Published : 19 Jun 2026, 05:03 PM
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইউনিয়নটির বিচ্ছিন্ন গোয়ালপুরী চরে সাত দিনে নদী ভাঙনে অন্তত ৩০টি পরিবার বসতভিটা হারিছেন।
ভাঙন অব্যাহত থাকায় আরও শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারানোর হুমকির মধ্যে আছেন। ভাঙন কবলিত পরিবারগুলোর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনায় নির্ঘুম রাত কাটছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের কড়াল গ্রাসে গোয়ালপুরী চর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বলে জানিয়েছেন যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর।

বাজেট না থাকায় এই মুহূর্তে গোয়ালপুরী চরে নদী ভাঙন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান।
নদী তীরের বাসিন্দারা জানান, ভারতের আসাম সীমান্তঘেঁষা গোয়ালপুরী চরে এক সময় প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস ছিল। দীর্ঘদিনের নদী ভাঙনের কারণে তিন বছরে প্রায় ১৫০টি পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙনকবলিত চরের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। শেষ আশ্রয় টুকু রক্ষায় অনেকে আগেভাগেই ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন, তিন বছর ধরে গোয়ালপুরী চরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ চরের প্রায় অর্ধেক নদী গর্ভে হারিয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় চরটি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, সাত দিনে নতুন করে ৩০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। যেভাবে ভাঙন ধরেছে, তাতে গোয়ালপুরী এলাকায় আরও অন্তত ১০০টি পরিবার যে কোনো সময় গৃহহীন হয়ে পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, “ভাঙনের কারণে এলাকার একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামের কবরস্থান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন বিধ্বংসী রুপ নিয়েছে।”
ভাঙনে বসতবাড়ি হারানো জসীম উদ্দীন বলেন, “জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর নির্মাণ করেছিলাম। কয়েক দিনের ব্যবধানে সব নদীগর্ভে চলে গেছে। তিন দিন থেকে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত আছি। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
নদীতে ঘরবাড়ি হারানো নূর হোসেন বলেন, “ঘরবাড়ি হারানোর পাশাপাশি আমরা খাদ্য সংকটেও পড়েছি। স্ত্রী-সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।”
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন গোয়ালপুরী চরের বাসিন্দা পাষাণ মিয়া, মর্তুজ আলী, কালু মিয়া, খালেক মোল্লা, আশিক মিয়া, আব্দুর রশিদ ও লালচান মিয়াসহ ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবার।

চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ কুড়িগ্রাম জেলার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “ব্রহ্মপুত্র নদে চলমান ভাঙন অব্যাহত থাকলে গোয়ালপুরী চর নদীগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
“বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ক্ষতিগ্রস্তরা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত সহায়তা পান না।”
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান শফিকুল ইসলাম।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “জেলার ৩৬টি পয়েন্টে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি পয়েন্টে কাজ চলমান রয়েছে। বাকি এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
“বাজেট না থাকায় এই মুহূর্তে গোয়ালপুরী চরে ভাঙন প্রতিরোধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে অর্থ বরাদ্দ পাওয়ামাত্রই ভাঙন প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিব।”