রাবিতে ফি আদায়ে ‘সর্বেসর্বা’ বিভাগ, নেই অভিন্ন নীতিমালা
আদায় করা এসব অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয় না বিভাগগুলো।
কেন্দ্রীয় নীতিমালা না থাকায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ও বিভাগে পরীক্ষার ফর্ম পূরণ, মানোন্নয়ন পরীক্ষা ও অন্যান্য খাতে ভিন্ন ভিন্ন হারে ফি আদায় করা হচ্ছে। একই ধরনের পরীক্ষার জন্যও বিভাগভেদে ফির পার্থক্য রয়েছে।
কোথাও কোর্সপ্রতি, কোথাও পরীক্ষার সময় অনুযায়ী আবার কোথাও নির্দিষ্ট অঙ্কে ফি নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে বিভাগ উন্নয়ন, বিভাগ সমিতি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন খাতেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মতে, রাবিতে বর্তমানে ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ রয়েছে। প্রতিবছর এসব বিভাগের শিক্ষার্থীদের নতুন বর্ষে ভর্তির সময় নির্ধারিত কিছু খাতে ফি দিতে হয়।
এসব ফির মধ্যে রয়েছে মাসিক বেতন, গ্রন্থাগার ও সেমিনার পুস্তক ক্রয়, পরিবহন, ছাত্র সংসদ, খেলাধুলা, পত্রিকা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ছাত্রছাত্রী সাহায্য তহবিল, রাবি ক্রীড়া পরিষদ, ছাত্রছাত্রী কল্যাণ তহবিল, রোভার স্কাউট ও রেঞ্জার, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিএনসিসি, টিএসসিসি, গ্রন্থাগার উন্নয়ন, জাতীয় দিবসসহ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস, জোহা দিবস ও বুদ্ধিজীবী দিবস উদযাপন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার সেন্টারে ডাটা সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, ইন্টারনেট সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্বাস্থ্য বীমা।
এ ছাড়া আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হল ফি, সংসদ ফি, খেলাধুলা, ধর্মীয় কার্যক্রম, ছাত্রছাত্রী কল্যাণ তহবিল ও উৎসব ফিও নেওয়া হয়।
তবে এসব নির্ধারিত ফির বাইরে বিভাগগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নামে-বেনামে বিভিন্ন অতিরিক্ত ফি আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নীতিমালা না থাকায় বিভাগগুলো নিজেদের মতো করে এসব ফি নির্ধারণ করে।
তবে আদায় করা এসব অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয় না বিভাগগুলো।
পরীক্ষার ফি নির্ধারণে নেই নীতিমালা
বিভিন্ন অনুষদের বিভাগগুলোর ফর্ম পূরণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিছু বিভাগে তত্ত্বীয় পরীক্ষার ক্ষেত্রে তিন ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য ঘণ্টাপ্রতি ৫০ টাকা এবং তিন ঘণ্টার বেশি সময়ের পরীক্ষায় ঘণ্টাপ্রতি ৬০ টাকা নেওয়া হয়। আবার সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কয়েকটি বিভাগে তিন ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য কোর্সপ্রতি ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুষদ এবং বিভাগ অনুযায়ী এই টাকার পরিমাণে ভিন্নতা দেখা যায়।
মৌখিক পরীক্ষার জন্য অধিকাংশ বিভাগে ৫০ টাকা ফি নেওয়া হয়। তবে ব্যবহারিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিভাগভেদে ফির পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। কিছু বিভাগে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ঘণ্টাপ্রতি ২০ টাকা নেওয়া হলেও চারুকলা অনুষদে ঘণ্টাপ্রতি ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবার কয়েকটি বিভাগে পুরো ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগের ফর্ম পূরণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্রীড়া, বিভাগ উন্নয়ন, ছাত্র কল্যাণ তহবিল, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, টিউটোরিয়াল ও বিবিধসহ বিভিন্ন খাতে প্রতি সেমিস্টারেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থীর ক্লাসে উপস্থিতি ৬০-৭৫ শতাংশ হলে তাকে নন-কলেজিয়েট হিসেবে গণ্য করা হয়। নির্ধারিত জরিমানা দিয়ে এ ধরনের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। উপস্থিতি ৬০ শতাংশের কম হলে শিক্ষার্থীকে ডিস-কলেজিয়েট হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সাধারণত ওই সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, নন-কলেজিয়েট শিক্ষার্থীদের ৫০০ টাকা অতিরিক্ত জরিমানা দিতে হয়। কিছু কিছু বিভাগে এই টাকার পরিমাণ ৬০০-৭০০ টাকাও হয়ে থাকে।
এদিকে ব্যবসায় অনুষদ অধ্যাদেশে নন-কলেজিয়েট ফি এক হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু ব্যবসায় অনুষদের অধীনে থাকলেও ফাইন্যান্স বিভাগ এই নীতিমালা গ্রাহ্য করে না। বিভাগটি নন-কলেজিয়েট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২৫০০ টাকা জরিমানা নেয়।
একই সঙ্গে ডিস-কলেজিয়েট শিক্ষার্থীদের চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগও আছে।
তবে ফাইন্যান্স বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম কামরুজ্জামান বলেন, “নন-কলেজিয়েট শিক্ষার্থীরা কত টাকা ফি দেন আমি জানি না। ডিস-কলেজিয়েট শিক্ষার্থীদের তো পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আমরা দেই না। এটি মিথ্যা অভিযোগ।”
ব্যবসায় অনুষদের ডিনের দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “এসব বিষয়ে আমাকে কেউ এখন পর্যন্ত জানায়নি। আপনার কাছ থেকেই বিষয়টি প্রথম জানলাম। আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে সত্যতা যাচাই করব। যদি কোনো অবৈধ কিছু হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তা চলতে পারে না।”
অন্যদিকে কলা অনুষদের ফার্সি ও ভাষা সাহিত্য বিভাগে বিভাগ উন্নয়ন ফির নামে প্রতি সেমিস্টারে ১ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নোটিশ প্রকাশ করা হয় না। শিক্ষার্থীরা জানান, ব্যাংকে ওই টাকা জমা না দেওয়া পর্যন্ত তারা ফর্ম পূরণের সুযোগ পান না।
এভাবে বছরে দুই সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের এ খাতে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় তারা প্রতিবাদ করতে পারেন না বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা বিভাগের কাছে জিম্মি। প্রতি সেমিস্টারে অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা দেওয়া লাগে। এটা নিয়ে কথা বললেই এর ফলাফল পরীক্ষার খাতায় পড়বে। তাই চোখের সামনে অনিয়ম হতে দেখেও সহ্য করা লাগে।”
তবে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক বেলাল হোসাইন বলেন, “আমি বিষয়টি খোঁজ নেব। কেউ বেশি ফি আদায় করে থাকলে সেটা অযৌক্তিক। আমার অনুষদের সব বিভাগের সভাপতির সঙ্গে বসে একটা নীতিমালা করার চেষ্টা করব।”
মানোন্নয়ন পরীক্ষায় ‘লাগামহীন’ ফি
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সেমিস্টারে পরীক্ষার ফলাফলে কোনো কোর্সে সিজিপিএ ২.৭৫ হলে কিংবা এরচেয়ে কম হলে শিক্ষার্থীরা মানোন্নয়ন পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান। তবে মানোন্নয়নের জন্য পরীক্ষায় বসার ক্ষেত্রেও বিভাগভেদে ফির পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।
বিভিন্ন বিভাগের মানোন্নয়ন পরীক্ষার ফির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ খাতে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় দুই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
সম্প্রতি ফাইন্যান্স বিভাগের প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষার ফর্ম পূরণের বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, মানোন্নয়ন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের বিভাগের সভাপতির নামে এক হাজার ৫০০ টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। এ টাকা জমা দেওয়ার পর প্রতি কোর্সের জন্য আলাদা করে আরও ১০০ টাকা দিতে হয় বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে বিভাগের একাংশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
ফাইন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, “অন্যান্য বিভাগ যেখানে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা নেয়, সেখানে আমাদের দেড় হাজারের বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের আর্থিক চাপ। আমরা বিভাগের কাছে অনেকটাই জিম্মি হয়ে আছি।”
তবে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন পরীক্ষার প্রতি নিরুৎসাহিত করতেই ফি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান ফাইন্যান্স বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম কামরুজ্জামান।
তিনি বলেন, “মানোন্নয়ন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। আমরা এটাকে কিছুটা নিরুৎসাহিত করতে চাচ্ছি। মানোন্নয়ন পরীক্ষার ফি আগে এক হাজার টাকা ছিল, আমরা এটা ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দেড় হাজার টাকা করেছি।”
তবে সভাপতির নামে টাকা জমা দেওয়ার বিষয়টিকে ‘অনৈতিক আখ্যা’ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, “সভাপতির নামে আলাদা কোনো ফান্ড থাকা উচিত নয়। এভাবে অর্থ রাখার বিষয়টি অযৌক্তিক।”
সমিতির নামে ফি আদায়
বিভিন্ন বিভাগের ফর্ম পূরণের বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি সেমিস্টারেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সমিতির নামে নির্দিষ্ট অঙ্কের ফি আদায় করা হয়।
পদার্থবিজ্ঞান, আইন ও ভূমি প্রশাসন, রসায়ন, ম্যানেজমেন্ট, পরিসংখ্যান, উর্দু, দর্শন ও নৃবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিভাগে এ ধরনের ফি নেওয়া হয়। এমনকি কোনো শিক্ষার্থী মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিলেও তাকে পুনরায় এ ফি দিতে হয়।
বিভাগভেদে এ ফির পরিমাণ বছরে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। বিভাগের বিভিন্ন উৎসব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য এ অর্থ নেওয়া হলেও এ নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এক শিক্ষার্থী বলেন, “সমিতির নামে বছরে যে টাকা নেওয়া হয়, সেগুলো নাকি বিভিন্ন জাতীয় দিবস, পিকনিক এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ব্যবহার হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য বাজেট দেওয়া হলেও সমিতির নামেও ফি কেন নেওয়া হচ্ছে, সে প্রশ্ন থেকে যায়।”
প্রশাসন যা বলছে
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের প্রধান অধ্যাপক হাসনাত কবির বলেন, সেমিস্টার পরীক্ষার ফি মূলত বিভাগ থেকেই নির্ধারণ করা হয়। কোর্সের ধরন, প্র্যাকটিক্যাল আছে কি না এ ধরনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ফি নির্ধারণে ভিন্নতা থাকে। অনুষদগুলোর কেন্দ্রীয় নীতিমালা না থাকায় বিভাগগুলোর ফী আদায়ে এ ধরনের ভিন্নতা দেখা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, কোনো বিভাগ তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে ফি নির্ধারণ করলে বিষয়টি আলাদাভাবে দেখতে হবে। তবে পরীক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত অর্থ চাপিয়ে দেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি অনুষদের জন্য এ ধরনের ফি নির্ধারণে একটি অভিন্ন নীতিমালা করা হলে বিষয়টি আরও সুশৃঙ্খল হবে।
কোনো বিভাগ নির্ধারিত নিয়মের চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছে কিনা, সেটিও প্রশাসন খতিয়ে দেখবে বলে জানান তিনি।
