উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ
Published : 31 May 2026, 09:14 AM
অনুশীলনের সময় যত গড়াল, মনিকা-ঋতুপর্ণাদের শরীরী ভাষায় মরিয়া ভাবটা যেন বেশি করে ফুটে উঠল। তাতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল, বাংলাদেশের জন্য ভারত ম্যাচ যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। চোট কাটিয়ে ডিফেন্ডার শিউলি আজিম, মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা ফিরে ঘাম ঝরালেন সতীর্থদের সাথে। এই দুজনকে ফিরে পাওয়ার স্বস্তি দেখা গেল পিটার জেমস বাটলারের চোখেমুখে। আগের ম্যাচের ফ্যাকাসে মুখগুলোয় দেখা মিলল হাসির ঝিলিকও।
ডন বস্কো গ্রাউন্ডে সকালে ৭টায় অনুশীলন হলেও গরম ছিল বেশ। একটু হাঁটলেই যেখানে ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা, সেখানে দুই ঘণ্টার কাছাকাছি ট্রেনিং করালেন কোচ। বক্সের আশেপাশে পাওয়া ফ্রি কিকের ও কর্নারের অনুশীলন হলো অনেকটা সময় ধরে। সেখানে শামসুন্নাহার জুনিয়রের হেড বাইরে গেল, সাগরিকা কয়েক দফা ফিনিশিং টাচ দেওয়ার চেষ্টা করেও পারলেন না। কারো শট ফিরিয়ে দিল পোস্ট। কেউ মারলেন বাইরে।
সেট-পিস অনুশীলনে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী ডান পায়ের বুলেট গতির শটে লক্ষ্যভেদ করে বাহবা পেলেন কোচের। বাকিরাও হাততালি দিল। মালদ্বীপ ম্যাচে ১১ সেকেন্ডে জালের দেখা পাওয়া সুইডেন প্রবাসী এই ফরোয়ার্ড প্রস্তুতির শেষের দিকে মিলিকে পোস্টে ডেকে আলাদাভাবে শুটিং প্র্যাকটিস করলেন কিছুক্ষণ। গোলের জন্য দল যে তাকিয়ে থাকবে তার দিকে, বুঝতে পারছেন আনিকা নিজেও।
প্রস্তুতির এই পর্বে সতীর্থদের বেশ কিছু প্রচেষ্টা কখনও ঝাঁপিয়ে, কখনও লাফিয়ে, ফিস্ট-পাঞ্চ করে আটকে দিলেন মিলি আক্তার। এ মুহূর্তে কোচের প্রথম পছন্দের গোলকিপার তিনি। মালদ্বীপের বিপক্ষে দলের ৪-২ গোলে জেতা ম্যাচে অবশ্য মিলি পোস্টে শক্ত দেযাল গড়তে পারেননি। রক্ষণের ঢিলেমির কারণে তাকে দুইবার পরাস্ত করে এক পর্যায়ে সমতায় ফিরেছিল মালদ্বীপ।
জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে রোববার ভারতের শক্তিশালী আক্রমণভাগের তোপ সামলাতে মিলিকে দেখা যাবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। কেননা, গোলকিপিং কোচ মাসুদ আহমেদ উজ্জ্বল সময় নিয়ে কাজ করলেন দুটি উইমেন’স সাফ জয়ী গোলকিপার রুপনা চাকমার সাথেও। আরেক গোলকিপার স্বর্ণা রানী মন্ডলের অবশ্য ছিল না খুব একটা ব্যস্ততা।
এদিন সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটালেন বাটলার। অন্য দিনের অনুশীলনে তার সহকর্মীরাই পরিচালনা করেছেন সবকিছু, তিনি দেখেছেন শ্যেণ দৃষ্টি দিয়ে। এদিন সব বিভাগেই তার সরব উপস্থিতি। ভারত ম্যাচের সেরা একাদশ চূড়ান্ত করার সময় যে বেশি নেই। রোববার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় গ্রুপ সেরা হওয়ার লড়াইয়ে নামতে হবে। কোচ অবশ্য বলে গেলেন, ম্যাচের দিন সকালে চূড়ান্ত করবেন দল।
“আমার মনে হয়, এটা এমন একটা ম্যাচ যেটি আপনি খেলতে চাইবেন। এই অঞ্চলের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে নিজেদের পরীক্ষা করার জন্য এগুলো দারুণ সুযোগ। তবে আমার মনে হয় আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের দলে উমহেলা মারমা, ঋতুপর্ণা চাকমা, সুরভি আকন্দ প্রীতি, সাগরিকা, মোমিতা খাতুন, অর্পিতা বিশ্বাসের মতো খেলোয়াড় আছে। এই সব তরুণ মেয়েরা উঠে এসে দলের অন্যদের ওপর চাপ তৈরি করছে (জায়গা নেওয়ার জন্য)। তাই আমি মনে করি, এটা আসলে আমরা কোন অবস্থানে আছি তা দেখানোর এবং মাঠে গিয়ে ভালো ফুটবল খেলার চেষ্টা করার একটা দারুণ সুযোগ।”
“হ্যাঁ, কিছু পরিবর্তন আসবে (মালদ্বীপ ম্যাচ থেকে)। অল্প কিছু পরিবর্তন হবে। ভারম ম্যাচ আমাদের একটা সুযোগ দিচ্ছে কয়েকজন মেয়েকে আরও কিছু গেম টাইম দেওয়ার। মনিকা ফিরেছে। অপশন ওয়ান, অপশন টু, প্ল্যান-এ, প্ল্যান-বি, যে নামেই ডাকেন না কেন, আমাদের বেশ কিছু জিনিস করার বিকল্প আছে। তবে আমরা জানি, একটা শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছি। আমরা আগের ম্যাচের বিশ্লেষণ করব, সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেব এবং সকালে চূড়ান্ত করব সেরা একাদশ।”
সম্ভাব্য সেরা একাদশের ছবির অনেকটাই অবশ্য ফুটে উঠল অনুশীলনে। রক্ষণে জায়গা হারাতে পারেন আফঈদা খন্দকার। শিউলির ফেরার সম্ভাবনা কম। শামসুন্নাহার সিনিয়র, কোহাতি কিসকুর সাথে সুরমা জান্নাত ও সুরভি আক্তার আরফিনের কাঁধে উঠতে পারে প্রতিপক্ষের শক্তিশালী আক্রমণভাগ আটকানোর ভার।
মনিকার সাথে মারিয়ার মাঝমাঠে চেনা জুটি ফেরার সম্ভাবনা একরকম নিশ্চিত। তাদের সাথে আক্রমণের সুর বেঁধে দিতে থাকতে পারেন মোমিতা খাতুন। আক্রমণভাগ থাকতে পারে আগের মতোই। দুই উইং ধরে আক্রমণ শাণাবেন ঋতুপর্ণা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র, ফিনিশিংয়ের দায়িত্ব থাকবেন আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী।
আক্রমণভাগের শক্তি ভারত দেখিয়ে দিয়েছে মালদ্বীপকে ১১-০ গোলে উড়িয়ে। সাফে আট মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানে পাঁচটি জয় তাদের হলেও, সবশেষ দুই ম্যাচের জয়ী দল বাংলাদেশ।
২০২২ সালে ভারতের আধিপত্য ভেঙে প্রথম শিরোপা জয়ের পথে গ্রুপ পর্বে তাদেরকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিলেন ঋতুপর্ণা-মারিয়ারা। পরের বছর মুকুট ধরে রাখার পথে গ্রুপ পর্বেই দেখাতেই ৩-১ ব্যবধানে জিতেছিল বাংলাদেশ।
এই ম্যাচে গ্রুপ সেরা হয়ে সেমি-ফাইনালে ওঠার সমীকরণ মেলানোর বিষয়ও আছে। ‘বি’ গ্রুপের সেরা হতে ভারতের জন্য ড্রই যথেষ্ট। বাংলাদেশের প্রয়োজন জয়। তাহলে সেমি-ফাইনালে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ নেপালকে এড়ানো যাবে। বাটলার অবশ্য নকআউট পর্বের প্রতিপক্ষ, ভারতের নিজের মাঠে খেলা-এসব নিয়ে ভাবতে চান না।
“শুনুন, আপনি কার বিপক্ষে খেলছেন, সেটা কোনো বিষয় না। নেপালের বিপক্ষে খেলুন বা যেখানেই খেলুন, আমরা সেমি-ফাইনালে উঠেছি। যেখানে আমরা পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। এখন কাজ প্রতিটি ম্যাচকে ধাপে ধাপে নেওয়া। আমি অনেকবার এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। ভারতের বিপক্ষে খেলি, নাকি নেপালের বিরুক্ষে, তা নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত নই। তাদের আসতে দিন (আমাদের সামনে)।”
“এ ধরনের দলগুলোর মুখোমুখি হতে পারলে আমি বেশ খুশিই হই। যেমনটা বললাম, এটা আপনাকে পরীক্ষা করবে। আর, আমরা ভারতের বিপক্ষে খেলব, নাকি নেপালের বিপক্ষে বা অন্য কারো বিপক্ষে, এ নিয়ে আমার কোনো আলাদা পছন্দ নেই। আমি শুধু মনে করি, এটা মেয়েদের জন্য মাঠে গিয়ে নিজেদের প্রমাণ করার এবং তারা কী দিতে পারে, তা দেখানোর একটা দারুণ সুযোগ।”
দৃঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বলে বাটলার ছুটলেন টিম বাসের দিকে। আয়েশী ভঙ্গিতে বসলেন শুরুর দিকের সিটে। আনিকা বসেছেন সবচেয়ে পেছনের সিটে। ভারত ম্যাচে বাংলাদেশের গোলের দাবি মেটানোর কাজটি যাকে করতে হবে সামনে থেকে!