১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নুসরাত হত্যা: কারাগারেই জন্ম-বেড়ে ওঠা, মুক্ত বাতাসে ৭ বছরের শিশু মোবাশ্বেরা

২০১৯ সালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

নুসরাত হত্যা: কারাগারেই জন্ম-বেড়ে ওঠা, মুক্ত বাতাসে ৭ বছরের শিশু মোবাশ্বেরা
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে আসে শিশু মোবাশ্বেরা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 15 Sep 2026, 11:57 PM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া আটজন গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি ও মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

মঙ্গলবার দুপুর থেকে পর্যায়ক্রমে তাদের মুক্তি দেওয়া হয় বলে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান।

তিনি বলেন, তার কারাগারে ওই হত্যা মামলায় ১১ জন রয়েছেন। তাদের মধ্যে খালাস পাওয়া সাতজন মুক্তি পেয়েছেন।

তারা হলেন- মো. শামীম, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, আফসার উদ্দিন, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার উদ্দিন রানা, আব্দুর রহিম শরীফ।

অপরদিকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে একই সময় মুক্তি পেয়েছেন কামরুন্নাহার মনি। তার সঙ্গে জীবনের প্রথম কারাগারের বাইরে পা রেখেছে মেয়ে মোবাশ্বেরা। সাত বছরের মোবাশ্বেরার জন্ম ও বেড়ে উঠা কারাগারের ভেতরেই।   

সাত বছর আগে ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রাখে হাই কোর্ট। এ ছাড়া চারজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে ২৪ অগাস্ট বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।

নুসরাতের মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ও তার সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন।

কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘তাদের মুক্তির যাবতীয় কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছালে যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের পর্যায়ক্রমে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।”

আসামিদের মুক্তির খবরে সকাল থেকেই তাদের আত্মীয়-স্বজন কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে অপেক্ষা করতে থাকেন। 

মুক্তিপ্রাপ্ত ইফতেখার উদ্দিন রানার মা হাজেরা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, “আমার ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া আমার ছেলেকে বুকে ফিরে পেয়েছি।”

‘জামা কেটে মোবাশ্বেরার জন্য স্কুলব্যাগ’

নুসরাত হত্যা মামলায় কামরুন্নাহার মনি ২০১৯ সালে যখন গ্রেপ্তার হন তখন তিনি ছিলেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওই অবস্থায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারেই জন্ম হয় মোবাশ্বেরার। মোবাশ্বেরার বয়স এখন সাত। 

কারাগারের বাইরে অপেক্ষা করা স্বজনরা ফুলের মালা ও তোড়া দিয়ে কামরুন্নাহার ও মোবাশ্বেরাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। মায়ের সঙ্গে শিশু মোবাশ্বেরার কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনাটি উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

কারাগারের ফটকে উপস্থিত সাংবাদিকদের কামরুন্নাহার মনি বলেন, “আমার সন্তানের জন্ম জেলখানাতেই। সাতটি বছর জেলাখানাতেই ছিল। জেলাখানাতেই তাকে আমি দ্বিতীয় শ্রেণির বই পড়াচ্ছি। কোরআনের একটি পারা মুখস্ত করিয়েছি, কোরআন পড়ানো শিখিয়েছি। আমার সর্বাত্মক দায়িত্ব পালন করেছি। 

“আমি একটি জামা কেটে তাকে একটি স্কুলব্যাগ বানিয়ে দিয়েছি। ও স্কুলে যেত তিনটি বই নিয়ে। স্কুলব্যাগ কেমন হয় সে তো জানে না। ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতে হয় তা আমি তাকে কারাগারের ভেতর থেকেই শিখিয়েছি।”

এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে কামরুন্নাহার মনি বলেন, “আমার মেয়েকে বাইরে দিয়ে দিলে সে ভালো থাকতো না। সন্তান মা ছাড়া কখনো ভালো থাকে না। বাবা কখনো সন্তানকে ভালো রাখতে পারে না। মা যেভাবে যত্ন করে রাখে, কখনো কেউ রাখে না। মা হচ্ছে একটা চাদর।”

কারাগারের অভ্যন্তরে মোবাশ্বেরার জীবন সম্পর্কে জানতে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মোছা. অলিভা শারমিনের মোবাইল একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। 

আরও পড়ুন:

ফেনীতে নুসরাত হত্যা: হাই কোর্টে ২ জনের ফাঁসি বহাল, ৪ জনের যাবজ্জীবন

যেভাবে নুসরাত হত্যা

নুসরাত হত্যায় আসামিদের কার কী ভূমিকা

নুসরাত হত্যায় ১৬ আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড

নুসরাতের ভিডিও: ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা

সোনাগাজীর ওসি বদলি, মামলার দায়িত্বে পিবিআই

নুসরাতের খাতার পাতায় অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের বর্ণনা

নুসরাতকে বাঁচানো গেল না

অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ‘বৈঠক করে’ নুসরাতের গায়ে আগুন