সাফ উইমেন’স ফুটসাল
Published : 29 Jan 2026, 10:34 PM
চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস, একহাতে মাইক্রোফোন নিয়ে কথা বলতে এলেন সাবিনা খাতুন। এক পর্যায়ে সাফ উইমেন’স ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফির দিকে এক হাত বাড়িয়ে, হাতিরঝিলের এম্ফি অডিটোরিয়ামের সমর্থকে ঠাসা গ্যালারির দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললেন, ‘এই ট্রফি আপনাদের জন্য।” করতালিতে মুখরিত হলো চারদিক।
কোচ সাঈদ খোদারাহমি ইংরেজিতে কথা বলতে সাবলীল নন খুব একটা। এই ইরানি কোচ সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, দর্শকদের সালাম জানিয়ে বাংলায় বললেন, ‘কেমন আছো?’ এরপর ছোট ছোট কথায় জানালেন অনুভূতি, সেখানে বাংলাদেশের মেয়েদের সাফ ফুটসালের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আবেগ ফুটে উঠল প্রবলভাবে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বসেছিল সাফ উইমেন’স ফুটসালের প্রথম আসর। ছয় ম্যাচে পাঁচ জয় ও এক ড্রয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট সাবিনা জিতে নেন ১৪টি গোল করে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ট্রফি নিয়ে ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি অডিটোরিয়ামে মেয়েরা পা রাখেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। সেখানেই সবাইকে ধন্যবাদ জানান সাবিনা।
“আজকে যারা উপস্থিত আছেন, সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরা যখন দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনি, আপনারা অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও এভাবে আমাদের সমর্থন দেন। আমাদের মোটিভেশনটা এখানেই কাজ করে। তো আপনাদের জন্যেই এই অর্জন। আপনাদেরকেই এটা উৎসর্গ করছি। আপনারা সবসময় আমাদের সমর্থন দেন।“
“আমাদের এ পর্যন্ত নিয়ে আসার জন্য যে মানুষগুলো কঠোর পরিশ্রম করেছেন, ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়াল এবং সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান, বিশেষ করে যার কথা না বললেই নয়, ফুটসাল কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান স্যার, যিনি আমাদের পাশেই বসে আছেন, পাশাপাশি আমাদের কোচ, কোচিং স্টাফ, ফিজিও, মিডিয়া অফিসার, কিটম্যান, যারাই আছেন, সকলের পরিশ্রম এবং আপনাদের দোয়ায় এই অর্জন।”
“প্রতিটি ম্যাচেই (ম্যাচের পর) আমরা যখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাই, প্রতিটি জয়ের পর দেখা যায়, দেশের মানুষের ফুটবলের প্রতি, ফুটসালের প্রতি, খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা…যখন কোনো জয় হয় (পাই আমরা)। তো ওই জায়গা থেকেই আমার মনে হয় অনুপ্রেরণাটা আসে। মেয়েরা উৎসাহিত হয়, মেয়েদের খেলার আগ্রহ আরও বাড়ে। জেতার আগ্রহ বাড়ে। সেই জায়গা থেকেই এই ট্রফি আপনাদের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। আমাদের জন্য সকলে দোয়া করবেন।”
এক ফাঁকে বিজয়ীদের জন্য সাজানো মঞ্চের স্ক্রিণে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের জয়ের, সাবিনার গোলের মুহূর্তগুলো। এরপর বাংলায় কথা বলে সবাইকে চমকে দেন কোচ সাঈদ খোদারাহমি। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে, ছোট ছোট বাক্যে পুরোটা বলতে না পারলেও আবেগ আড়াল করেননি তিনি।
“আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছো? অভিনন্দন, বাংলাদেশের সব মানুষকে। আমি খুবই খুশি। বাফুফে, বাফুফে সভাপতি, বিশেষ করে ফুটসালের চেয়ারম্যান ইমরানকে অভিনন্দন। আপনাদের দেশে ফুটসাল শুরু হয়েছে মাস পাঁচেক। আমি মনে করি, সম্ভাবনা আছে।”
“(সাবিনাকে ডেকে তুলে বললেন) প্লিজ, ইনকারেজ। প্রতিটি খেলোয়াড়কে ধন্যবাদ। হয়ত তোমাদের উপর চাপ ছিল, কিন্তু আজ রাতে তোমরা সবাই খুশি। আমি খুশি। পরিবারের সবাই খুশি।”
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালসহ বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকদের সামনে পেয়ে ফুটসাল কমিটির চেয়ারম্যান ইমরানুর রহমান মিনি স্টেডিয়ামের দাবি তুললেন। দিলেন, সামনের দিনগুলোতে ফুটসাল থেকে আরও সাফল্য এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
“ফুটসালের যে জোয়ার হচ্ছে, আমার মনে হয় না, এমনটা আগে দেখেছি। সমালোচনা করলে করুন, তবে স্বাস্থ্যকর সমালোচনা করুন। আমার মনে হয়, সরকার, বাফুফে মিলে যদি আমাদের একটা মিনি স্টেডিয়াম দেয়, তাহলে এই মেয়েরা যে কী ভালো খেলে…আমরা ফুটসালের মানচিত্র বদলে দিব।”
সবশেষ মঞ্চে কথা বলতে এলেন তাবিথ আউয়াল। বাফুফে সভাপতির কথার বড় অংশ জুড়ে থাকলেন দুটি উইমেন’স সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ফুটসালের প্রথম ট্রফি জয়ী অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।
“কেবল সাফ ফুটসালের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য নয়, আমাদেরকে আরও একটা ট্রফি এনে দেওয়ার জন্য ফুটসাল দলকে অভিনন্দন। আমি অভিনন্দন জানাতে চাই আমাদের অধিনায়ক সাবিনাকে। যেটা আমি আগেও বলেছিলাম, সাবিনা হবে আমাদের প্রথম অ্যাথলেট, সেটা পুরুষ হোক, মহিলা হোক যে আমাদের দুইটা ফরম্যাটে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এনে দিবে। আমি জানি না, এই রেকর্ড কে ভঙ্গ করবে। তবে, যুগ যুগ ধরে আমাদেরকে সাবিনার নাম নিতে হবে। ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন সাবিনাকে।”
“আজকে থেকে আপনারা কিন্তু ভবিষ্যৎ খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করছেন। অভিনন্দন যারা এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিলেন। কোচও বলেছেন, ফুটসাল আমাদের মাত্র তিন মাস আগে শুরু হয়েছে। আমরা (একদিন) কথা বলছিলাম ইমরান ও হেড কোচের সাথে। ফুটসালে ছেলেদের পাঠাচ্ছি, মেয়েদের কেন পাঠাচ্ছি না। তখন কোচ আমাকে বললেন, আমাকে দুজন ইরানি মহিলা কোচ দেন, তারা তৈরি আছে।“
“তার কিছুদিন আগে আমি স্যার উইলসন স্কুলে ছিলাম, যেখানে আমার সাথে সুমাইয়াও ছিল একটা প্রোগ্রামে, আমি ওর সাথে কথা বললাম, আমরা সাফ ফুটসালে খেলব কি খেলব না, এ নিয়ে। ও বলল, আমাদের সুযোগ দেন, আমরা খেলব, আমরা জিতব। সুমাইয়া, ইমরান, হেড কোচের কথার কারণে আমি বললাম ঠিকাছে, চেষ্টা করা যাক। তো একটা দল হয়ে ওঠার জন্য ধন্যবাদ, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
এরপরই মঞ্চে বাজতে থাকে ডিজে ব্রাভোর ‘চ্যাম্পিয়ন, চ্যাম্পিয়ন’ গান। শুরু হয় ফটোসেশন। গণমাধ্যমকর্মীরাও এক পর্যায়ে যোগ দেন ফটোসেশনে। স্মরণীয় মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করে রাখতে ছবি, সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে যায়।