২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 16 Apr 2026, 08:02 AM
এশিয়ার গ্রেট ফুটবলারদের একজন সন হিউং মিন। মাঠে দ্যুতিময় উপস্থিতি, ক্ষুরধার মস্তিস্ক, দলের প্রতি নিবেদিত এবং বিশেষ করে ব্যক্তিগত সাফল্যে ভরা ক্যারিয়ার অনেক আগেই তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন দক্ষিণ কোরিয়ার ফরোয়ার্ড সন হিউং মিন।
দক্ষিণ কোরিয়া ও টটেনহ্যাম হটস্পারের ইতিহাসের সবসময়ের সেরাদের ছোট তালিকাতেও তিনি থাকবেন নিশ্চিতভাবেই। অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ এই তারকা এখন প্রস্তুত হচ্ছেন ক্যারিয়ারে চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলার জন্য। জাতীয় দলে তিনি এখনও আশা-ভরসার প্রতীক।
সর্বোচ্চ মঞ্চে সন আরও অনেক জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিবেন, দলকে এনে দিবেন স্মরণীয় আরও কিছু সাফল্য- সেই প্রত্যাশায় আছে দেশটির মানুষ।
সনের ফুটবল যাত্রা ও সাফল্য
গতিময় আক্রমণে প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণ এলোমেলো করে দেওয়া আর বক্সে অসাধারণ কার্যকারিতার যোগফলে সময়ের সেরা ফরোয়ার্ডদের কাতারে উঠেছেন সন। তবে স্কোরিংয়ের সংখ্যা দিয়েই কেবল তার মান যাচাই করা সম্ভব নয়। অনেকে হয়তো দলের আক্রমণ গড়ে তোলায় তার অবদান দেখতে পায় না; কিন্তু পরিসংখ্যান ভিন্ন গল্পই বলে।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রিমিয়ার লিগে তিন মৌসুমে তিনি অ্যাসিস্টের সংখ্যায় দুই অঙ্ক স্পর্শ করেন, যা তার সৃজনশীলতার প্রমাণ বহন করে।
১৮ বছর বয়সে বুন্ডেসলিগায় অভিষেকের পর থেকে, হামবুর্গ ও লেভারকুজেনের হয়ে পাঁচ বছরে ৪৯টি গোল করেন সন। এরপর ২৩ বছরে, ২০১৫ সালে তিনি যোগ দেন টটেনহ্যাম হটস্পারে এবং পরের এক দশকে ক্লাবটির জার্সিতে নিজেকে প্রিমিয়ার লিগের তারকা খেলোয়াড় পরিণত করেন সন।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তার একক নৈপুণ্যের অবিশ্বাস্য এক গোল আরও বহু বছর ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে থাকবে। সেদিন বার্নলির বিপক্ষে সাত জনকে কাটিয়ে ঠিকানা খুঁজে নেন সন; ওই গোলের জন্য সেবারের ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড জয় করেন তিনি, সেটা প্রিমিয়ার লিগের মৌসুম সেরা গোলও নির্বাচিত হয়।
প্রিমিয়ার লিগে টটেনহ্যাম কখনোই শিরোপা লড়াইয়ের ফেভারিট থাকে না, মূলত টেবিলের উপরের দিকে থেকে ইউরোপের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায জায়গা করে নেওয়াটাই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে। আর দলের সেই লক্ষ্য পূরণে বছরের পর বছর দারুণ কাজ করেছেন সন।
টটেনহ্যামের জার্সিতে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৫৪ ম্যাচ খেলে ১৭৩ গোল করেছেন সন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর, গত মৌসুমে পেশাদার ফুটবলে প্রথম মেজর শিরোপার স্বাদ পান তিনি, ‘স্পার্স’ নামে পরিচিত ক্লাবটির ইউরোপা লিগ জয়ে নেতৃত্ব দেন সন।
সেই ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ১-০ গোলে হারানোর পর, দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে ক্যামেরাবন্দি হন সন। সেটাই ছিল টটেনহ্যামের জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ। গত বছরের অগাস্টে তিনি যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের ক্লাব লস অ্যাঞ্জেলস এফসিতে।
এই দলবদল হয়তো আসছে বিশ্বকাপের জন্য তার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে। কারণ, এবারের ৪৮ দলের বিশ্বকাপ যে হবে উত্তর আমেরিকায়।
সতীর্থ ও কোচদের চোখে সন
“সে খুব ভালো মানুষ। কোনো উদাহরণ দিতে হলে বলব, যদি আমার মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে হয়, তাহলে আমি তার মতো একজনকে চাইব।”
- আন্তোনিও কন্তে
“আমরা সত্যিই একে অপরকে খুব পছন্দ করি। আমার টটেনহ্যাম অধ্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিল সে। এমএলএসে সে যা কিছু যোগ করবে, আমার মতে, সে এমন এক ধরনের খেলোয়াড় যে (সেখানে) খেলাটির ক্রমবিকাশে সাহায্য করবে।”
- মাওরিসিও পচেত্তিনো
“আপনি কি জানেন, গত সাত, আট বছরে সন আমাদের কতবার শাস্তি দিয়েছে?...ওহ ইশ্বর।”
- পেপ গুয়ার্দিওলা
“(আমাদের মধ্যে) সম্পর্কটা খুবই স্পেশাল। তার সঙ্গে খেলতে পারাটা ছিল অনেক সম্মানের… আমার কাছে, সে বিশ্বের সেরাদের একজন।”
- হ্যারি কেইন
“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি সন হিউং-মিনকে চুক্তিভুক্ত না করা।”
- ইয়ুর্গেন ক্লপ
পরিসংখ্যানের আলোয় সন
• দক্ষিণ কোরিয়া জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড সনের, ১৪০টি ম্যাচ। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার মোট গোল ৫৪টি, সর্বোচ্চ ৫৮ গোলের রেকর্ডধারী চা বুমকুমকে ছোঁয়ার পথে আছেন সন।
• বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনটি গোল করেছেন সন- আন জুংওয়ান ও পার্ক জিসুঙের সঙ্গে যৌথভাবে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ।
২০২৬ আসরে একটি গোল করতে পারলেই বিশ্বকাপে এশিয়ার ফুটবলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ চার গোল করা জাপানের কেইসুকে হোন্ডাকে স্পর্শ করবেন সন।
• তিনিই প্রথম ও এশিয়ার একমাত্র ফুটবলার হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে শত গোল করেছেন।
• টটেনহ্যামে ১০ বছরের অধ্যায়ে চারটি হ্যাটট্রিক করেন সন, প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে কেবল ১৫ জন খেলোয়াড় এই কীর্তি গড়েছেন।
• দুই পায়েই সমান পারদর্শিতার জন্য বিশেষ পরিচিতি আছে সনের। ডান পায়ের শটে বেশি ভীতি ছড়াতে পারেন তিনি, তবে একই সঙ্গে বাঁ পায়েও সমান কার্যকর। ২০২১-২২ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে গোল্ডেন বুট জয়ের পথে ২৩টি গোল করেন তিনি- ১১টি ডান পায়ে ও ১২টি বাঁ পায়ে।
• লস অ্যাঞ্জেলসে যোগ দিয়ে অভিষেক মৌসুমেই প্রভাব রেখেছেন সন, স্যান হোসে আর্থকোয়াকসের বিপক্ষে ফ্রি কিকে তার চমৎকার গোলটি এমএলএসের বর্ষসেরা গোল নির্বাচিত হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে সন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রত্যাশা
বিশ্বকাপে সনের অভিষেক হয় ২০১৪ আসরে। দ্বিতীয় ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রতিযোগিতায় গোলের খাতা খোলেন তিনি, ম্যাচটি যদিও তার দল হেরে যায় ৪-২ ব্যবধানে। ওই আসর তাদের একদমই ভালো কাটেনি, গ্রুপের তলানিতে থেকে বিদায় নেয় তারা।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে দুটি গোল করেন সন, কিন্তু আসরটা দক্ষিণ কোরিয়ার হতাশায় শেষ হয়। মেক্সিকোর বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে হারের ম্যাচে দলের একমাত্র গোলটি করেন তিনি।
তাদের বিদায়টা অবশ্য দুর্দান্ত হয়। অসাধারণ পারফরম্যান্সে তারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দেয় ২-০ ব্যবধানে, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে দ্বিতীয় গোলটা করেন সন। আগেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেলেও, স্মরণীয় ওই জয়ে সমর্থকদের কষ্ট কিছুটা দূর করতে পারেন তারা।

ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার আসছে আসরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য থাকবে কাতার বিশ্বকাপের অর্জনকে ছাপিয়ে যাওয়া। ২০২২ আসরে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে শেষ ষোলোয় উঠলেও, সেখানে ব্রাজিলের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হেরে যায় তারা।
দলের এই লক্ষ্য অর্জনের ভার অনেকটাই থাকবে সনের ওপর। তার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ান শিবিরে আরও আছেন লি কানগিন, কিম মিনজায়ে, লি জায়েসুং, ওয়াং ইনবিয়ম ওয়াং হিচান ও ওহ হায়িয়নগিউয়ের মতো খেলোয়াড়রা- বিশেষজ্ঞদের চোখে দেশটির ইতিহাসে যারা ‘সোনালী প্রজন্ম।’
আগামী ১১ জুন পর্দা উঠবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের। বাংলাদেশ সময় পরদিন সকালে চেক রিপাবলিকের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হবে দক্ষিণ কোরিয়ার।
‘এ’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা।