১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

হকি থেকে ফুটবলের ‘ওয়ান ক্লাব ম্যান’, এখন স্পেনের বিশ্বকাপ নায়ক

লামিন ইয়ামালকে নিয়ে আলোড়ন বেশি হলেও আড়ালে থেকেই আসল কাজটি করে যাচ্ছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল।

হকি থেকে ফুটবলের ‘ওয়ান ক্লাব ম্যান’, এখন স্পেনের বিশ্বকাপ নায়ক
বলের ও গোলের গন্ধ পেতে ভালোবাসেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। ছবি: রয়টার্স।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Jul 2026, 06:56 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:34 PM

মিকেল ওয়াইয়ারসাবাল যখন হকি খেলতেন, প্রচুর গোল করতেন তখন। তার মাথায় তখন সবসময় ঘুরত, “একটি গোল মিস করলেও কিছু যায় আসে না, আরও সুযোগ আসবে। আমি সত্যিই গোলের গন্ধ পেতাম…।” সেই গন্ধ তিনি এখনও পান। তবে আঙিনা বদলে গেছে। এখন তিনি স্টিকের জাদু দেখান না, পায়ের ঝলক দেখান। স্পেনের ফরোয়ার্ডের সেই দীপ্তিতে আলোকিত এবারের বিশ্বকাপ।

এই স্পেন দলের সবচেয়ে বড় তারকা নিঃসন্দেহে লামিন ইয়ামাল। সবচেয়ে বড় ভরসাও। দলে তারকা আছে আরও অনেক। কিন্তু ক্লাব ফুটবল ও জাতীয় দলে অনেক বছর ধরে খেলেও ওয়াইয়ারসাবাল ঠিক তারকার কাতারে ছিলেন না। এবার বিশ্বকাপে তিনিই দলের ধ্রুবতারা।

কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ে শুরুর পর সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের বড় জয়ে জোড়া গোল করেন তিনি। এরপর শেষ ষোলোয় ওঠার পথে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও জালের দেখা পেয়েছেন দুবার। চার গোল নিয়ে এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে দলের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার।

যদিও আকর্ষণ ও কৌতূহলের কেন্দ্রে এখনও ইয়ামাল। স্পেনের প্রতিটি ম্যাচের আগে ভক্তদের জার্সির পেছনে তার নামই দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ওয়াইয়ারসাবালের নাম এখনও লোকের মুখে মুখে নেই বা তাকে নিয়ে প্রত্যাশিত তোলপাড় নেই। তবু পাদপ্রদীপের আলো কিছুটা হলেও পড়ছে তার ওপর।

স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিইয়ের্মো বালাগে বিসিবি রেডিও ৫ লাইভে তুলে ধরলেন সে বাস্তবতা।

“এটা খুবই স্পষ্ট যে সে (ইয়ামাল) দলের নেতা, এবং দলের সবাই যা কিছু করছে, সবকিছু তাকে কেন্দ্র করেই। মিকেল ওইয়ারসাবাল সেখানে প্রায় অদৃশ্য একজন। তবে নিজের কাজ তিনি করে যাচ্ছেন, যেমনটি সবসময় করেন।

যতগুলি ফাইনাল খেলেছেন ক্যারিয়ারে, সবকটিতে গোল করেছেন তিনি। এই দলের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলারদের একজন তিনি এবং দলকে ম্যাচ জেতাতে পারেন।”

২৯ বছর বয়সী এই ফুটবলারার ক্যারিয়ারজুড়েই অবশ্য আড়াল থেকেই কাজটা করে আসছেন। তবে বড় উপলক্ষ রাঙাতে তার জুড়ি নেই।  

এক ক্লাবেই এক ক্যারিয়ার

স্প্যানিশ ফুটবলে ওইয়ারসাবালের আরেকটি বড় পরিচয় আছে- ‘ওয়ান ক্লাব ম্যান।’ আধুনিক ফুটবলের সেই বিরলদের একজন, গোটা ক্যারিয়ার যিনি এক ক্লাবেই খেলেছেন।

তার জন্ম এইবার শহরে। এইবারের একাডেমিতেই ফুটবলের পাঠ শুরু। তবে ১৪ বছর বয়সে চলে যান রেয়াল সোসিয়েদাদে। ব্যস, সেই বন্ধন চলছে ১৫ বছর ধরে।

একাডেমি পর্যায়ে একটি মৌসুম অবশ্য আবার এইবারে গিয়েছিলেন। তবে পেশাদার ক্যারিয়ারের পুরোটাই আছেন সোসিয়েদাদে। ২০১৪ সালে ‘বি’ দল হয়ে পরের বছর মূল দলে অভিষেক। এখন খেলে ফেলেছেন চারশর বেশি ম্যাচ।

জাতীয় দলের হয়ে তার অভিষেক ১০ বছর আগে। খেলেছেন এখনও পর্যন্ত ৫৭ ম্যাচ। গোল করেছেন ২৯টি। কিন্তু বেশির ভাগ সময় প্রচারের আলোর ছোঁয়া সেভাবে পাননি তিনি।

২০২১ টোকিও অলিম্পিকসের ফাইনালে গোল করেন তিনি। গোল করেন ওই বছর নেশন্স লিগ ফাইনালেও। ২০২৪ ইউরোর ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৬তম মিনিটে তার গোলেই চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।

তার ক্যারিয়ারের বড় একটা আক্ষেপ ছিল বিশ্বকাপ। বাঁম হাঁটুর গুরুতর এসিএল চোটে পড়ে গত বিশ্বকাপে খেলা হয়নি তার।

লামিন ইয়ামালের কারণে সহজ হচ্ছে মিকেল ওইয়ারসাবালের কাজ। ছবি: রয়টার্স।

লামিন ইয়ামালের কারণে সহজ হচ্ছে মিকেল ওইয়ারসাবালের কাজ

এবারের আসরে আসেন তিনি ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থেকে। লা লিগায় এবার করেন তিনি ১৫ গোল, তার ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম এটি। বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের হয়ে ১২ ম্যাচে গোল করেন ১২টি।

তবে বিশ্বকাপের শুরুটা দলের মতো তারও চরম হতাশাজনক। কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে প্রথম ৩০ মিনিটে বলই স্পর্শ করতে পারেননি। ১৯৬৬ আসর থেকে এসবের হিসাব রাখার পর তিনিই প্রথম ফুটবলার, প্রথম আধ ঘণ্টায় যিনি বলের ছোঁয়া পাননি। তবে সেই হতাশা পেছনে ফেলে পরের তিন ম্যাচের দুটিতেই করলেন দুটি করে গোল।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ৪০ বছর পর স্পেনের জার্সিতে নকআউটে জোড়া গোল করতে পারলেন কেউ। সবশেষ ১৯৮৬ সারে ডেনমার্কের বিপক্ষে করেছিলেন এমিলিও বুত্রাগেনিও।

ওইয়ারসাবাল এখনকে এখন দলের অপরিহার্য অংশ মনে করছেন স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিইয়ের্মো বালাগে।

“ফিট হয়ে ওঠার পর গত দুই মৌসুমে ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছে সে। সেই পথে ধরে এবার বিশ্বকাপে চারটি গোল – নিঃসন্দেহে আমাদের সবচেয়ে কার্যকর ফুটবলার।”

পজিশনের পরিবর্তন

প্রথাগত কোনো স্ট্রাইকার ছাড়াই ২০১২ ইউরোতে দাপটে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ তৈরি করেছিল স্পেন। তাদের এবারের দলের যে গভীরতা, তাতে আবার তেমন কিছু করা যেত। তবে ওইয়ারসাবাল আছেন বলে তেমন কিছু করতে হচ্ছে না। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে এখন তিনি আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।

স্পেনের সাবেক ডিফেন্ডার সেসার আসপিলিকুয়েতা বিবিসি ওয়ানকে বলেন, নতুন পজিশনে মানিয়ে নিয়ে দলকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছেন ওইয়ারসাবাল।

“কয়েক বছর আগে ওইয়ারসাবাল ডান উইংয়ে বেশি খেলত। কিন্তু এখন সে মাঝামাঝি জায়গাটায় আরও বেশি মানিয়ে নিয়েছে। কখনও কখনও সেন্টার ফরোয়ার্ডের (ঘাটতির) কারণে স্পেনকে নিয়ে লোকের সংশয় জেগেছে। তবে এখন ওইয়ারসাবাল কাজটা দারুণভাবে করছে।”

গত বছরের শুরু থেকে ওইয়ারসাবালের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক গোল করা একমাত্র ইউরোপিয়ান ফুটবলার নরওয়ের স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড (২২)।

ইয়ামাল ও অন্যান্য

ওইয়ারসাবাল গোলের রথে ছুটলেও ইয়ামাল যে খুব খারাপ করছেন, এমন নয়। বরং সতীর্থের জ্বলে ওঠার পেছনেও বড় অবদান ১৮ বছর বয়সী এই তারকার।

ইয়ামালের চমৎকার বল নিয়ন্ত্রণ এবং ড্রিবলিং দক্ষতা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে স্পষ্টতই অস্বস্তিতে ফেলছে বারবার। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেই যেমন, ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে টেনে নিয়ে তিনি ওইয়ারসাবালের জন্য আরও জায়গা তৈরি করে দেন।

জার্মানির সাবেক মিডফিল্ডার টমাস হিটস্‌লস্পারগার তুলে ধরলেন এই দিকটিই।

“কোনো দলে যখন লামিন ইয়ামালের মতো কেউ থাকে, যার দিকে প্রতিপক্ষের কড়া নজর থাকে, তাকে সামলাতে গিয়ে জায়গা বের করে দেয় তারা। ওইয়ারসাবাল সেই জায়গাটা কাজে লাগায়, বল পায় এবং গোল করে।

শুধু ইয়ামাল ও ওইয়ারসাবালই নয়, স্পেনের এই দলটির শক্তির গভীরতা অনেক। এজন্যই তারা ইউরো জিতেছে এবং বিশ্বকাপেও শীর্ষ ফেভারিটদের মধ্যে আছে।

স্পেন এখন তাদের দ্বিতীয় দীর্ঘতম অপরাজেয় ধারায় রয়েছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয় দিয়ে এই ধারা টানা ৩৪ ম্যাচে পৌঁছেছে এবং পর্তুগালকে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে পৌঁছালে তারা নিজেদের ৩৫ ম্যাচের রেকর্ডটি স্পর্শ করবে।

ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ডিওন ডাবলিন বিবিসি রেডিও ৫ লাইভে বলেন, স্পেনের আরও ভালো করার সামর্থ্য আছে।

“আমার মনে হয় স্পেনের আরও ভালো খেলার ক্ষমতা রয়েছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তারা তৃতীয় বা চতুর্থ গিয়ারে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলছিল, কারণ তারা জানত যে প্রতিপক্ষের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না।”

“এটাই মূল বিষয়। যখন তারা ফ্রান্স বা পর্তুগালের বিপক্ষে খেলবে, প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কেন, তারা আবারও নিজেদের খেলার মান বাড়িয়ে দেবে। আমার মনে হয়, তাদের আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে এবং টুর্নামেন্টের বাকি দলগুলির জন্য এটা যথেষ্টই শঙ্কার বার্তা!”

কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী সোমবার ডালাসে পর্তুগালের মুখোমুখি হবে স্পেন।