চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
Published : 12 Mar 2025, 09:48 PM
একদিন খলনায়ক তো পরের দিন নায়ক- গোলরক্ষকের জীবন এমনই। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঠিক সেটাই ঘটেছে পিএসজির জানলুইজি দোন্নারুম্মার সঙ্গে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলোর প্রথম লেগে পিএসজি সমর্থকদের চোখে খলনায়ক ছিলেন দোন্নারুম্মা। ৮৮তম মিনিটে হার্ভি এলিয়টের গোলের জন্য কেউ কেউ দায়ী করেন তাকে। সেটাই ছিল লক্ষ্যে লিভারপুলের একমাত্র শট।
অন্যদিকে, ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচের একটি উপহার দিয়েছিলেন লিভারপুলের ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক আলিসন। চীনের প্রাচীর হয়ে তিনি ঠেকিয়ে রেখেছিলেন পিএসজির আক্রমণের জোয়ার।
অ্যানফিল্ডে ফিরতি লেগে মঙ্গলবার রাতে সেই চিত্র পাল্টে গেল। সেখানে টাইব্রেকারে লিভারপুলের দুটি শট ঠেকিয়ে পিএসজির জয়ের নায়ক দোন্নারুম্মা। ইতালির দীর্ঘদেহী এই গোলরক্ষকের বীরত্বেই নখ কামড়ানো উত্তেজনার লড়াইয়ে জিতে কোয়ার্টার-ফাইনালে জায়গা করে নেয় ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা।
পিএসজি কোচও বললেন সেই কথা, প্রথম লেগে নায়ক ছিলেন আলিসন, দ্বিতীয় লেগে দোন্নারুম্মা।
দোন্নারুম্মার পেনাল্টি রেকর্ড
লিভারপুল ম্যাচ দিয়ে দেশ ও ক্লাব মিলিয়ে সাত টাইব্রেকারের ছয়টিতে জিতলেন দোন্নারুম্মা।
১৬ বছর বয়সে শৈশবের ক্লাব এসি মিলানে অভিষেকের পর এখন পর্যন্ত দেশ ও ক্লাবের হয়ে ৬০টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়েছেন দোন্নারুম্মা। এর ১৪টি ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি, যা ২৩.৩ শতাংশ।
বিস্ময়কভাবে ইতালির হয়ে তার পেনাল্টি সেভের হারও একই। ২৬ বছর বয়সী গোলরক্ষক দেশের হয়ে ৪৩ স্পট কিকের ১০টি ঠেকিয়েছেন- যা ঠিক ২৩.৩ শতাংশ।
ইতালি ২০২০ ইউরোর শিরোপা জয়ের পথে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জেতেন দোন্নারুম্মা। ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে তিনি ফেরান বুকায়ো সাকা ও জ্যাডন স্যানচোর শট।
ম্যাচ ও টাইব্রেকার মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১০৩ স্পট কিকের ২৪ সেভ করেছেন তিনি।
দোন্নারুম্মার পেনাল্টি রেকর্ড:
|
দল |
কখন |
সংখ্যা |
সেভ |
|
ইতালি |
ম্যাচে |
৭ |
২ |
|
ইতালি |
টাইব্রেকারে |
৯ |
৩ |
|
এসি মিলান |
ম্যাচে |
৩৮ |
৯ |
|
এসি মিলান |
টাইব্রেকারে |
২৪ |
৪ |
|
পিএসজি |
ম্যাচে |
১৫ |
৩ |
|
পিএসজি |
টাইব্রেকারে |
১০ |
৩ |
লিভারপুল ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষ হতেই টানেলে চলে যান দোন্নারুম্মা। তাই শুনতে পাননি দলকে উদ্দেশ্য করে এনরিকের টাইব্রেকার-পূর্ব কথাগুলো। কেন এমন করেছিলেন সেটা পরে বলেছেন পিএসজি গোলরক্ষক।
“আমি আমার ট্রেনারের সঙ্গে আগেই একটা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম…আমি সাংবাদিকদের থেকে প্রচুর সমালোচনা শুনেছি, যারা জানেই না গোলরক্ষকের কাজটা কী। প্রথম লেগে আমরা একটা শট ও একটা গোল হজম করেছিলাম। দেখে মনে হয়েছে এটা আমার ভুল ছিল; কিন্তু আমি সবসময় হাসিমুথেই থাকার কথা ভেবেছি, নিজের সেরাটা দিয়েছি এবং দলের জন্য কাজ করেছি।”
দোন্নারুম্মার পেনাল্টি সেভের হার
|
দল |
সংখ্যা |
সেভ |
হার |
|
ইতালি |
১৬ |
৫ |
৩১.৩% |
|
এস মিলান |
৬২ |
১৩ |
২১% |
|
পিএসজি |
২৫ |
৬ |
২৪% |
যে কৌশলে সফল দোন্নারুম্মা
পোস্টে ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার দোন্নারুম্মাকে অনতিক্রম্য এক বাধার মতো দেখায়। তবে অন্য অনেক গোলরক্ষকের চেয়ে পেনাল্টির ক্ষেত্রে তিনি একটু ভিন্ন কৌশল নেন।
অনেক গোলরক্ষক পেনাল্টি শট নেওয়ার আগের সময়টা কাজে লাগান। চেষ্টা করেন, শট নিতে যাওয়া খেলোয়াড়ের ভাবনার জগতে প্রভাব ফেলার এবং তাকে চিন্তিত করে তোলার। প্রতিপক্ষের শট নেওয়ার প্রক্রিয়াটাকে ধীর করে দেওয়ার চেষ্টা করেন, এদিক-সেদিক নড়াচড়া করতে থাকেন।
দোন্নারুম্মা এক্ষেত্রে ভিন্ন।
স্থির হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি, খেলোয়াড় স্পটে বল রাখার আগে পর্যন্ত খুব একটা নড়েন না। যখন টেকার শট নেওয়ার জন্য তার রান আপে যান, সে সময়ে দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক হাত ছড়িয়ে দিয়ে পোস্টকে যতটা সম্ভব ছোট দেখানোর চেষ্টা করেন। তার এই কৌশল ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন লিভারপুলের সাবেক ডিফেন্ডার স্টিভেন ওয়ারনক।
“এর পেছনে যে ভাবনা কাজ করে সেটা হলো, শুরুতে যতটা সম্ভব সরু হয়ে দাঁড়ানো। বল স্পটে রাখার পর তাদের মনে সংশয় তৈরি করা। হাত-পা ছড়িয়ে নিজেকে বড় ও বেখাপ্পা দেখানো এবং গোলকে ক্ষুদ্র দেখানো।”
“প্রতিপক্ষ শট নিতে এগিয়ে আসার সময় এটা করা যাবে না। শেষ মুহূর্তে তাদের মনে সংশয় জাগানোর জন্য, বল স্পটে রাখার পরই এমনটা করতে হবে।”
টাইব্রেকারে দুটি শট ঠেকানোর পরও উচ্ছ্বাসে ভেসে যাননি না দোন্নারুম্মা। খুব একটা উদযাপনও করেননি, প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরের শট ঠেকানোর জন্য। সেই সময়টায় ফিরে গেলেন ওয়ারনক।
“এখানে বসে দোন্নারুম্মাকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, “ওয়াও, তার আকৃতিটা দেখো একবার!…সে যদি ঠিক দিকে ডাইভ দেয় তাহলে জোর সম্ভবনা থাকবে বলের নাগাল পেয়ে যাওয়ার। এই লোক একটা দানব।”