দুই বছরেও সংস্কারবিহীন ‘চেতনা-৭১’, শিক্ষার্থীদের উদ্যোগও থমকে
“বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংস্কারের অনুমতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে ভাস্কর্যটি আগের আদলে ফিরিয়ে আনতে আমি শ্রম ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।”
এক সময় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য ‘চেতনা-৭১’ এর পাদদেশে বসে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, গল্প ও আড্ডা চলত। শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা সেখানে ছবি তুলতেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে ভাস্কর্যটিকে ঘিরে মোমবাতি প্রজ্বলন-সহ নানা কর্মসূচি পালন করা হতো।
তবে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট হামলা ও ভাঙচুরের পর বদলে গেছে সেই চিত্র। দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও ভাস্কর্যটি সংস্কারে উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উল্টো শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে ও সংগ্রহ করা অর্থে সংস্কার করতে চাইলেও প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
ফলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্যটি ক্ষতিগ্রস্ত ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।
সম্প্রতি দেখা যায়, হামলায় জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রের প্রতিকৃতির মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে গেছে। ছাত্র ও ছাত্রীর প্রতিকৃতির পেছনের অংশ এবং পায়ের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত। ‘চেতনা-৭১’ লেখা নামফলকটি বেদি থেকে তুলে ফেলা হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও পরিচর্যা না করায় প্রতিকৃতিতে শ্যাওলা জমে কালচে দাগ পড়েছে। ভাস্কর্যটির চারপাশের মেঝেও অপরিচ্ছন্ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১০ জন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট মধ্যরাতে একদল ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। পরে তারা চেতনা-৭১ এলাকায় গিয়ে ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করে প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে যান
শিক্ষার্থীদের উদ্যোগেও সংস্কার হয়নি
ভাস্কর্যটি ভাঙচুরের পর সংস্কারের উদ্যোগ নেন দুই শিক্ষার্থী। তারা হলেন- ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের অন্তিক চৌধুরী এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের স্থাপত্য বিভাগের মুহতাসিম ফিরদাউস মাহিন।
তারা বলছেন, ২০২৪ সালের অগাস্টের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা জোগাড় করেন। এর মধ্যে ভাস্কর্যটির মূল শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপালকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ওই অর্থ দিয়ে তিনি সংস্কারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনেন এবং মেরামতের জন্য মোল্ড তৈরি করে রাখেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় পাঁচ-ছয় মাস অপেক্ষার পর মোল্ডটি নষ্ট হয়ে যায় । এতে করে সংস্কারের এ উদ্যোগ আর এগোয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
অন্তিক চৌধুরী বলেন, “চেতনা-৭১ ভাস্কর্যটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে এর মূল শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপালের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি জানান, ভাস্কর্যটি মেরামত করতে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগতে পারে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আমরা ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করি। এর মধ্যে ২৫ হাজার টাকা শিল্পীকে দেওয়া হলে তিনি মেরামতের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনেন এবং কাজের প্রস্তুতি নেন।
“কিন্তু তৎকালীন দক্ষিণাঞ্চলের বন্যার কারণে মেরামতের কাজ পিছিয়ে যায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে আমরা তৎকালীন প্রক্টর অফিসে মেরামতের বিষয়ে আবেদন করি। প্রক্টর অফিস থেকে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির সময়ে কাজটি করা সুবিধাজনক হবে। উপযুক্ত সময়ে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলেও জানানো হয়। কিন্তু এরপর আর সাড়া না পাওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।”
তিনি বলেন, “এভাবে কয়েক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি, মেরামতের জন্য কেনা সামগ্রীগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ ও প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও ভাস্কর্যটি সংস্কার করা যায়নি। এখন আমাদের কাছে সংগ্রহ করা অর্থের অবশিষ্ট প্রায় আট হাজার টাকা আছে। ভবিষ্যৎ সংস্কারকাজের জন্য প্রশাসনের কাছে জমা দিতেও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া আরেক শিক্ষার্থী মুহতাসিম ফিরদাউস মাহিনও একই কথা জানান।
প্রশাসন নিজ উদ্যোগে সংস্কার না করলে এখন তাদের পক্ষে কাজটি করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন এই দুই শিক্ষার্থী।
যেভাবে নির্মিত হয় ‘চেতনা-৭১’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও তৎকালীন ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন কমিটির আহ্বায়ক ফেরদৌস হাসান ফাহিম জানান, ২০০৯ সালের ২৬ মার্চ ‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্যটির স্থাপন কার্যক্রম শুরু হয়। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিনি অডিটোরিয়ামের পশ্চিম পাশে শিক্ষার্থীরা একটি অস্থায়ী ভাস্কর্য স্থাপন করেন। পরে ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ভাস্কর্যটিকে স্থায়ী রূপ দিতে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠন করা হয় ‘ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন কমিটি’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে স্থায়ী ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়। এর নকশা করেন নারায়ণগঞ্জের ‘নৃ স্কুল অব স্কাল্পচার’-এর প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপাল। ২০১১ সালের ৩০ জুলাই তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ উদ্দিন আহমেদ ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবন ‘এ’-এর উত্তর-পশ্চিম পাশে তিন রাস্তার মোড়ে অবস্থিত ভাস্কর্যটির বেদি তিনটি ধাপে তৈরি। লাল ও কালো সিরামিক ইটের তৈরি ধাপগুলোর ব্যাস যথাক্রমে ১৫ ফুট, সাড়ে ১৩ ফুট ও ১২ ফুট। প্রতিটি ধাপ ১০ ইঞ্চি উঁচু।
এর ওপর চার ফুট উঁচু মূল বেদিতে বসানো হয়েছে আট ফুট উঁচু দুটি প্রতিকৃতি। ছাত্রের হাতে উঁচু করে ধরা জাতীয় পতাকা এবং ছাত্রীর হাতে সংবিধানের প্রতীক হিসেবে একটি বই রয়েছে।
সাড়া না মেলায় কাজ শুরু হয়নি
এ ভাস্কর্যের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপাল বলছেন, “শিক্ষার্থীরা টাকা সংগ্রহ করে একটা অ্যামাউন্ট আমাকে দিয়েছিল। তখন সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাজটি আর এগোয়নি।
“শিক্ষার্থীদের বলেছিলাম, প্রশাসনের অনুমতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে যেন আমাকে জানায়। ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিতে কাজটি করতে গিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা বিতর্ক তৈরি হোক, তা আমি চাইনি।”
নৃপাল বলেন, “মোল্ডটি এখনো ভালো আছে না-কি নষ্ট হয়ে গেছে, তা দেখতে হবে। নষ্ট হয়ে থাকলে আমি নিজ থেকে তা ব্যবস্থা করব। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংস্কারের অনুমতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে ভাস্কর্যটি আগের আদলে ফিরিয়ে আনতে আমি শ্রম ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।”
দিবসগুলোতে আলোকসজ্জা
ভাস্কর্যটি সংস্কারহীন অবস্থা থাকলেও বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন বড় অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে এটি আলোকসজ্জায় সজ্জিত করতে দেখা যায় বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিকড়ের’ সভাপতি মিনহাজুল ইসলাম বলেন, “চেতনা-৭১ আমাদের ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণকারী একমাত্র স্মারক এবং সিলেট অঞ্চলের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে দুষ্কৃতকারীরা এই ভাস্কর্যে আঘাত করে।
“গত দুই বছরে দেশে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, নির্বাচিত সরকার এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ভাস্কর্যটি আজও দেশবিরোধী হায়েনাদের দেওয়া ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই ভাস্কর্য সংস্কার না হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমরা চাই, এটি দ্রুত সংস্কার করা হোক।”
‘ধাপে ধাপে কাজ হচ্ছে’
ভাস্কর্যটি সংস্কারের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা সংস্কার করা দরকার। ভাস্কর্যটা আমাদের স্বাধীনতার চেতনার অংশ। গত দু-এক বছরে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে সেটার সমাধান পাইনি।
“এটার যেটুকু ক্ষতি হয়েছে, আমার মনে হয়, এটা সংস্কার করা সম্ভব। আমি ইতিবাচকভাবে চিন্তা করছি। দেখি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে খুব শিগগিরই কিছু করা যায় কি-না।”
এ বিষয়ে জানতে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কালাম আহমদ চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি।
উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলছেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান অনেকগুলোই সমস্যা আছে। তার মধ্যে চেতনা-৭১ এটাও একটা। সবগুলো নিয়ে আমরা ধাপে ধাপে কাজ করছি।”
