২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 03 Jun 2026, 08:46 AM
কেউ পায়ের কারিকুরিতে, কেউ বা গতিতে, কেউ আবার এই দুইয়ের মিশেলে কিংবা কেউ রক্ষণে দুর্দান্ত কার্যকারিতায় তারুণ্যেই ঝলক দেখিয়ে চলেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতেই উঠে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়। ক্লাব ফুটবলে ইতোমধ্যে তারা প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরাতে পেরেছেন, জাতীয় দলেও দিয়েছেন দুর্দান্ত কিছু করে দেখানোর আভাস। সেই সম্ভাবনাকেই এবার পূর্ণতা দেওয়ার পালা, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ- বিশ্বকাপে।
উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ সামনে রেখে প্রতিভাধর তরুণ তারকাদের নিয়ে ফিফার বিশেষ আয়োজন বিশ্বকাপের বিস্ময়বালক। এই পর্বে আছেন তুরস্কের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আর্দা গিলের।
জন্ম তারিখ: ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৫
দল: তুরস্ক ও রেয়াল মাদ্রিদ
আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক: ১৯ নভেম্বর ২০২২, চেক রিপাবলিকের বিপক্ষে (১৭ বছর বয়সে)
পজিশন: অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার
বিশেষ দক্ষতা: টেকনিক, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারক পাস দেওয়া সক্ষমতা, সেট-পিসে দক্ষতা ও দূর থেকে শট নিয়ে লক্ষ্যভেদ করার সামর্থ্য
কেন বিশ্বকাপের সেনসেশন হয়ে উঠতে পারেন গিলের?
‘তুরস্কে আর্দা খুবই সম্মানিত। নাপোলিতে যেমন মারাদোনা, ওই পর্যায়ের সম্মানের কথা বলছি’, আর্দা গিলেরকে নিয়ে বলেছেন তুরস্কের কোচ ভিনচেনজো মন্তেল্লা। এতেই স্পষ্ট তুরস্কের ফুটবলে কতটা পূজনীয় ২১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। এবারের বিশ্বকাপে তার কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ভালো কিছুর প্রত্যাশা থাকবে দেশটির সমর্থকদের।
গিলেরের বয়স যখন ১৩, তুরস্কের সেরা ক্লাবগুলোর একটি ফেনারবাচের নজরে পড়েন তিনি। ২০১৯ সালে তাদের যুব দলে যোগ দিয়ে বয়সভিত্তিক প্রায় সব পর্যায়েই খেলেন গিলের। এই ক্লাবের জার্সিতেই অভিষেক হয় তার পেশাদার ফুটবলে, ২০২১ সালে।
ফেনারবাচের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫১ ম্যাচ খেলে ৯টি গোল করেন গিলের। সতীর্থদের ১২টি গোলে রাখেন অবদান। ক্লাবটিতে দারুণ পারফরম্যান্সে নিজেকে মেলে ধরে ইউরোপের সফলতম ক্লাব রেয়াল মাদ্রিদের চোখে পড়েন তিনি। ২০২৩ সালে তাকে দলে টানে স্প্যানিশ ক্লাবটি।
রেয়ালে যোগ দেওয়ার পরপরই চোটে পড়েন গিলের। লম্বা একটা সময় মাঠের বাইরে থাকার পর, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দলটির হয়ে অভিষেক হয় তার। নিজের জাত চিনিয়ে, দারুণ সব পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে এখন রেয়ালের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছেন তিনি।
রেয়ালের জার্সিতে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১১১ ম্যাচ খেলেছেন গিলের। ১৮ গোল করার পাশাপাশি ১৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৫১ ম্যাচ খেলে ছয়টি গোল ও ১৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন গিলের।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার-ফাইনালের দ্বিতীয় লেগে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ৪-৩ গোলে হারের ম্যাচে দুটি গোল করেন গিলের। দল সেমি-ফাইনালে উঠতে না পারলেও চমৎকার ওই গোল দুটির জন্য প্রশংসায় ভাসেন তিনি।
গিলেরের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একজন ফরাসি গ্রেট থিয়েরি অঁরি বলেন, “সে ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দেয়। যখন কোনো তরুণ খেলোয়াড় এভাবে নিজেকে মেলে ধরে, তখন আর তার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার দরকার নেই… তার অর্জন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।”
২০২২ সালে ১৭ বছর বয়সে তুরস্কের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখেন গিলের। এখন পর্যন্ত ২৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তার গোল ছয়টি ও অ্যাসিস্ট সাতটি। দেশের জার্সিতে সবশেষ মাঠে নামেন তিনি গত মার্চে, কসোভোর বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লেঅফে।
নিজের জাদুকরী বাঁ-পায়ের কারুকার্যে ইউরোপের বড় মঞ্চ মাতানোর পর, গিলের এখন ফিফা বিশ্বকাপে যাচ্ছেন আসরের আলোচিত খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে।
কোচ ও সাবেকদের চোখে গিলের
“তার দারুণ প্রতিভা, চমৎকার দূরদর্শিতা, ফল নির্ধারক পাস দেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো দুর্দান্ত সামর্থ্য রয়েছে। রক্ষণেও যে সাহায্য করে…সময়ের সঙ্গে সে বৈশ্বিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠবে, ইতোমধ্যে যদি সে তা না হয়ে থাকে।”
- আলভারো আরবেলোয়া, রেয়াল মাদ্রিড কোচ
“তার প্রতিভা, অনুমান করার ক্ষমতা এবং খেলা বোঝার দক্ষতা দুর্দান্ত: সে জানে কখন খেলার গতি কমাতে হবে, কখন সোজাসুজি আক্রমলে যেতে হবে এবং সে জানে, কীভাবে গোল করতে হয়। তার চেহারায় একটা সরল ভাব আছে, কিন্তু সে খুবই বুদ্ধিমান। আমি তার সঙ্গে কথা বলা উপভোগ করি, তার মাঝে নিজের প্রতিফলন দেখি। তার মেধা আছে, শীর্ষ পর্যায়ে খেলছে এবং অনেক চাপ সামলাচ্ছে।”
- ভিনচেনজো মন্তেল্লা, তুরস্কের কোচ
“তার যে মান, সে ওজিল ও গুতির মিশ্রণ। আর্দার মাঝে বিশেষ একটা কিছু আছে, এমন সহজাত প্রতিভা, যা শেখানো সম্ভব নয়। সে ফুটবলকে অর্থবহ করে তোলে। খেলাটা সত্যিই উপভোগ করে। সে সবসময় বল খুঁজে নিতে চায়, ফ্রি-কিক নিতে চায়…”
- শাবি আলোন্সো, রেয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ
“আমি বিশ্বাস করি, সে অসাধারণ একজন মিডফিল্ডার হয়ে উঠতে পারে। কারণ তার পর্যায়ের খেলোয়াড় খুব কমই আছে।”
- কার্লো আনচেলত্তি, রেয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ
“সে খুবই প্রতিভাবান একজন তরুণ ফুটবলার। তার জাদুকরি স্পর্শ বের্নাবেউয়ের দর্শকরা পছন্দ করে।”
- কিলিয়ান এমবাপে, রেয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড
গিলেরের সম্ভাব্য বিশ্বকাপ অভিযান
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠেয় ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ‘ডি’ গ্রুপে আছে তুরস্ক। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, প্যারাগুয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র।
ভ্যানকুভারে আগামী ১৪ জুন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে তুরস্ক। স্যান ফ্র্যান্সিসকোয় ২২ জুন প্যারগুয়ের মুখোমুখি হবে তারা। গ্রুপ পর্বে তাদের শেষ প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, লস অ্যাঞ্জেলসে ম্যাচটি হবে ২৬ জুন।