‘মাদক নিয়ে’ টেকনাফে জোড়া খুন: ছেড়ে দেওয়া ‘২ ভুক্তভোগীকে’ সন্দেহ পরিবারের
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশ যে দুজনকে ছেড়ে দিয়েছে, তারাও এই হত্যার সঙ্গে জড়িত।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় দুই যুবককে হত্যার দুদিন পেরিয়ে গেলেও এখনও মামলা হয়নি। তবে এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ইয়াবার চালানকে কেন্দ্র করে এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে সন্দেহ রয়েছে পুলিশের।
এ ঘটনায় আহত অবস্থায় পুলিশ দুজনকে আটক করেছিল। পরে তাদেরকে ঘটনার ‘ভুক্তভোগী’ মনে হওয়ায় পুলিশ ছেড়ে দেয়।
কিন্তু নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশ যে দুজনকে ছেড়ে দিয়েছে, তারাও এই হত্যার সঙ্গে জড়িত।
শুক্রবার দুপুরের পর টেকনাফ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুকান্ত চৌধুরী বলেন, এ ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি। মামলা প্রক্রিয়াধীন।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় একজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। ঘটনার পর একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকালে হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম পানখালী বিলিজার পাড়া ফরেস্ট অফিস ব্রিজসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে কলিম উল্লাহ প্রকাশ কলি (২২) ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
ইলিয়াসের ভাষ্যে, ইয়াবার চালানের কথা
বুধবার টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম পানখালী ও লেচুয়াপ্রাং এলাকার পাহাড়ি এলাকা থেকে মোক্তার কামাল ও আলী আকবর ওরফে আবুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আমতলী এলাকার বাসিন্দা।
এ সময় আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ইলিয়াস ও আলী আহমদকে। তারা একই ইউনিয়নের তুলাতুলি এলাকার বাসিন্দা।
আহত অবস্থায় উদ্ধারের পর ইলিয়াস সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এক লাখ ইয়াবা বহনের জন্য হ্নীলা ও তুলাতলীসহ বিভিন্ন এলাকার আটজনকে নেওয়া হয়েছিল। বিজিবির চেকপোস্ট পার হতে না পারায় পাহাড়ি পথ দিয়ে ইয়াবার চালানটি নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
ইলিয়াসের ভাষ্য, এশার নামাজের সময় ধানক্ষেত থেকে উঠে আসা কয়েকজন লাঠি দিয়ে আঘাত করে তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। বাকি ৭০ হাজার ইয়াবা নিয়ে অন্যরা পালিয়ে মালিকের কাছে পৌঁছে দেন।
এরপর ৩০ হাজার ইয়াবার আত্মসাতের অভিযোগে মঙ্গলবার রাতে মিজান নামের এক ব্যক্তি বিচারের কথা বলে তাদের চারজনকে পাহাড়ি এলাকায় মাদক কারবারিদের কাছে নিয়ে যান বলে দাবি করেন ইলিয়াস।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তাদের মারধর করা হয়। ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে রাতভর নির্যাতনের পর চারজনের চোখ বেঁধে পাহাড় থেকে নামিয়ে একটি অটোরিকশায় তুলে পানখালী এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়।
ইলিয়াসের দাবি, ফেলে যাওয়ার সময় তাদের চোখ না খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে মোক্তার কামাল পানি খুঁজতে এবং প্রস্রাব করতে কিছুটা দূরে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
ইলিয়াস দাবি করেন, তারা আগে এ ধরনের ইয়াবা বহনের কাজ করেননি। সীমান্তের চেকপোস্টে কড়াকড়ি বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে ইয়াবা আনা-নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল মাত্র দুই-তিন দিন আগে।
আর আলী আকবরের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল গহীন পাহাড়ি এলাকা থেকে।
ইলিয়াস যে মিজানের কথা বলেছেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার বাড়ি হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তুলাতলী ২ নম্বর ওয়ার্ডে। তিনি এখন পলাতক রয়েছেন।
নিহত আলী আকবরের ভাই ও মোক্তার কামালের স্ত্রীও ঘটনার সঙ্গে মিজানের জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন।
আলী আহমদ ও ইলিয়াসকে ‘ভুক্তভোগী’ বলছে পুলিশ
ঘটনার পর আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ইলিয়াস ও আলী আহমদকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন টেকনাফ থানার ওসি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি প্রথমে বলেন, তারা ওই ঘটনার ‘ভুক্তভোগী’।
তবে ইয়াবা বহনের কথা স্বীকার করার বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি বলেন, “তাহলে তো ওরাও তো এক ধরনের আসামি?”
তিনি বলেন, বিষয়টি যাচাই করে দেখবেন।
কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে গিয়ে ইলিয়াস নামে কারও চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। পুরুষ ওয়ার্ডের কর্তব্যরত নার্সরা রেজিস্টার খাতা পরীক্ষা করে এ তথ্য জানান।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে টেকনাফ থেকে আলী আহমদ নামে একজনকে শারীরিক আঘাতের ঘটনায় (পুলিশ কেইস) হাসপাতালে আনা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তার চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য রেজিস্টারে রয়েছে। পরে তিনি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষ না করেই ছাড়পত্র ছাড়া চলে গেছেন।
পুলিশ দুই আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার কথা জানালেও হাসপাতালের একজনের চিকিৎসার তথ্য পাওয়া গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, ডেকে নিয়ে হত্যা
নিহত আলী আকবর ওরফে আবুর ভাই মো. আলী বলেন, তার ভাই টমটম চালাতেন। লোভে পড়ে হয়ত প্রথমবারের মত ইয়াবা বহনের কাজে জড়িয়েছিলেন।
“কিন্তু সে কারণে তাকে এভাবে হত্যা করতে হবে কেন?”
ইলিয়াস ও আলী আহমদ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগ করে মো. আলী বলেন, মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে মিজানসহ কয়েকজন তার ভাইকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান।
আবুর স্ত্রীর বরাতে মো. আলী বলেন, “মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে টমটম চালিয়ে বাড়ি ফেরার পর ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আবু। রাত ১২টার দিকে তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সকালে পরিবারের পক্ষ থেকে ফোন করা হলে আবু ফিরে আসবেন বলে মিজানরা জানিয়েছিলেন। পরে দুপুরের দিকে ফেইসবুকে তার হত্যার খবর দেখতে পায় পরিবার।
মো. আলী বলেন, “আমার ভাইকে মারার পেছনে হ্নীলার আবছার রয়েছে। আবছারকে ধরতে হবে।”
নিহত মোক্তার কামালের স্ত্রী ইয়াসমীন আক্তারও হত্যার বিচার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাবার বাড়িতে ছিলেন। স্বামী তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু তাকে নিতে যাওয়ার পথেই আলী আকবর, ইলিয়াস ও মিজানরা ডেকে নিয়ে যান বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাদের আত্মীয় রশিদও সেখানে ছিলেন।
তিনি বলেন, “আমি ফোন করে রশিদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী হয়েছে? তিনি তখন বলেছিলেন, কিছু হবে না, চলে আসবে। আমার স্বামী এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আমি এই হত্যার বিচার চাই।”
তবে মিজান নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে এক ভিডিওতে ঘটনার সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। যদিও সেই ভিডিওটি বিডিনিউজ স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।
