১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

রান্না ঘর থেকে সিএনজি স্টেশন, কুমিল্লায় গ্যাস সংকটে দুর্ভোগ চরমে

বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে আপাতত গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কোনো সুখবর নেই বলে জানিয়েছে বিজিডিসিএল।

বিডিনিউজ২৪

তানভীর দিপু, কুমিল্লা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2026, 10:25 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

টানা দুই দিন ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছে কুমিল্লা নগরের অধিকাংশ এলাকার বাসিন্দারা। এ ছাড়া মহাসড়কের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও একই সংকট। কোথাও স্বল্পচাপ, আবার কোথাও একেবারেই গ্যাস নেই।

এতে বাসা-বাড়ি কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নাবান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়ছে খরচ ও ভোগান্তি। চাপ বেড়েছে খাবার হোটেলগুলোতেও। তবে লাইনের গ্যাস না পাওয়া অনেক হোটেল হয়ে পড়েছে খাবার শূন্য।

মহাসড়কসংলগ্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় শত শত পণ্যবোঝাই কভার্ড ভ্যান, ট্রাক, লরি ও আঞ্চলিক গণপরিবহন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মহাসড়ক ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। 

গ্যাস-সংকটে ফেনী ও কুমিল্লার আঞ্চলিক সড়কের অধিকাংশ গণপরিবহনও দীর্ঘ বিরতিতে ট্রিপ ছাড়ছে বলে জানিয়েছে চালক ও পরিবহন শ্রমিকরা। এদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে যানবাহনের জন্য ভিড় করে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে হাজারো মানুষকে। 

তবে এ সংকট কাটিয়ে কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে জানে না বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড-বিজিডিসিএল। তাদের ভাষ্য, বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে আপাতত গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কোনো সুখবর নেই।

এদিন দুপুরে নগরীর নজরুল এভিনিউ এলাকার বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া বলেন, ৩১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাদের বাসায় গ্যাস নেই। বাসায় রান্না বন্ধ থাকায় হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড় ও সংকটের কারণে অনেক দোকানেই চাহিদামতো খাবার মিলছে না।

ব্যাংকার আবু সোলায়মান বলেন, বুধবার হোটেল থেকে খাবার এনে খেয়েছেন। কিন্তু আজ সেটিও সম্ভব হয়নি। গ্যাস সংকটে নগরজীবন অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে।

গৃহবধূ সুমাইয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গ্যাস না থাকায় বুধবার ইলেকট্রিক চুলায় কষ্ট করে রান্না করেছি। কিন্তু আজ আবার বিদ্যুৎও নেই। বাধ্য হয়ে বাড়ির উঠানে চুলা বানিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। এভাবে কী চলা যায়?”

গ্যাস সংকটের কারণে খাবার হোটেলগুলোতেও বেড়েছে ক্রেতার চাপ। একটি খাবার হোটেলের ম্যানেজার সোহেল রহমান বলেন, এত কাস্টমার সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ভাত, রুটি থেকে শুরু করে বেকারির বিস্কুট পর্যন্ত বিক্রি করে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তারা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই লেনের পাশে থাকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে শত শত পণ্যবোঝাই কভার্ড ভ্যান, ট্রাক, লরি ও আঞ্চলিক গণপরিবহন গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছে। কোনো স্টেশনেই গ্যাস না পাওয়ায় গাড়ির লাইন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। 

শুক্রবার থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই আবারও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে হঠাৎ করেই গ্যাসচালিত পরিবহন সংকটে পড়ে।

দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার তাজ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে পণ্যবোঝাই গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। সেখানে লরিচালক আবদুল খালেক বলেন, রাতে চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে পণ্য নিয়ে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় ওই স্টেশনে ঢুকলেও গ্যাস পাননি।

তিনি বলেন, “কখন গ্যাস পাব, তা-ও জানি না। সঠিক সময়ে মালামাল নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব কি না, তা-ও জানি না।”

গ্যাস-সংকটের প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনেও। ফেনী ও কুমিল্লার আঞ্চলিক সড়কের অধিকাংশ গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই জেলার যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। কুমিল্লা শহর থেকে বিভিন্ন পথে সিএনজি চলাচল কমে যায়। 

বিকালের পর থেকে ভোগান্তি বাড়তে থাকে জেলা শহরের বিভিন্ন পথে।  বিশেষ করে অফিসগামী কর্মকর্তা, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া রোগীদের ভোগান্তি বেশি হচ্ছে। 

চৌদ্দগ্রাম বাজারে গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষারত ইকবাল হোসেন বলেন, “নিকটাত্মীয় কুমিল্লার একটি হাসপাতালে ভর্তি। তাকে দেখতে যাওয়া জরুরি। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। কিন্তু যাওয়ার মতো কোনো গণপরিবহন পাচ্ছি না। গ্যাস সংকটের কারণে অধিকাংশ গাড়ি বন্ধ।”

গ্যাস সংকটের কারণে গাড়ির খরচ বেড়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘চৌদ্দগ্রাম ট্রান্সপোর্ট’ কভার্ড ভ্যানের মালিক ওবায়েদ পাটোয়ারী। তিনি বলেন, “যে গাড়ি পণ্য নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, তা এখন তিন দিনেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। আমার বেশ কয়েকটি গাড়ির অধিকাংশই গ্যাসের জন্য বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে।”

ফেনী-কুমিল্লা সড়কে চলাচলকারী আঞ্চলিক পরিবহন যমুনা মালিক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, হঠাৎ গ্যাস সংকটে অধিকাংশ গণপরিবহন বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে গাড়ির সংকট তৈরি হয়েছে। গণপরিবহন সংকটে দুই জেলার মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। 

অন্তত গণপরিবহনগুলো সচল রাখার জন্য গ্যাস সরবরাহ যেন অব্যাহত রাখা হয়, সেজন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে তিনি।

গ্যাস সংকট নিয়ে বিজিডিসিএল এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। 

ফলে দেশের অন্য এলাকার মতো বিজিডিসিএলের বিতরণ এলাকাতেও গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

বিজিডিসিএলের আওতাধীন কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেও এর প্রভাব পড়েছে। গ্যাস সংকটের জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহযোগিতা চেয়েছে কর্তৃপক্ষ। সেইসঙ্গে গ্যাস সরবরাহ ও অভিযোগের বিষয়ে ১৬৫১৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সোলায়মান বলেন, গ্যাস সরবরাহ কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, এ মুহূর্তে তিনি তা বলতে পারছেন না। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আপাতত গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কোনো সুখবর নেই। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তাও বলা যাচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কুমিল্লা নগরের কোথাও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।