“বিগত কারিকুলামে কিন্তু পরীক্ষার সিস্টেম ছিল না। কিন্তু এখন আবার কারিকুলাম পরিবর্তন হয়ে গেছে। বর্তমান কারিকুলামে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।”
Published : 22 Feb 2025, 02:17 AM
পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা আট বছর আগে বহু কাঙ্ক্ষিত মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার পেলেও যথাযথ সরকারি উদ্যোগের অভাব এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সঠিক দিক-নির্দেশনা না থাকায় তা থেকে খুব বেশি সুফল মিলছে না।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব, শিক্ষার্থীদের বার্ষিক মূল্যায়ন পরীক্ষা না থাকা, একই স্কুলে ভিন্ন ভিন্ন নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তির উল্লেখ না থাকা, কিছুটা শেখার পর শিক্ষাজীবনে প্রয়োগ না থাকাসহ নানা কারণে মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়টি ক্রমে ক্রমে মুখ থুবড়ে পড়ছে।
এমন একটি পদক্ষেপের শুরুতে শিশুদের পাঠদানের জন্য নৃগোষ্ঠীর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটি অন্যতম ও প্রধান আবশ্যক হলেও আদতে তা হয়নি।
খাগড়াছড়ির প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় বলছে, জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৯৫টি। ২০১৭ সাল থেকেই সেখানে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বই প্রণয়নের পাঁচ বছর পর এসে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।
সরকারি হিসাব বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাত্র ৯০ জন শিক্ষককে মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন চাকমা, ৩০ জন ত্রিপুরা ও ৩০ মারমা শিক্ষক। এরপর শিক্ষকদের আর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।
ফলে প্রশিক্ষিত ৯০ জন শিক্ষক যদি তাদের স্কুলে শিশুদের শিক্ষা দেনও, বাকি আরও পাঁচ শতাধিক স্কুলের শিশুদের কে পাঠদান করাবে- সেই প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকরাই।
আড়াই শতাধিক ত্রিপুরা শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নয়মাইল গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চন্দ্র কিশোর ত্রিপুরা বলছিলেন, “২০১৭ সাল থেকে ককবরক, (ত্রিপুরাদের মাতৃভাষা), চাকমা ও মারমা ভাষায় আমাদের এখানে পাঠদান শুরু হয়েছে। প্রতিবছরই আমরা বই পেয়েছি, তবে এ বছর এখনো পাইনি।
“আট বছর আগে মাতৃভাষায় শিক্ষা চালু করা হলেও শিক্ষকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। মূল্যায়নেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। কীভাবে ও কখন পড়াব সেই ব্যাপারে নেই নির্দেশনা। যার কারণে আমরা সঠিকভাবে পাঠদান করতে পারি না। আমরা নিজেরাই যতটুকু জানি, সেটাই ক্লাসে পড়াই। মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা এখনও ভালো করে পড়তে পারছে না।”
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ১৯টি জেলায় নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা নিজস্ব পাঁচটি ভাষায় বই পাচ্ছেন। ১৬টি জেলায় এ কার্যক্রম তদারকি করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের একীভূত শিক্ষা সেল। তিন পার্বত্য জেলার শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণসহ প্রাথমিক শিক্ষার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পার্বত্য জেলা পরিষদের ওপর ন্যস্ত।
একীভূত শিক্ষা সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক রোখসানা পারভীন বলেন, “পার্বত্য তিন জেলায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ তদারকি করে জেলা পরিষদ। তাই নৃগোষ্ঠীর ভাষায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে তারা বলতে পারবেন। একটি জেলায় সম্প্রতি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আর বাকি দুই জেলায় কার্যক্রম চলছে।
“তাদের ট্রেনিং ম্যানুয়াল তৈরি করছে এনসিটিবি। আগামী অর্থবছরে পিইডিপি-৫ বাস্তবায়ন শুরু হলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে।”
নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে এ কর্মকর্তা বলেন, “বিষয়টি জটিল, কোথাও একজন শিক্ষক একটি ভাষায় প্রশিক্ষণ পেলে দেখা যায় ওই স্কুলে মোট চারটি ভাষায় পড়ুয়া শিক্ষার্থী আছেন।”
স্কুলে শিক্ষার্থী তিন জাতিগোষ্ঠীর, শিক্ষক একজন
২০১১ সালের সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, দেশের ১ দশমিক ১০ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর, সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ১৬ লাখ। তাদের বেশিরভাগেরই নিজের ভাষার অক্ষরজ্ঞান নেই। অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষার লিখিত রূপও নেই।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ১৪টি ভাষা রয়েছে বিপন্ন অবস্থায়। অবশ্য আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠগুলোর দাবি, এ সংখ্যা আরও বেশি।
নৃগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষার তাগিদে শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিকে মাতৃভাষায় শিক্ষার উদ্যোগ নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যবই প্রণয়ন শুরু হয়। যদিও পরের পাঁচ বছরে পাঠ্যক্রমে নতুন আর কোনো ভাষা যুক্ত করা যায়নি।
সরকারি হিসাবে, দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের প্রায় ৪০ শতাংশের বাস পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এ ছাড়া রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বেশ কিছু অঞ্চলে তারা আছেন। তবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যাপক জনবসতি না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে নিজের ভাষায় পড়ার সুযোগ কম।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মানিকছড়ি হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবার এখনও বই পৌঁছায়নি। (এ বছর এই চিত্র সব জায়গাতেই।) এই স্কুলে চাকমা ও ত্রিপুরা শিক্ষার্থী আছে। কিন্তু কোনো মারমা শিক্ষার্থী নেই।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রতিভা ত্রিপুরা বলছিলেন, “মাতৃভাষায় শিক্ষার বইগুলো এ বছর এখনও পাইনি। আগের বছরগুলোয় বই পেয়েছি। তবে মাতৃভাষায় পড়ানোর ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হল প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। একটা বিদ্যালয়ে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা সব কমিউনিটির শিক্ষার্থী থাকে।
“আমাদের স্কুলে মারমা শিক্ষার্থী নেই। চাকমা ও ত্রিপুরা শিক্ষার্থী রয়েছে। আমি একজন ত্রিপুরা শিক্ষক হিসেবে ত্রিপুরা শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারি। তবে চাকমা শিক্ষক না থাকায় তাদের পড়ানো সম্ভব হয় না।”
তিনি বলেন, “মাতৃভাষায় পড়াতে গেলে যে স্কুলগুলোতে তিন কমিউনিটির (চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা) শিক্ষার্থী আছে সেখানে যদি তিন সম্প্রদায়ের শিক্ষক থাকে তাহলে তারা আলাদা আলাদা করে পড়াতে পারবে। যদি কমিউনিটি ব্যালেন্স করে শিক্ষক দেওয়া যায়, সেক্ষেত্রে মাতৃভাষায় পাঠদান করা সহজ হয়।
“আরেকটা সমস্যা হল, এনসিটিবির যে কারিকুলাম, সেখানে মাতৃভাষার বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত নেই। কোন সময়ে এটা পড়াব- তাও উল্লেখ নেই। রুটিনে উল্লেখ না থাকার কারণে আমরা চাইলেও এটা পড়াতে পারি না। আমাদের কোনো সময় ক্লাসে ফাঁক থাকলে ওই সময়ে আমরা তাদের মাতৃভাষায় গল্প-কবিতা পড়াই।”
একই কথা বলছিলেন মানিকছড়ি হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ঝর্না চৌধুরী। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশ ত্রিপুরা এবং ১০ শতাংশ মারমা। শিক্ষক না থাকায় মাতৃভাষায় কার্যক্রম চালাতে পারছি না। এত বছর আমাদেরকে বই দিয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত শিক্ষক দেয়নি। এ বছর বইও পাইনি।”
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি থেকে ত্রিপুরা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের লেখক ও জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা ত্রিপুরা বলেন, “একটা স্কুলে মারমা, ত্রিপুরা ও চাকমা তিন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী থাকলে সেই সম্প্রদায় থেকেই শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতে সম্প্রদায়ভিত্তিক নিয়োগ না দিলেও পাঠদানের জটিলতা কাটবে না।
“সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে শুরুতে ভাষা শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। বাইরের দেশে কেবল ভাষা শিক্ষার জন্য আলাদা করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।”
মূল্যায়ন পরীক্ষা না থাকা
শিক্ষার্থীরা সারাবছর যা শিখছে তার কোনো মূল্যায়ন পরীক্ষা নেই; সে কারণে শিশুরা মাতৃভাষায় শিক্ষায় আগ্রহী হয় না বলে মনে করেন শিক্ষকরা। তবে আগে মূল্যায়ন পরীক্ষা না থাকলেও এবার সেটি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
মানিকছড়ি হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রতিভা ত্রিপুরা বলছিলেন, “মাতৃভাষায় পড়ালেও তার কোনো মূল্যায়ন হয় না। সেটা লিখিত হোক বা মৌখিক। যদি মাতৃভাষায় দক্ষতার ওপর মূল্যায়ন থাকত, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাতৃভাষা পড়ার একটা আগ্রহ থাকত, তারা উৎসাহিত হত। অভিভাবকরাও আগ্রহী হতেন।”
নয়মাইল গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জলেশ্বর ত্রিপুরা মনে করেন, ২০১৭ সাল থেকে ক্লাসে ত্রিপুরা ভাষায় চর্চা শুরু হয়েছে। সরকারিভাবে কোনো কার্যক্রম নেই। অর্থাৎ এটি পড়ানো হলেও যারা পড়ছে তাদের মূল্যায়নের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এখানে শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষায় পড়ার আগ্রহ কম।
তিনি বলেন, “সরকার শুধু বই দেয়, কোনো প্রশিক্ষক ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করেনি।”
এখানকার শিক্ষকরা মনে করেন, মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য যে বিদ্যালয়ে যে ভাষার শিক্ষার্থী আছে, সেই বিদ্যালয়ে সেই ভাষার শিক্ষক পদায়নের পাশাপাশি নিজ নিজ মাতৃভাষার উপর প্রশিক্ষিত করা গেলে সরকারের এ উদ্যোগের সফলতা আসবে।
সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় মাতৃভাষার ওপর আমরা বই পেয়েছি। বিভিন্ন স্কুলে বই পাঠানো হয়েছে। তবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণটা নাই। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি আলাপ করেছি, যাতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।”
তিনি বলেন, “বিগত কারিকুলামে কিন্তু পরীক্ষার সিস্টেম ছিল না। কিন্তু এখন আবার কারিকুলাম পরিবর্তন হয়ে গেছে। বর্তমান কারিকুলামে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং সেটা শিক্ষকদের উদ্যোগে নেওয়া হবে।”
শিশুরা কতটুকু শিখছে
খাগড়াছড়ির সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র প্রাচুর্য দেওয়ান। রাঙামাটির একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মাতৃভাষায় বই পেয়েছিল।
প্রাচুর্য বলছিল, “আমি ক্লাস থ্রি-তে বই পেয়েছিলাম। তবে সেসব আমাদের স্কুলে ঠিকমত পড়ানো হয়নি। এখন কিছুই মনে নেই।”
প্রাচুর্যের মা নিপা দেওয়ান বলেন, “স্কুলে ঠিকমত মাতৃভাষার বইগুলো পড়ানো হত না। তাছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে মাতৃভাষার বই নেই। এখন কি আর বাচ্চাদের এত আগের পড়া বর্ণমালা মনে থাকবে?”
খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের চাইহ্লাপ্রু মারমা ও ক্রানুচিং মারমা- দুজনই ২০১৭ সালে সরকার প্রথম যখন প্রাক-প্রাথমিকে বই সরবরাহ করে তখন তারা পাঠ্যপুস্তক পেয়েছিল। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তারা এই বই পড়েছে।
এই দুই শিক্ষার্থী ছেলেবেলায় বিহারেও নিজেদের মাতৃভাষার বর্ণমালা শিখেছে। দুজনই বলছিল, স্কুল আর বিহারের কারণে তাদের এখনও বর্ণমালা মনে আছে।
একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাগুই ত্রিপুরা বলে, “আমাদের স্কুলে সপ্তাহে একদিন মাতৃভাষার বই পড়ানো হত। সংখ্যাগুলো ককবরক (ত্রিপুরা) ভাষায় এখনও লিখতে পারি।”
খাগড়াছড়ি মহাজনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পার্কি চাকমা বলেন, “আমি নিজেই চাকমা বর্ণমালা জানতাম না। পাঁচ দিনের একটা প্রশিক্ষণে চাকমা বর্ণমালা শিখেছিলাম।
“তখন সপ্তাহে দুই দিন শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় বই পড়াতাম। কিন্ত এখন রুটিনে তাদের পাঠদানের জন্য কোনো সময় উল্লেখ নেই। তাহলে শিক্ষার্থীদের কীভাবে পড়াব? দুই বছর ধরে মাতৃভাষায় পড়ানোর কোনো রুটিন নেই। না পড়াতে না পড়াতে আমি নিজেই ভুলে গেছি। আমাদের স্কুল থেকে কেবল আমিই প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম।”
অভিভাবকদের ক্ষোভ
স্থানীয় অভিভাবকরা বলছেন, বই থাকলেও তাদের সন্তানরা মাতৃভাষার বর্ণমালা চেনে না।
দীঘিনালা উপজেলার নয়মাইল গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা গণেশ ত্রিপুরা বলেন, “মাতৃভাষা বই থাকলেও স্কুলে খুব একটা পড়ানো হয় না। বইগুলো ঘরেই থাকে। মাতৃভাষার উপর মূল্যায়ন পরীক্ষা হয় না। আমরা বলতে পারলেও বর্ণমালা না চেনায় বই থাকার পর বাসায় চর্চার সুযোগ পাই না।”
একই কথা বলেন ওই গ্রামের কবিতা ত্রিপুরা।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের বাসিন্দা মঙ্গল বিকাশ চাকমা বলেন, “চাকমাদের নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। কিন্তু স্কুলের চাকমা শিক্ষকরাও চাকমা বর্ণমালা চেনে না। ফলে তারাও পাঠদান করতে পারছেন না।
“প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষকদের পক্ষে শিশুদের মাতৃভাষা পাঠদান করা সম্ভব না। শিক্ষার্থীরা এ কারণে বর্ণমালা চিনছে না। মারমা শিক্ষার্থীদেরও একই অবস্থা। মৌখিকভাবে বলতে পারলেও বর্ণমালা না চেনার কারণে বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার উপরে খুব একটা চর্চা নেই।”
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সমাবেশ চাকমা বলেন, “আমার ক্লাস্টারে ২৫টি বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে সপ্তাহে অন্তত এক বা দুই দিন মাতৃভাষায় পড়ানোর জন্য গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। তবে রুটিনে পাঠদানের কোনো বিষয় উল্লেখ নেই। চাকমা শিক্ষক হলেও চাকমা বর্ণমালা না জানলে তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারবেন না। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।”
আরেক সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কণিকা খীসা বলেন, “মাতৃভাষায় পড়ানোর ক্ষেত্রে বড় সংকট হল জাতীয়ভাবে এনসিটিবি বা জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি থেকে যে রুটিন দেওয়া হয় সেখানে মাতৃভাষায় পাঠদানের কোনো সময়সীমা বলা নেই।”
ফলে রুটিনের বাইরে গিয়ে শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবেন- এমন প্রশ্ন তুলে কণিকা বলেন, “রুটিনে না থাকায় মাতৃভাষা পড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এখন অনেক স্কুলে পড়ায়; আবার অনেক স্কুলে পড়ায় না। সপ্তাহে অন্তত একট দিনও যদি নির্ধারিত থাকত তাহলে শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান করতে পারতেন।”
খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিটি বিষয় ৩৫ মিনিট করে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের গাইড লাইন দেওয়া হয়েছে। মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য একবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য আমি অধিদপ্তরের সভাতেও অনুরোধ করেছি।”
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক রুম্মান তূর্য।]