শার্শায় বিদ্যুৎ ঘাটতির যন্ত্রণা বাড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ে বাড়তি ভোগান্তির জন্য শার্শার স্থানীয়রা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়াকে দায়ী করছে।

আসাদুজ্জামান আসাদ, বেনাপোল প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 August 2022, 02:11 PM
Updated : 5 August 2022, 02:11 PM

বিদ্যুতের ঘাটতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো যশোরের শার্শা উপজেলায়ও লোড শেডিং হচ্ছে। দিনের বিরাট একটা সময় বিদ্যুৎ না পেয়ে মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছে।

বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ে বাড়তি ভোগান্তির জন্য শার্শার স্থানীয়রা ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়াকে দায়ী করছে।

রাত ৮টার পরে বিপণিবিতানগুলো বন্ধ রাখার কথা থাকলেও পুরোপুরি তা কার্যকর হচ্ছে না।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার নানা সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিলেও স্থানীয়রা মনে করেন, এ বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, শার্শা উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ৩০ মেগাওয়াট; কিন্তু পিক আওয়ারে অধিকাংশ সময় সরবরাহ থাকছে ১৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার বাহনগুলোর ব্যাটারিতে যাচ্ছে ৬ থেকে ৮ মেগাওয়াট।

উপজেলা প্রশাসন বা ট্রাফিক বিভাগের কাছে এসব তিন চাকার যানের সংখ্যার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের কারণে গ্রামাঞ্চলে এসব যানবাহনের চলাচল বহুগুণ বেড়েছে।

এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতার চার্জার। আবাসিক মিটারের সংযোগ নিয়েই বাড়িতে গোপনে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর শার্শা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক [ডিজিএম] জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বেনাপোল, শার্শা ও বাগআচড়ায় আমাদের দাপ্তরিক হিসাব মতে প্রায় হাজার খানেক ইজিবাইক আছে। তবে এ হিসাবের বাইরে অনেক ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান আছে। বেনাপোলে ৮/১০টা ইজিবাইক চার্জ স্টেশন আছে। এখান থেকে এসব তিন চাকার যানের চার্জ দেওয়া হয়।”

ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানের সঠিক সংখ্যা বলা মুশকিল জানিয়ে বেনাপোল ইউপি চেয়ারম্যান বজলুর রহমান বলেন, বেনাপোলে ইজিবাইক ও ব্যাটারিভ্যানের সংখ্যা ২ হাজার থেকে ২৩ শর মত হবে। তারা গ্রামীণ সড়কসহ বেনাপোল চেকপোস্ট থেকে বেনাপোল বাজার ও নাভারন বাজার পর্যন্ত চলাচল করে।

বাগআচড়া-নাভারন-বেনাপোল সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেন বলেন, নাভারন এলাকায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশাভ্যান চলাচল করে। গ্রামীণ বিভিন্ন সড়ক ধরে এরা চলাচল করে। নাভারন পুরাতন বাজার থেকে উপজেলা হাসপাতাল মোড় পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চলাচল বেশি। বেশি সংখ্যক ইজিবাইক চলাচল করে মহাসড়কের নাভারন থেকে বেনাপোল পর্যন্ত।

শার্শার ভাইভাই ব্যাটারি এন্ড ইলেকট্রনিক্সের মালিক মুকুল হোসেন বলেন, প্রতিটি ইজিবাইকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি আছে; যার প্রতিটি ২শ অ্যাম্পিয়ারের। অন্যদিকে রিকশাভ্যানে ৪টি ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি ১২০ অ্যাম্পিয়ারের। আর প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট হিসাবে পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট (দিনে বা রাতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা চার্জ দিলে) বিদ্যুৎ খরচ হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, হিসাব অনুযায়ী একটি ইজিবাইকে ২ কিলোওয়াট বিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে। যদি উপজেলায় ৫ হাজার ইজিবাইক থাকে সেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে ১০ হাজার কিলোওয়াট; অর্থাৎ ১০ মেগাওয়াট। আর রিকশাভ্যানে ২৫০ ওয়াট ব্যবহার হয়। যদি ১০ হাজার রিকশা ভ্যান হয় সেখানে বিদ্যুৎ প্রয়োজন আড়াই মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে অন্তত সাড়ে ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।

মহাসড়কগুলোতে এই যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। স্থানীয় নানা শ্রেণির প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় রাস্তায় চলছে এসব যানবাহন।

ভাড়া অন্যান্য যানের চেয়ে তুলনামূলক কম হওয়ার কারণে মূল শহরে এবং তার বাইরে এখন যাত্রীদের প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাভ্যান।

নাভারন হাইওয়ে থানার এসআই আমির হোসেন বলেন, এরা গ্রামীণ সড়কে বেশি চলাচল করে থাকে। গ্রামীণ সংযোগ সড়ক থেকে কিছু ইজিবাইক ও ভ্যান মহাসড়কের আশপাশে থাকলেও এদের সংখ্যা জানা নেই। তবে আগে প্যাডেলচালিত যে ভ্যান ছিল তা আর দেখা যায় না; সবই ব্যাটারিচালিত।

“ইজিবাইক [ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা] মহাসড়কে উঠলে আমরা প্রায় সময়ই অভিযান চালাচ্ছি; জরিমানা করছি। অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া, এটি চলবেই।”

নাভারন ফজিলাতুননেছা মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, যেখানে বিদ্যুতের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে সেখানে এই যানগুলোতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার অপচয় ছাড়া আর কিছুই না। বিদ্যুৎ বিভাগের উচিত এসব যানের বৈধতা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ানো, অথবা সরকারের বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অটোরিকশার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা।

"রাত ৮টার পরে বিপণিবিতানগুলো বন্ধ রাখার কথা থাকলেও সেটাও পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। এটা কার্যকর হলে অন্তত রাতে আবাসিক গ্রাহকরা লোডশেডিংয়ের হাত থেকে উপকৃত হত। অথচ এটাও দেখভালের কোনো লোক নেই।"

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক