রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা: জমি আর ‘দাস-ব্রাহ্মণের ব্যবধানের’ কথাও এখন বলছে পুলিশ
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার যদি কারও কাছে আরও কোনো তথ্য থাকে, সেটাও পুলিশ বিভাগকে জানানো হলে তারা সেটা খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাতে পাওয়া তথ্য খতিয়ে দেখার কথা বলেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে রংপুরের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার জন্য আদালতে আবেদন করবেন তারা।
পাশাপাশি গণপতি চক্রবর্তী যে জমি কিনে বাড়ি করেছেন সেই নিয়ে আসামির মধ্যে ক্ষোভ এবং ‘দাস ও ব্রাহ্মণের মধ্যে জাতগত ব্যবধানের’ বিষয়টিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে বলে পুলিশ কমিশনার বলেছেন।
তিনি বলেছেন, “সিদ্ধার্থ দাসের জবানবন্দিতে একটা কথা উঠে এসেছে। তার পূর্বপুরুষদের জমি এরা (গণপতি চক্রবর্তী) কিনেছিল। কথা বলে আমরা একটু এটাও দেখতেছি যে, পূর্বপুরুষদের জমি, শোনা গেছে, একটু বেশি মূল্যে কেনা হয়েছিল। এই জমি কেনাটা তাদের (সিদ্ধার্থ) বংশের শরিকরা হয়ত ভালোভাবে নেয় নাই।
“শরিকরা যারা আছে, তারা সবাই টাকা যেটা পাওয়ার কথা, ওই টাকাটা তারা পায় নাই। এটা নিয়ে তাদের মনের মধ্যে একটা ক্ষোভ থাকতে পারে। এটা আমরা দেখতাছি।”
আবদুল মাবুদ বলেন, “মাছুয়াপাড়ার বেশির লোক হল দাস বংশের। আর স্যাররা (গণপতি চক্রবর্তী) হলেন ব্রাহ্মণের জাত। সেখানে একটু ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ রাস্তাঘাটে দেখা-সাক্ষাত হত, কিন্তু বাসায় আসা-যাওয়া ছিল না। এটা তো তাদের মনের মধ্যে ক্ষোভ থাকতে পারে। এই দুইটা বিষয় আমরা দেখতাছি।”
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার যদি কারও কাছে আরও কোনো তথ্য থাকে, সেটাও পুলিশ বিভাগকে জানানো হলে তারা সেটা খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি আগে রংপুর শহরের বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরে নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। জমিটি ২০১০ সালে কেনা হলেও অনেক পরে সেখানে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
সেই বাড়ির দোতলায় প্রায় তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেনে গণপতি চক্রবর্তী। তবে নিচতলার কাজ এখনো শেষ হয়নি। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি।
শনিবার রাতে ওই বাসা থেকে গণপতি (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
চারজনকে হত্যার এ ঘটনায় রোববার নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
ওই দিন ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাতেই তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়।
মঙ্গলবার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। পুলিশ দাবি করেছে, এই তিনজন ঘটনার রাতে একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
মামলাটির তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে দেওয়া হয়েছে। রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী মামলাটি তদন্ত করছেন।
বৃহস্পতিবার নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, চারজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
দুই আসামি জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবন, বাসার ছাদে অবস্থান, শিক্ষককে হত্যার পর একে একে পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন বলে আবদুল মাবুদের ভাষ্য।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির তথ্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
ময়নাতদন্তে চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মৃতদেহের ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:
