১৯৩৪ বিশ্বকাপ: ইতালির ‘প্রথম’

তৎকালীন ইতালিয়ান শাসক বেনিতো মুসোলিনির বিরুদ্ধে এই আসরকে ফ্যাসিবাদ প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠে।

ইকবাল শাহরিয়ারবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Nov 2022, 03:05 PM
Updated : 8 Nov 2022, 03:05 PM

আলোচনা-সমালোচনায় মুখরিত ছিল ১৯৩৪ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় আসরটি। দীর্ঘ আটবারের প্রচেষ্টার পর ৯ অক্টোবর ১৯৩২-এ স্টকহোমে ফিফা নির্বাহী কমিটির সভায় টুর্নামেন্টের স্বাগতিক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ইতালিকে। নির্বাচনী এই প্রক্রিয়ায় ছিল না গোপন ব্যালেটের ভোট গ্রহণ। ৩৫ লাখ লিরার বাজেটের এই দ্বিতীয় আসর হয়েছিল ২৭ মে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত।

তৎকালীন ইতালিয়ান শাসক বেনিতো মুসোলিনির বিরুদ্ধে এই ইভেন্টকে ফ্যাসিবাদ প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করার এবং রেফারিদের প্ররোচিত করে স্বাগতিকদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এই বিশ্বকাপের মাধ্যমেই প্রথম বাছাইপর্বের যাত্রা শুরু। প্রাথমিকভাবে ৩৬টি দেশের বাছাইপর্বে অংশগ্রহণের কথা থাকলেও অংশ নেয় ৩২টি দেশ। প্রথম বিশ্বকাপে ইউরোপের বেশিরভাগ দল অংশ না নেওয়ায় শিরোপাধারী উরুগুয়ে দ্বিতীয় আসর বর্জন করে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের বর্জনের প্রথম ও শেষ ঘটনা ছিল। বাছাইপর্ব বয়কট করে চিলি ও পেরু; যার বদৌলতে বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায় ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা।

ইউরোপের ১২টি (ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, সুইডেন, হাঙ্গেরি, হল্যান্ড, রোমানিয়া, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া), উত্তর আমেরিকার একটি (যুক্তরাষ্ট্র) এবং লাতিন আমেরিকার দুটি (আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল) এবং প্রথমবারের মত আফ্রিকার একটি (মিশর) মোট ১৬টি দেশ নিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।

প্রথমবারের মত নকআউট ফরম্যাটের এই আসরের ১৫টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ৮টি স্টেডিয়ামে এবং খেলা হয় অফিসিয়াল বল ‘ফেদেরাল ১০২’ দিয়ে।

প্রথম পর্ব

প্রথম পর্বের ৮টি ম্যাচ একইদিনে অনুষ্ঠিত হয় ৮টি ভিন্ন স্টেডিয়ামে। ম্যাচ শেষে ফলাফল দাঁড়ায়, ইতালি- যুক্তরাষ্ট্র (৭-১), স্পেন-ব্রাজিল (৩-১), অস্ট্রিয়া-ফ্রান্স (৩-২), হাঙ্গেরি-মিশর (৪-২), চেকোস্লোভাকিয়া - রোমানিয়া (২-১), জার্মানি-বেলজিয়াম (৫-২), সুইডেন-আর্জেন্টিনা (৩-২) এবং সুইজারল্যান্ড-নেদারল্যান্ডস (৩-২)। এ আসরের প্রথম পর্বের প্রথম হ্যাটট্রিক উপহার দেন স্বাগতিক দেশের আঞ্জেলো শিয়াভো।  

কোয়ার্টার-ফাইনাল

বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় আসরটি স্মরণীয় হয়ে থাকার একটা বড় কারণ হল কোয়ার্টার-ফাইনালে অংশগ্রহনকারী দলগুলো। প্রথমবারের মত কোয়ার্টার ফাইনালে অংশগ্রহণকারী ৮টি দেশই ছিল ইউরোপ (অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি, স্পেন, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ড) থেকে।

কোয়ার্টার-ফাইনালে হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম রিপ্লে ম্যাচ; যখন ইতালি এবং স্পেন (১-১) গোলে ড্র করে। উভয় দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আহত হন এবং রিপ্লে ম্যাচে ১-০ গোলের ব্যবধানে জিতে সেমি-ফাইনালে পৌঁছে যায় ইতালি। কোয়ার্টার ফাইনালের বাকি ম্যাচগুলোর ফলাফল ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি (২-১), চেকোস্লোভাকিয়া-সুইজারল্যান্ড (৩-২) এবং জার্মানি- সুইডেন (৫-২)। গোটা টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় হ্যাট্রিক করেন জার্মানির এডমুন্ড কনেন।

সেমি-ফাইনাল

৩ জুন মিলানে মুখোমুখি হয় ইতালি-অস্ট্রিয়া এবং রোমে চেকোস্লোভাকিয়া-জার্মানি। একদিকে গুইতারের করা গোলে (১-০) অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে আসে ইতালি।

অন্যদিকে অলদ্রিচ নেদলির হ্যাট্রিকে জার্মানিকে উড়িয়ে দিয়ে (৩-১) ফাইনালের মঞ্চে জায়গা করে নেয় চেকোস্লোভাকিয়া।     

৭ জুন নেপলসে অনুষ্ঠিত তৃতীয় স্থানের লড়াইয়ে জার্মানি (৩-২) অস্ট্রিয়াকে হারায়।

ফাইনাল

অবশেষে আসে সেই ১০ জুন। প্রায় ৫৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে রোমের স্তাদিও নাসিওনালে জমে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনাল। টানটান উত্তেজনার ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়ার পুক এবং ইতালির অরসির ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকে ম্যাচটি।

অতিরিক্ত সময়ে আজ্জুরিদের জন্য আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, শিয়াভোর গোল! বিশ্ব পেয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন।

এই আসরে মোট ম্যাচ সংখ্যা ছিল ১৭ টি। মোট গোল হয় ৭০টি। সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট পরেছিলেন চেকোস্লোভাকিয়ার নেদলি (৫টি) এবং সেরা খেলোয়াড় হন স্বাগতিক দেশের গুইসেপ্পো মেজ্জা। এর মাধ্যমেই পর্দা নামে বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় আসরের।

এক নজরে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ

  • স্বাগতিকঃ ইতালি

  • চ্যাম্পিয়নঃ ইতালি

  • রানার্সআপঃ চেকোস্লোভাকিয়া

  • মোট ম্যাচঃ ১৭

  • মোট গোলঃ ৭০

  • গোল গড়ঃ ৪.১২

  • সর্বোচ্চ গোলদাতাঃ অলদ্রিচ নেদলি (চেকোস্লোভাকিয়া)- ৫ গোল

  • সেরা খেলোয়াড়ঃ গুইসেপ্পো মেজ্জা (ইতালি) [আন অফিসিয়াল]

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক