Published : 05 Aug 2023, 10:36 AM
দেশের ফুটবলের দ্বিতীয় স্তরের টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে (বিসিএল) এলিট একাডেমি প্রথম অংশ নেয় ২০২১-২২ মৌসুমে। সেবার তারা হয়েছিল চতুর্থ। গত আসরে হয় রানার্সআপ। চ্যাম্পিয়ন ব্রাদার্স ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের পয়েন্ট ব্যবধান ছিল মাত্র ৫। একাডেমির খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ছাপ কিছুটা হলেও ফুটে উঠছে এই তথ্যে। লিগের দলগুলো চাইছে একাডেমির খেলোয়াড়দের দলে টানতে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে) খুব করে চাইছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একাডেমির কার্যক্রম চালিয়ে নিতে। যদিও তাতে আশঙ্কার মেঘ কাটছে না পুরোপুরি।
বাফুফের চাওয়া পূরণের সামনে বড় এক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে পল থমাস স্মলির না থাকা। টেকনিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইংলিশ বংশোদ্ভূত এই অস্ট্রেলিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের একটি ছিল এই একাডেমি। খেলোয়াড় বাছাই, অনুশীলন সূচি, খাদ্যতালিকা থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু চলত তার নির্দেশনায়। কিন্তু গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাফুফের চাকরি ছেড়ে দেন স্মলি।
এই কর্মকর্তার প্রতি বিশেষ করে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের ছিল বিশেষ আস্থা। কিন্তু ‘অসুখী’ স্মলি থাকতে রাজি হননি। বাফুফের চাকরি ছেড়ে হাল ধরেছেন মালদ্বীপের ফুটবলের। স্মলির অনুপস্থিতিতে একাডেমির কার্যক্রম কেমন চলছে, সে খবর নিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। একাডেমির কোচ ও ফুটবলারদের ভাবনার পর এবার তৃতীয় ও শেষ পর্বে থাকছে একাডেমি নিয়ে বাফুফের বর্তমান ভাবনা।
বর্তমানে যে ছয় কোচ একাডেমি দেখভাল করছেন, তাদের মধ্যে এক-দুজন নাম না প্রকাশের শর্তে একাডেমির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা আড়াল করেননি। তবে বছর দুয়েক আগে প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমি কোচদের কাছে ফলপ্রসু হয়ে উঠতে শুরু করেছে, তা নিয়ে একমত তারা। উদাহরণ হিসেবে যেমন কোচ রাশেদ আহমেদ পাপ্পু বললেন সবশেষ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে জাতীয় দলের হয়ে খেলা মজিবুর রহমান জনির কথা।
“জাতীয় দলে জনি গেছে এই একাডেমি থেকে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছে। এবার অনেকের প্রস্তাব আছে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের মতো দলে খেলার। গত বছর যেমন আমাদের মিরাজুল মোহামেডানে খেলে এসেছে, এবারও ভালো অফার আছে। একাডেমি ফলপ্রসু না হলে তো আর ওরা আমাদের কাছে ফুটবলার চাইত না। গত বছর জাতীয় দলের কোচ হাভিয়ের (কাবরেরা) যখন এসেছিল, তখন আমাদের কয়েকজনকে ক্যাম্পে নিয়েছিল। ওর কাছ থেকেও আমরা ভালো ফিডব্যাক পেয়েছি।”

“অনূর্ধ্ব-১৬ ও ১৭ বছরের বেশি মিলিয়ে বর্তমানে ৫৬ খেলোয়াড় আছে এলিট একাডেমির। কিছু খেলোয়াড় ক্লাব থেকে রিক্রুট করেছি। মিরাজুল, ফয়সাল, চন্দন এরা ভালো করছে। জামাল (জাতীয় দলের অধিনায়ক) যেমন খেলে চন্দনের মধ্যে সেই ফুটবলটা পাওয়া যায়। এমন আরও অনেকে আছে, যারা এক-দুই বছরের মধ্যে ভালো করবে বলে আশা রাখি আমরা।”
কোচদের কণ্ঠে ইতিবাচক কথার সুর বাজলেও একাডেমির নানা দিকের অপূর্ণতা অবশ্য আড়াল হচ্ছে না মোটেও। যেমন, খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের বয়স নিরুপণে এখনও সেই জন্মসনদে ভরসা রাখতে হচ্ছে। তাতে বয়স চুরির পুরোনো রোগ কতটা সারছে, তা নিয়ে থেকেই যাচ্ছে প্রশ্ন। কোচ জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু জানালেন, অভিজ্ঞতা আর চোখের দেখার সেই বরাবরের প্রথা মেনেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাদের।
“বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যেহেতু আমাদের দেশে ডাক্তারি পরীক্ষা বা উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই, সেক্ষেত্রে আমাদের একমাত্র উপায় জন্মসনদ বা বিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট। এগুলো দেখেই আমাদের খেলোয়াড় বাছাই করতে হয়, সেক্ষেত্রে একটু এদিক-ওদিক হতে পারে। তবে আমরাও এই বয়সটা পার করে এসেছি; অভিজ্ঞতা হয়েছে। ফলে খেলোয়াড়দের গড়ন দেখলে তাদের বয়সটা আমরা বুঝি।”
এই উঠতিদের বেলায় মনস্তাত্বিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বেড়ে ওঠার এই বয়সে তাদের মানসিক দিকগুলো দেখভালের জন্য পেশাদার মনোবিদ নেই একাডেমিতে। কোচ আবুল হোসেন জানালেন, মনোবিদের কাজটুকু করছেন তারাই।
“খেলোয়াড়দের মানসিকতা নিয়ে আমরা সবসময় কাজ করি। কোনো খেলোয়াড়ের মান যদি নিচের দিকে যায়, কেন যায়? সেগুলো নিয়ে ওয়ান টু ওয়ান বসে আলোচনা করি, সমস্যা জিজ্ঞেস করি, যদি ওরা মন খুলে বলে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করি। যেহেতু আমরা কোচিংয়ের সময় এ ধরণের ট্রেনিং করি, খেলোয়াড়দের কিভাবে উদ্বুদ্ধ করা যায়, সেগুলো নিয়ে কাজ করি। তবে হ্যাঁ, মনোবিদ থাকলে তো
অবশ্যই ভালো।”

আরও ভালো করতে কিছু দাবি-দাওয়া জানালেন পাপ্পু। বিশেষ করে বয়সভিত্তিক দলের সংখ্যা আরও বাড়ানো, একাডেমিতেই খেলোয়াড়দের শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা, জিম ও সুইমিংপুল কাছাকাছি থাকা, কেউ চোটে পড়লে এদিক-ওদিক যেন ছোটাছুটি না করতে হয়, সেজন্য সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিমের প্রয়োজনও অনুভব করছেন তিনি।
এছাড়া, জাতীয় দল ও ক্লাবগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বাড়ানো, যেখানে ম্যাচ খেলা কিংবা ভিন্ন আবহে অনুশীলনের সুযোগ মিলবে এই উঠতিদের, পেশাদার মনোবিদ ও ট্রেনার রাখা, আবাসনের ব্যবস্থা আরও উন্নত করার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে বলে মনে করেন ‘এ’ লাইসেন্সধারী এই কোচ।
“সবশেষ কোচিং কোর্সের সময় নেদারল্যান্ডসের একটা একাডেমি নিয়ে পড়তে হয়েছে আমাদের। সেখানে দেখলাম আধুনিক একটা একাডেমিতে কত ধরনের সুবিধা থাকে। আর্থিক সংকট বা অনেক কারণে হয়ত আমাদের এখানে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না, কিন্তু কিছু বিষয় চর্চা করা সম্ভব। যেমন জাতীয় দলের খেলার যে দর্শন, যে ফর্মেশন, সেগুলোর চর্চা শুরু হয় একাডেমিতেই। আমাদের এখানেও এই ধরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।”
একাডেমির এই প্রয়োজনগুলো, কমতিগুলো স্বীকার করলেন বাফুফের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পদক ইমরান হোসেন তুষার। এগুলো পূরণে আর্থিক সংকট সত্ত্বেও একাডেমির কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হবে বলে জানালেন তিনি।
“আমরা নতুন একজন ডিরেক্টর আনার চেষ্টা করছি। স্মলির জন্য কোনো কিছু থেমে থাকবে না। বর্তমানে যারা আছেন, তারা ঠিকঠাক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই কোচরা স্মলির সঙ্গেই কাজ করেছেন। একাডেমির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই। বাফুফে এটিকে এগিয়ে নিবেই। কেননা, এখান থেকে আমাদের প্রতিদান আসা সবে শুরু হয়েছে।”
“কিছু দিকে উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা আমরাও অনুভব করছি। একাডেমির খেলোয়াড়দের আবাসন, খাবারের মান বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করছেন ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান। মেডিকেল টিম যে একেবারে নেই, তা নয়। বাফুফের যে মেডিকেল টিম আছে, তারা সবসময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ট্রেনার, মনোবিদের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি আমরা। আসলে আর্থিক সংকটের কারণে অনেক কিছু করা হয়ে উঠছে না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সংকট যতই থাকুক, একাডেমির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া নিয়ে কোনো আশঙ্কা নেই।”
এলিট একাডেমি বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটির আওতাধীন। এই কমিটির প্রধান আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক অবশ্য আশা-শঙ্কা দুটি নিয়েই কথা বললেন।
“যখন আমরা এটা শুরু করলাম, তখন থেকেই এটা নিয়ে প্রশ্ন ছিল-আমরা চালিয়ে যেতে পারব কিনা। কেননা, আমাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা কম, এখনও আর্থিক সমস্যা আছে। এ কারণে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, আমরা এটা আরও দশ বছর চালিয়ে নিতে পারব, কিন্তু এতটুকু বলতে পারি, আমরা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।”
“ক্লাবগুলো একাডেমির খেলোয়াড়দের নিয়ে এখন আগ্রহ দেখাচ্ছে। এটা ইতিবাচক দিক। আমরা এখান থেকে অর্থ আয়ের কথা ওভাবে ভাবিনি; চেয়েছিলাম ক্লাব ও জাতীয় দলের মানোন্নয়নে পাইপলাইনে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় রাখা হবে একাডেমির কাজ। সে চাওয়া কিছুটা হলেও পূরণ হতে শুরু করেছে। একাডেমি ফলপ্রসূ হতে শুরু করেছে। এই ছেলেরা বিপিএলে খেলেছে, লিগের দলগুলো তাদের নিতে চাইছে, যোগ্যতা আছে বলেই ক্লাবগুলো এই খেলোয়াড়দের নিতে চাইছে।”
ক্লাবগুলোর কাছে খেলোয়াড় বিক্রি করতে নিলাম ডাকবে বাফুফে। সেখান থেকে একটা অংশ আয় হবে সংস্থাটির। তবে এই আর্থিক দিকের চেয়ে খেলোয়াড়দের জীবনমান উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চান মানিক।
“আমাদের লিগের ক্লাবগুলোর মধ্যে মাত্র দুই-তিনটি ক্লাবের মোটা অঙ্কের খরচের সামর্থ্য আছে। ফলে চাইলেই আমরা বেশি দামে খেলোয়াড় ছাড়তে পারব না। তবে যখন লিগের মান আরও ভালো হবে, ক্লাবগুলোর সামর্থ্য আরও বাড়বে, তখন সবার মতো একাডেমির খেলোয়াড়দেরও চাহিদা বাড়বে। এখন আমরা বরং ভাবছি, ছেলেদের বেতনটা অরেকটু বাড়ানো, খাবারের মান আরেকটু উন্নত করার কথা। মাসিক পারিশ্রমিক বাড়লে ওরা নিজেদের হাত খরচ, কিছু কেনাকাটা সারতে পারবে। এটা হলে ওদের বাবা-মাও আশ্বস্ত হবে ছেলেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তবে এগুলো নিশ্চিত করতে, একাডেমি চালিয়ে নিতে আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।”
সারকথা, একাডেমি নিয়ে আশা-শঙ্কার যে দুলুনি, সেটির মূল কারণ আর্থিক সংকট।