সেন্ট মার্টিনের জাহাজ ছাড়তে পারে খুরুশকুলের নতুন জেটি থেকে, কমবে ভোগান্তি
প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি জেটি নির্মাণে করা হচ্ছে; এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
সেন্ট মার্টিনে পর্যটক পরিবহনের জন্য কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাটের বিকল্প হিসেবে খুরুশকুলে নির্মিত নতুন জেটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ- বিআইডব্লিউটিএ।
এতে জোয়ার-ভাটার কারণে জাহাজ চলাচলে বাধা কমার পাশাপাশি পর্যটকদের যাতায়াতও সহজ হতে পারে। তবে নতুন জেটিতে নিরাপত্তা রেলিং স্থাপন এবং যাতায়াতের সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় এখনই সেটি চালু করা যাচ্ছে না।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন জেটির কাজ প্রায় শেষ। তবে জেটির সিঁড়িতে রেলিং না থাকায় যাত্রীদের সাগরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া জেটিতে যাতায়াতের পথে নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে জাহাজ মালিকদের সংগঠন বলছে, নুনিয়াছড়া ঘাটের তুলনায় খুরুশকুলের নতুন জেটি থেকে জাহাজ চলাচল করলে সময় বাঁচবে, জোয়ার-ভাটার সমস্যা থাকবে না এবং একসঙ্গে বেশি যাত্রীর চাপ সামলানো সহজ হবে।
বিআইডব্লিউটিএর চট্টগ্রাম বিভাগ ও কক্সবাজার নদীবন্দরের উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, খুরুশকুলের নতুন জেটি পরিদর্শনে কিছু নিরাপত্তাগত সমস্যা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিঁড়িতে রেলিং না থাকার বিষয়টি অন্যতম।
“সিঁড়িতে রেলিং দেওয়া হয়নি। যাত্রী সাগরে পড়ে গেলে সমস্যা হতে পারে। এসব বিষয়ে কিছু সমস্যা পেয়েছি। আগামীকালের মিটিংয়ে বিষয়গুলো তোলা হবে,” বলেন তিনি।
নতুন জেটির অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে জানিয়ে নয়ন শীল বলেন, “প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ প্রস্তুত। শুধু রেলিংটা হয়ে গেলে ওখান থেকে জাহাজ ছাড়া যাবে।”
তবে নতুন জেটি উদ্বোধনের আগে সেখানে জাহাজ চলাচল শুরু করা যাবে না বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য উদ্বোধনের তারিখ নভেম্বরের মাঝামাঝির কথা শোনা গেলেও সেটি এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানান এই কর্মকর্তা।
নুনিয়াছড়ায় ভাটায় জাহাজ ছাড়তে সমস্যা
এতদিন সেন্ট মার্টিনগামী পর্যটকবাহী জাহাজ কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে চলাচল করে আসছে। কিন্তু এই ঘাটের গভীরতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে জাহাজ চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী গোলাম রব্বানী বলেন, নুনিয়াছড়া জেটিতে জোয়ারের সময় পানির গভীরতা প্রায় ছয় মিটার। ভাটার সময় তা কমে চার মিটারে নেমে আসে। অথচ জাহাজ চলাচলের জন্য প্রয়োজন অন্তত পাঁচ মিটার গভীরতা। তাই ভাটার সময় এখান থেকে জাহাজ ছাড়া যায় না।
অন্যদিকে খুরুশকুলের মহেশখালী চ্যানেলে নির্মিত নতুন জেটিতে জোয়ারের সময় পানির গভীরতা আট মিটার এবং ভাটার সময় ছয় মিটার থাকে। অর্থাৎ ভাটার সময়ও নতুন জেটি থেকে জাহাজ চলাচলের মতো পর্যাপ্ত পানির গভীরতা রয়েছে।
গোলাম রব্বানী বলেন, নুনিয়াছড়া ঘাটের জায়গা তুলনামূলক কম। সেখানে একসঙ্গে অনেক যাত্রীর চাপ সামলানোও কঠিন। অন্যদিকে খুরুশকুলের নতুন জেটিতে জাহাজ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতা রয়েছে।
৫২ কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ প্রায় শেষ
বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী গোলাম রব্বানীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুরুশকুলে দুটি জেটি নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৫২ কোটি টাকা। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়ন করেছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর।
তিনি বলেন, জেটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন কিছু ফিনিশিং কাজ, বিদ্যুৎ ও সোলার লাইট স্থাপন এবং রেলিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে।
তার ভাষ্য, প্রকল্পের প্রায় ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ। প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সম্পন্ন হলেই জেটি ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
জাহাজ মালিকদেরও পছন্দ নতুন জেটি
সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলকারী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুরও খুরুশকুলের নতুন জেটি ব্যবহারের পক্ষে।
তিনি বলেন, “অবশ্যই ভালো হবে। সময় বাঁচবে, জোয়ার-ভাটার সমস্যা থাকবে না। এত লোকের কোনো হ্যাসল থাকবে না।”
তার মতে, নুনিয়াছড়া ঘাটে জোয়ার ছাড়া জাহাজ ছাড়ার সুযোগ নেই। সেখানে একসঙ্গে তিন হাজার ৫০০ পর্যটকের চাপ সামলানো কঠিন। আট থেকে দশটি জাহাজ চলাচল করলেও একটির পর একটি জাহাজ ভিড়তে হয়। এতে যাত্রী ওঠানামায় ভোগান্তি তৈরি হয়।
বাহাদুর বলেন, খুরুশকুলের নতুন জেটি ব্যবহার করা গেলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমবে। তবে নতুন এলাকায় যাতায়াতের পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে জাহাজ মালিকদের পক্ষ থেকে আবেদনও করা হয়েছে।
খুরুশকুলের নতুন জেটিতে পৌঁছাতে আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ফলে পর্যটকদের যাতায়াতের পথে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজার অঞ্চলের পুলিশ সুপার নিশাত অ্যাঞ্জেলা বলেন, জেটি ও জাহাজে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হলে ট্যুরিস্ট পুলিশ তা পালন করতে পারবে। তবে সড়কের নিরাপত্তার দায়িত্ব জেলা পুলিশের।
তিনি বলেন, “আমাদের যদি নিরাপত্তা দিতে হয়, আমরা সেটা জেটিতে দেব, সেখান থেকে জাহাজে দেব। কিন্তু রাস্তায় তো আমরা দেব না।”
জেটি বদলালেই কি সমস্যার সমাধান?
সেন্ট মার্টিনে পর্যটক পরিবহনের জন্য এবার পরিবেশগত ছাড়পত্র, জাহাজের নিরাপত্তা, যাত্রী ধারণক্ষমতা এবং অনলাইন ট্রাভেল পাসের মতো একাধিক শর্ত যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজ চলাচলের ঘাট পরিবর্তনের পরিকল্পনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
খুরুশকুলের নতুন জেটি ব্যবহার করা গেলে নুনিয়াছড়া ঘাটের জোয়ার-ভাটার সীমাবদ্ধতা কাটতে পারে। তবে সেটি চালুর আগে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, সড়কে পর্যটকদের যাতায়াত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক নয়ন শীল জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
ফলে সেন্ট মার্টিনের পর্যটন মৌসুমে শুধু জাহাজ চলাচলের অনুমোদন নয়, কোন ঘাট থেকে পর্যটক পরিবহন করা হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
