২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 11 May 2026, 08:23 AM
নজরকাড়া ফুটবল দিয়ে বিশ্ব মঞ্চে জানান দিয়েছিলেন এন্সো ফের্নান্দেস। কাতারে কোটি হৃদয়ের সঙ্গে জিতে নিয়েছিলেন সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার। উন্নতির পথ ধরে বহু ধাপ এগিয়ে আসন্ন আসরে তিনি খেলবেন এই গ্রহের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে। আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন মাঝমাঠে বিভিন্ন পজিশনে খেলতে পারদর্শী ফের্নান্দেস।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন আর্জেন্টিনার এন্সো ফের্নান্দেস।
গত কয়েক বছর ধরে কেবল বিকশিতই হয়েছেন ফের্নান্দেস। ক্রমাগত উন্নতি করেছেন নিজের খেলার। কখনও রক্ষণে ভূমিকা রাখছেন তো, কখনও আক্রমণে সুর বেঁধে দিচ্ছেন। রিভার প্লেটে প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে বেনফিকায় নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
জাতীয় দলে দ্রুতই শুরুর একাদশে জায়গা পাকা করে নিয়েছেন ফের্নান্দেস। বিশাল অর্থের বিনিময়ে বেনফিকা থেকে যোগ দিয়েছেন চেলসিতে। হয়ে উঠেছেন দলটির অধিনায়কদের একজন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এই ক্লাবে তিনি আরও পরিণত হয়েছেন, জায়গা করে নিয়েছেন পরিপূর্ণ মিডফিল্ডারদের তালিকায়।
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কিংবা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, সবখানেই খেলতে সমান সচ্ছন্দ তিনি। আর এ কারণেই লিওনেল স্কালোনির পরিকল্পনায় এবারও তিনি হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন।

ফুটবলের আঙিনায় ফের্নান্দেসের অর্জন
পরিশ্রমী ফের্নান্দেসের ক্যারিয়ার এরই মধ্যে অনেকটাই সাফল্যে ভরা। বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ জয়ীদের ছোট তালিকায় আছেন তিনি।
২০২২ সালে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপ জয়ে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য। পরে গত বছর চেলসির হয়ে তিনি জেতেন নতুন আঙ্গিকের ক্লাব বিশ্বকাপ।
অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ফের্নান্দেস। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন মাঝমাঠের প্রাণ। মিডফিল্ডে বিভিন্ন পজিশনে, বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে দেখান নিজের সামর্থ্য। একই ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নানা ভূমিকায় খেলতে পারেন তিনি।
তার এই সামর্থ্য পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি। শুরুতে তাকে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলিয়েছেন তিনি। পরে আক্রমণে সহায়তার জন্য খেলিয়েছেন আরও ওপরে। চেলসির সাবেক কোচ এন্টসো মারেস্কার কোচিংয়ে আক্রমণভাগে হয়ে ওঠেন প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি। বক্সে প্রতিপক্ষের জন্য তিনি বড় বিপদের কারণ।
গত বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হারার পর, আগেভাগেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছিল আর্জেন্টিনা। মেক্সিকোর বিপক্ষে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না তাদের। বদলি নামার পর দর্শনীয় বাঁকানো শটে জাল খুঁজে নিয়ে দলের ২-০ ব্যবধানের জয়ে ভূমিকা রাখেন তিনি। পোল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ এবং শেষ ষোলোয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়েও অবদান রাখেন ফের্নান্দেস।
কোয়ার্টার-ফাইনালে নেদারল্যান্ডস, সেমি-ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া ও ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়েও অবদান ছিল ফের্নান্দেসের।
ইউরোপের এই মুহূর্তের সেরা দলের একটি পিএসজির বিপক্ষে গত ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে চেলসির জয়ে অবদান রাখা ফের্নান্দেসের সামনে অপেক্ষায় বিশ্বকাপ। উত্তর আমেরিকা আসরে সেই একই প্রভাব রাখতে পারেন তিনি।

কোচ, সতীর্থ ও গ্রেটদের দৃষ্টিতে ফের্নান্দেস
“সে খুবই পরিপূর্ণ একজন মিডফিল্ডার, যে মাঝমাঠের যে কোনো জায়গায় খেলতে পারে। দিনশেষে আপনি যখন দুই জন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার খেলান, তখন ওই দুই জনের মধ্যে সে ডানে না বামে খেলছে, সেটা তার জন্য কোনো ব্যাপার নয়। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের দুই দিকেই সে সমান সচ্ছন্দ। আমি মনে করি, আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়রা কয়েকটি পজিশনে মানিয়ে নিতে পারে…এন্সো পরিপূর্ণ একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, সে সেখানে যে কোনো জায়গায় খেলতে পারে।”
- লিওনেল স্কালোনি
“এন্সো যা করছে, তাতে আমি একটুও অবাক নই। আমি তার (সামর্থ্য) সম্পর্কে আমি ভালোভাবে জানি এবং অনুশীলনে তার সামর্থ্য দেখেছি। আমি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তার বিপক্ষে খেলেছি। সব সাফল্য তার প্রাপ্য, কারণ সে অসাধারণ একজন ব্যক্তি এবং দলে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়।”
- লিওনেল মেসি
“এমন তরুণ একজন খেলোয়াড়ের এত আত্মবিশ্বাস আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে। গত বছর তার যে পথচলা (দেখেছি), এমন কিছু আমি আগে কখনও দেখিনি। এসব তার ওপর কোনো প্রভাবও ফেলে না। আমি তাকে বিশ্বকাপে দেখেছি…সেখানে তাকে দেখে মনে হয়েছে, তার যেন এখানেই থাকার কথা। বিশ্বকাপে পারফর্ম করার যে চাপ ওই আর্জেন্টাইন দলের ওপর ছিল- শুধু দেশের জন্য নয়, মেসির জন্যও - এর অর্থ কী, সেটা কোনো সংখ্যা দিয়ে বোঝাতে পারবেন না। আর সেখানে গিয়ে সে এমনভাবে খেলল, যেন এটা সাধারণ কোনো ম্যাচ (দারুণ ব্যাপার)।”
- রিও ফার্ডিন্যান্ড
“সে যে কোনো পজিশনে মানিয়ে নিতে পারে। তার ক্রীড়া বুদ্ধিমত্তার জন্য সে ফলস নাইন, নাম্বার টেন হিসেব খেলতে পারে এবং ডানে বা বামেও খেলতে পারে। একজন খেলোয়াড়ের যখন ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা থাকে, সেটা তাকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।”
- পাবলো এস্কিভেল, ফের্নান্দেসকে আবিষ্কার করা ট্যালেন্ট স্কাউট

পরিসংখ্যানের আলোয় ফের্নান্দেস
• আর্জেন্টিনার একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন ফের্নান্দেস।
• যেখানেই খেলেছেন ট্রফি জিতেছেন ফের্নান্দেস। ডিফেন্সিয়া এন্ড জাস্টিসিয়ার হয়ে জিতেছেন সুদামেরিকানা ও রেকোপা সুদামেরিকানা শিরোপা। রিভার প্লেটের হয়ে জিতেছেন প্রিমিয়ার ডিভিশন ও ত্রোফেও দে কাম্পেওনেস শিরোপা। বেনফিকার হয়ে জিতেছেন প্রিমেইরা লিগা শিরোপা। চেলসির হয়ে কনফারেন্স লিগ ও ক্লাব বিশ্বকাপ শিরোপা।
আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ এবং কোপা আমেরিকায় রেকর্ড গড়া ষোড়শ শিরোপা জয়ে রেখেছেন অবদান।
• সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়ার আগে জাতীয় দলের হয়ে কেবল তিনটি ম্যাচ খেলেছিলেন ফের্নান্দেস। হন্ডুরাস, জ্যামাইকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে বদলি নেমেছিলেন তিনি। পোল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে প্রথমবার শুরুর একাদশে খেলেন তিনি। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে।
• ২০২৫ ক্লাব বিশ্বকাপে গোলে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল ফের্নান্দেসের। শিরোপা জয়ের পথে তিনটি গোলে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
• চলতি মৌসুমে চেলসির হয়ে এখন পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগে কোল পামালের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (৯টি) গোল করেছেন ফের্নান্দেস। তার চেয়ে বেশি জালের দেখা পেয়েছেন কেবল জোয়াও পেদ্রো।

বিশ্বকাপ মঞ্চে ফের্নান্দেস
বিশ্বকাপে কেবল একটি আসরেই খেলেছেন ফের্নান্দেস, ২০২২। সেখানে একটি গোল করেন তিনি, অবদান রাখেন আরেকটিতে। প্রথম দুই ম্যাচে বদলি নামার পর, তৃতীয় ম্যাচ থেকে শুরুর একাদশে খেলেন নিয়মিত।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে ফের্নান্দেস ও আর্জেন্টিনার প্রত্যাশা
আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখা অর্থাৎ জার্সিতে চতুর্থ তারকা যোগ করার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে ফের্নান্দেসের। প্রাথমিক লক্ষ্য অবশ্যই নকৱআউট পর্ব নিশ্চিত করা। ‘জে’ গ্রুপে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের তিন প্রতিপক্ষে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান।
মাঝমাঠে স্কালোনি সবচেয়ে বেশি যে ত্রয়ীকে ব্যবহার করেন তারা হলেন ফের্নান্দেস, আলেক্সিস মাক আলিস্তের ও রদ্রিগো দে পল। আগামী আসরেও তারাই হতে পারেন মাঝমাঠে আর্জেন্টিনা কোচের মূল অস্ত্র।
চার বছর আগে উদীয়মান খেলোয়াড় থেকে বিশ্ব মঞ্চে নজর কাড়া এক তারকায় পরিণত হন ফের্নান্দেস। এবার তিনি আর উঠতি কেউ নন, তার কাঁধে এবার প্রত্যাশার বিপুল চাপ। পারফর্ম করবেন, দলকে উৎসবের উপলক্ষ এনে দিবেন, তার কাছে এটাই প্রত্যাশা।