিগিয়া। ২-১ গোলে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। ব্রাজিলের হৃদয়ভাঙা হারের এই ম্যাচ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় ‘মারাকানাজো’ বা মারাকানার কান্না নামে।

এক নজরে চতুর্থ বিশ্বকাপ

·        স্বাগতিকঃ ব্রাজিল

·        চ্যাম্পিয়নঃ উরুগুয়ে

·        রানার্সআপঃ ব্রাজিল

·        মোট ম্যাচঃ ২২

·        মোট গোলঃ ৮৮

·        গোল গড়ঃ ৪

·        সর্বোচ্চ গোলদাতাঃ আদেমির দে মেনেজেস (ব্রাজিল)- ৯ গোল

·        সেরা খেলোয়াড়ঃ জিজিনিয়ো (ব্রাজিল) [আন অফিসিয়াল]

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক