২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 03 Jun 2026, 10:18 AM
অলিম্পিকই ছিল তখন শেষ কথা। ১৯২৮ আসর শেষে বড় এক ধাক্কা খায় ফুটবল। জানা যায়, চার বছর পর লস অ্যাঞ্জেলসে থাকবে না এই ইভেন্ট! ওই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষপটে অনেক বাধা, বিপত্তি ও চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে ১৯৩০ সালে শুরু হয় ‘দা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ ফুটবল বিশ্বকাপ।
টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয় ১৯২৯ সালে। প্রস্তুতির জন্য কেবল এক বছর সময় পায় লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে।
এই আসরে কোনো বাছাইপর্ব ছিল না। মূলত আমন্ত্রণমূলক ছিল অংশগ্রহণ। ১৬ দেশের মধ্যে তিনটি শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে পারেনি। নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় এশিয়ার দুই দেশ জাপান ও থাইল্যান্ড (তৎকালীন সিয়াম)। ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ ধরতে না পারায় খেলতে পারেনি আফ্রিকার দেশ মিশর।
ইতালিতে টুর্নামেন্ট আয়োজন না করায় নাখোশ ছিল ইউরোপের অনেক দেশ। ইতালির পাশাপাশি অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের মতো সেই সময়ের ইউরোপের সেরা দলগুলো অংশ নেয়নি প্রথম আসরে।
আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার ঝক্কি, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রা এবং খেলোয়াড়দের চাকরি হারানোর শঙ্কায়ও কিছু দেশ টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি। সে সময় স্রেফ ফুটবল খেলে জীবন ধারণ সম্ভব ছিল না। অর্থনৈতিক মহামন্দার সময়ে চাকরি হারানোর ঝুঁকি নেওয়া ছিল ভীষণ কঠিন।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, একটা সময় মনে হচ্ছিল ইউরোপের কোনো দেশই শেষ পর্যন্ত খেলবে না বিশ্বকাপে। শেষ পর্যন্ত এই মহাদেশ থেকে চার দেশ অংশ নেয় টুর্নামেন্টে। তাদের কেউই র্যাঙ্কিংয়ে খুব একটা এগিয়ে ছিল না। সর্বোচ্চ সাতটি দেশ অংশ নেয় লাতিন আমেরিকা থেকে।
রোমানিয়ার দল বাছাই করেন স্বয়ং রাজা ক্যারল। তিনি খেলোয়াড়দের চাকরি থেকে তিন মাসের জন্য ছুটি দেন এবং ফিরে এলে তাদের চাকরির নিশ্চয়তা দেন।
১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিকে সোনা জয়ী উরুগুয়ে ছিল টুর্নামেন্টের ফেভারিট। অন্যদিকে তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা জিতেছিল ১৯২৯ সালের কোপা আমেরিকা। তখনও ফুটবলে তেমন কোনো বড় শক্তি ছিল না ব্রাজিল। অভ্যন্তরীন সমস্যায় কোনোরকম প্রস্তুতি নিয়ে খেলতে এসেছিল দেশটি।
কেবল একটি শহর- মন্তেভিদিওর তিনটি স্টেডিয়ামে হয় প্রথম আসর। শ্রমিকদের তিনটি দল আট ঘণ্টার তিনটি শিফটে ২৪ ঘণ্টা কাজ করার পরও ৯০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এস্তাদিও সেন্তেনারিও প্রস্তুত হয় টুর্নামেন্ট শুরুর পাঁচ দিন পর!
স্বাগতিকরা নিজেদের সব ম্যাচ খেলে এখানেই। স্বাভাবিকভাবেই পায় বাড়তি সময়। উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার ফাইনাল ছিল প্রত্যাশিত। দুই বছর আগে আমস্টারডামে অলিম্পিকের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল তারা। প্রথম লড়াই ১-১ ড্র হওয়ার পর, ২-১ ব্যবধানে জেতে উরুগুয়ে। দেশ দুটি কেবল প্রতিবেশীই ছিল না, ছিল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীও।
আসরে অংশ নেয় যে দেশগুলো-
ইউরোপ: বেলজিয়াম, ফ্রান্স, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া
উত্তর আমেরিকা: যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো
দক্ষিণ আমেরিকা: উরুগুয়ে, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পেরু, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে ও চিলি
১৩ দল চারটি গ্রুপে খেলে। গ্রুপগুলো হলো-
গ্রুপ ‘১’: আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, চিলি, মেক্সিকো
গ্রুপ ‘২’: ব্রাজিল, যুগোস্লাভিয়া, বলিভিয়া
গ্রুপ ‘৩’: উরুগুয়ে, পেরু, রোমানিয়া
গ্রুপ ‘৪’: যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, প্যারাগুয়ে
প্রথম গ্রুপের চারটি দেশেই পরবর্তী সময়ে বসে বিশ্বকাপের আসর। চার নম্বর গ্রুপের তিনটি দল তিনটি ভিন্ন মহাদেশের
উদ্বোধনী দিন ১৩ জুলাইয়ে মুখোমুখি হয় গ্রুপ ‘১’ এর দুই দল ফ্রান্স ও মেক্সিকো। বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলটি করেন ফ্রান্সের লুসিয়েঁ লরাঁ। একই সময়ে মাঠে নামে গ্রুপ ‘৪’ এর দল যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম। টুর্নামেন্টে প্রথম ক্লিনশিটের কীর্তি গড়েন যুক্তরাষ্ট্রের গোলরক্ষক জিমি ডগলাস।
গ্রুপ ‘১’ থেকে টানা তিন জয়ে সেমি-ফাইনালে যায় আর্জেন্টিনা। মেক্সিকোর বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন দলটির ফরোয়ার্ড গিয়েরমো স্তাবিলে।
গ্রুপ ‘২’ থেকে চমক দেখায় যুগোস্লাভিয়া। ব্রাজিলকে ২-১ ও বলিভিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয় তারা।
গ্রুপ ‘৩’ থেকে অনুমিতভাবে শেষ চার নিশ্চিত করে স্বাগতিক উরুগুয়ে। পেরুকে ১-০ ব্যবধানে হারানোর পর, রোমানিয়াকে উড়িয়ে দেয় তারা ৪-০ গোলে।
গ্রুপ ‘৪’ থেকে চমক দেখায় যুক্তরাষ্ট্র। বেলজিয়ামকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আসর শুরু করে তারা। প্যারাগুয়েকে একই ব্যবধানে হারিয়ে সেমি-ফাইনাল নিশ্চিত করে দলটি।
১৭ জুলাই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তিনটি গোলই করেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনড। বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক এটিই।
সেমি-ফাইনাল
বিভীষিকার স্মৃতি নিয়ে ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয় যুক্তরাষ্ট্র; ১৯২৮ অলিম্পিকে আমস্টারডামে দুই দলের লড়াইয়ে ১১-২ গোলে হেরেছিল দলটি।
২৬ জুলাই প্রথম সেমি-ফাইনালে তারা হারে ৬-১ ব্যবধানে। দুই জন খেলোয়াড় চোট পেলেও, সেই সময়ের অদ্ভূত নিয়মের জন্য তাদের বদলাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। সেমি-ফাইনালে খেলাই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে দেশটির সেরা অর্জন।
আর্জেন্টিনার হয়ে জোড়া গোল করেন স্তাবিলে আর কার্লোস পেউচেলে।
পরদিন দ্বিতীয় সেমি-ফাইনালে একই ব্যবধানে যুগোস্লাভিয়াকে হারায় উরুগুয়ে। ৬-১ গোলের জয়ে হ্যাটট্রিক করেন হোসে পেদ্রো সিয়া।
ফাইনাল
১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই। সেন্তেনারিও স্টেডিয়ামে প্রায় ৯৩ হাজার দর্শকের সামনে শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা।
প্রতিটি ম্যাচেই স্বাগতিক সমর্থকদের বিরূপ আচরণের মুখোমুখি হতে হয় আর্জেন্টিনা দলকে। পরিস্থিতি এত নাজুক ছিল যে, গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ের এক পর্যায়ে উরুগুয়ের প্রেসিডেন্টকে হস্তক্ষেপও করতে হয়।
ফাইনালে মাঠে বল গড়ানোর আগে শুরু হয় আরেক ঝামেলা, প্রশ্ন ওঠে কোন দলের দেওয়া বল দিয়ে হবে শিরোপার লড়াই। সমস্যা সমাধানে হস্তক্ষেপ করে ফিফা। সিদ্ধান্ত হয়- দুই অর্ধে খেলা হবে দুই দলের দেওয়া বল দিয়ে।
দ্বাদশ মিনিটে এগিয়ে যায় উরুগুয়ে। পাউচেলে ও স্তাবিলের গোলে এক পর্যায়ে ২-১ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে খেলা হয় উরুগুয়ের দেওয়া বলে। এই অর্ধে স্বাগতিকরা হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। তিনবার সফরকারীদের জালে বল পাঠিয়ে তারা শিরোপা জিতে নেয় ৪-২ ব্যবধানে।
একটি হ্যাটট্রিকসহ আট গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন আর্জেন্টিনার স্তাবিলে। ১৩ দেশের এই বিশ্ব আসরে ১৮ ম্যাচে গোল হয় ৭০টি।
শিরোপা উদযাপন করতে পরদিন ছুটি ঘোষণা করে উরুগুয়ে সরকার।
এক নজরে প্রথম বিশ্বকাপ
স্বাগতিক: উরুগুয়ে
চ্যাম্পিয়ন: উরুগুয়ে
রানার্সআপ: আর্জেন্টিনা
মোট ম্যাচ: ১৮
মোট গোল: ৭০
গোল গড়: ৩.৮৯
সর্বোচ্চ গোলদাতা: গিয়েরমো স্তাবিলে (আর্জেন্টিনা)- ৮ গোল
সেরা খেলোয়াড়: হোসে নাসাজি (উরুগুয়ে) [আন অফিসিয়াল