১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: লুকা মদ্রিচ

৪০ বছর বয়সেও আসছে বিশ্বকাপে ক্রোয়াটদের জন‍্য বড় ভরসা এই মিডফিল্ডার।

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: লুকা মদ্রিচ
লুকা মদ্রিচ। ছবি: ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jun 2026, 06:10 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:17 PM

দৃষ্টিনন্দন ফুটবল, অসাধারণ দূরদর্শিতা, দলের প্রতি শতভাগ নিবেদন- সবকিছুর মিশেলে অবিশ্বাস্য এক ফুটবলার লুকা মদ্রিচ। মান ও দক্ষতার মাপকাঠিতে তার সমতুল্য বর্তমানে খুঁজে মেলা ভার, ফুটবলের দুনিয়ায় যার শ্রেষ্টত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে অনেক আগে।

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন ক্রোয়েশিয়ার প্লেমেকার লুকা মদ্রিচ।

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে তার বয়স হয়েছে। ৪০ বছরের ভারে দুই পায়ে কমেছে গতি, আগের মতো তড়িৎ মুভমেন্টও নেই। কিন্তু তার ক্ষুরধার ফুটবল মস্কিষ্কের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাইতো এই বয়সেও তিনি মাঝমাঠের সেরাদের একজন।

মদ্রিচের নেতৃত্বে গত দুই বিশ্বকাপেই সেমি-ফাইনাল খেলে ক্রোয়েশিয়া, ২০১৮ আসরে রানার্সআপ ও ২০২২ আসরে তৃতীয় হয় তারা। সাফল্যে ভরা রেয়াল মাদ্রিদ অধ্যায় শেষে এখন এসি মিলানের মাঝমাঠের কাণ্ডারি তিনি। সামনের লক্ষ্য- জাতীয় দলের হয়ে আরেকবার বিশ্ব মঞ্চে দ্যুতি ছড়ানোর, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজের সম্ভাব্য শেষটা রাঙানোর।

ফুটবলে মদ্রিচের অর্জন 

অসাধারণ কৌশল, কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা ও পরবর্তীতে প্রস্ফুটিত প্রভাববিস্তারী নেতৃত্বগুণ নিয়ে ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেন মদ্রিচ।

পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরুতে স্বদেশের ক্লাব দিনামো জাগরেবে নিজেকে মেলে ধরে ফুটবল বিশ্বের নজর কাড়েন ক্রোয়াট তারকা, যোগ দেন টটেনহ্যাম হটস্পারে। প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবটিতে চার মৌসুম খেলে তিনি পাড়ি জমান রেয়াল মাদ্রিদে, যেখানে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্ব সেরাদের একজন। 

স্প্যানিশ ক্লাবটিতে সবকিছুই জয় করেন মদ্রিচ: ছয়টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, চারটি লা লিগা ও ছয়টি ফিফা বৈশ্বিক শিরোপাসহ আরও অনেক কিছু এবং দলটির প্রতিটি সাফল্যেই তিনি ছিলেন অপরিহার্য অংশ, ঠিক যেন মাঝমাঠের হৃদস্পন্দন।

নিজস্ব ফুটবল শৈলীতে খেলার ধরণ বদলে দেওয়া এবং নিখুঁত পাস দেওয়ার সক্ষমতায় মদ্রিচ হয়ে উঠেছেন আধুনিক ফুটবলের সত্যিকারের প্লেমেকার, যিনি বদলে দিতে পারেন ম্যাচের গতিপথ- সুন্দর খেলাটির ইতিহাসে তার মতো খেলোয়াড় বিরল।

অনেকের মতে, তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার চূড়া স্পর্শ করে ২০১৮ সালে। রেয়ালের হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর, রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তোলেন তিনি। দুর্দান্ত ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জন্য ওই বছরের ‘দা বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’ পুরস্কারও জয় করেন মদ্রিচ। 

স্পেনের রাজধানীর ক্লাবটিতে ১৩টি শিরোপায় ভরা মৌসুম শেষে, গত বছর এসি মিলানে নাম লেখান মদ্রিচ। সেই থেকে সেরি আকে আলোকিত করছেন এবং নিজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার মেলে ধরে এসি মিলানকে পুনরুজ্জীবিত করছেন তিনি।

জাতীয় দলের হয়ে ইতোমধ্যে ১৯৬টি ম্যাচ খেলা মদ্রিচ এখনও জ্লাতকো দালিচের দলের আলোর দিশারী। এখন দেখার অপেক্ষা, ২০২৬ এর বৈশ্বিক মঞ্চেও মদ্রিচের ফুটবল জাদু কতটা বিমোহিত করতে পারে, প্রতিপক্ষকে কতটা এলোমেলো করে দিতে পারে।

সতীর্থ ও কোচদের চোখে মদ্রিচ

“লুকা আমাদের দলের হৃদস্পন্দন। সবকিছু তাকে ঘিরেই হয় এবং সে সবকিছু সহজ করে তোলে।”

-    জিনেদিন জিদান

“মদ্রিচ যেকোনো পজিশনে খেলতে পারে, কারণ সে পরিপূর্ণ ও আধুনিক ফুটবলার। এক আদর্শ পেশাদার এবং আমি যাদের কোচিং করিয়েছি, তাদের মধ্যে সেরাদের একজন। ফুটবলের প্রতি তার প্যাশন প্রবল, আর এ কারণেই এত দীর্ঘ সময় ধরে সে খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। মদ্রিচ অনন্য। কেউই তার কাছাকাছি নয়।”

-    কার্লো আনচেলত্তি

“কেবল একজন খেলোয়াড় রেয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে যাচ্ছে না, বরং একজন জিনিয়াস যে এই খেলাটিকে নিখাদ শিল্পে রুপান্তর করেছে, খুব ভালো এক বন্ধু, ভাই ছেড়ে যাচ্ছে। তার জন্য গ্যালারি দর্শকে ভরে ওঠে এবংসে  লাখো লাখো মানুষের দৃষ্টি টিভির পর্দায় আটকে রাখে। তারা একটি মুহূর্তও মিস করতে চায় না। বের্নাবেউয়ের আলো আর কখনও মাঠে ঢোকার সময় তার ওপর পড়বে না; কিন্তু ক্লাবের ইতিহাসে কিংবদন্তিদের পাশে তার নাম সারাজীবনের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।”

-    সের্হিও রামোস

“নিশ্চিতভাবেই সে এই জাতীয় দলের চালিকাশক্তি। তার প্রাণশক্তি ও সামর্থ্য, এই বয়সেও অসাধারণ এবং সবার জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। লুকা মদ্রিচের মতো খেলোয়াড় দলে থাকলে কাজ করাটা সহজতর হয়ে উঠে, যে ব্যক্তি ও পেশাদার হিসেবে পেশাদারিত্বের আদর্শ এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পালন করে, এমনকি তার ক্যারিয়ারের এই পর্যায়েও।”

-    জ্লাতকো দালিচ

পরিসংখ্যানের আলোয় মদ্রিচ

•    ছয়বার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে যৌথভাবে দানি কার্ভাহাল ও ফ্রান্সিসকো গেন্টোর সঙ্গে সর্বোচ্চ শিরোপা জয়ের রেকর্ডের মালিক মদ্রিচ।

•    ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলের হয়ে মদ্রিচের চেয়ে বেশি ম্যাচ কেউ খেলেননি।

•    রেয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ট্রফি জয়ী ফুটবলার এই প্লেমেকার। ক্লাবটির হয়ে ২৮টি শিরোপা জিতেছেন তিনি, ফুল-ব্যাক দানি কার্ভাহালের চেয়ে একটি বেশি। 

•    রেকর্ড সর্বোচ্চ ১২ বার ক্রোয়েশিয়ার বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছেন মদ্রিচ।

বিশ্বকাপে মদ্রিচের পদচারণা ও ২০২৬ ঘিরে ক্রোয়েশিয়ার প্রত্যাশা

বিশ্বকাপের মঞ্চে মদ্রিচের পথচলা শুরু ২০০৬ সালে। অভিষেক আসরে দুটি ম্যাচ খেলতে পারেন তিনি জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, করতে পারেননি উল্লেখযোগ্য কিছু। তার দলেরও ওই আসর কাটে ভুলে যাওয়ার মতো।

চার বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা আসরে তো খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি ক্রোয়াটরা। আর ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে তারা ওই ২০০৬ আসরের মতোই ভাগ্যবরণ করে, ছিটকে যায় গ্রুপ পর্ব থেকে। তিনটি ম্যাচই খেলেন মদ্রিচ এবং দারুণ একটি জয় পায় তারা। ক্যামেরুনের বিপক্ষে ৪-০ গোলে জয়ের আগে-পরে ব্রাজিল ও মেক্সিকোর বিপক্ষে পরাজিত হয় ৩-১ ব্যবধানে।

২০১৮ বিশ্বকাপে মদ্রিচের নেতৃত্বে যেন ভিন্ন এক দল ক্রোয়াটের দেখা মেলে এবং শুরু থেকেই দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মদ্রিচ। গ্রুপে প্রথম দুই রাউন্ডে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-০ ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ের পথে একটি করে গোল করেন তিনি। পরের ম্যাচে আইসল্যান্ডকেও হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে পরের ধাপে ওঠে ক্রোয়েশিয়া।

এরপর শেষ ষোলোয় ও ডেনমার্ক ও কোয়ার্টার-ফাইনালে স্বাগতিক রাশিয়াকে টাইব্রেকারে হারায় ক্রোয়েশিয়া এবং অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু শিরোপা লড়াইয়ে আর তারা পারেনি সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে, ফ্রান্সের বিপক্ষে ৪-২ গোলের হারে মদ্রিচও পারেননি বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় পা রাখতে।

চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে যাত্রার শুরুটা আশানুরূপ ছিল না ক্রোয়েশিয়ার; তবে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে থাকে। বেলজিয়াম, কানাডা ও মরক্কোকে নিয়ে গড়া গ্রুপ থেকে একটি জয় ও দুটি ড্রয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয় তারা। এরপর শেষ ষোলোয় জাপান ও শেষ আটে ব্রাজিলকে টাইব্রেকারে হারিয়ে দেয মদ্রিচরা। 

কিন্তু সেমি-ফাইনালে আর পারেনি তারা, হেরে যায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নও হয় লিওনেল মেসি ও তার দল। আর মরক্কোকে ২-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় ক্রোয়েশিয়া।

এবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, ঘানা ও পানামাকে গ্রুপ সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। পরিষ্কারভাবে তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকবে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করা এবং এরপর, গত দুই আসরের পারফরম্যান্সের ধারা ধরে রেখে এগিয়ে যাওয়া। চূড়ান্ত লক্ষ্য নিশ্চিতভাবেই শেষ ধাপটাও পেরিয়ে যাওয়া।

আগামী ১৭ জুন আরেক ফেভারিট ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াইয়ে দিয়ে যাত্রা শুরু হবে ক্রোয়েশিয়ার।