১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১ কার্তিক ১৪৩৩

সাতক্ষীরায় যুবককে পিটিয়ে হত্যা: দুদিন পর মামলায় আসামি ২৫০, গ্রেপ্তার ২

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ‘মব’ করে দুই দফা পিটিয়ে শামীমকে হত্যা করা হয় বলে দাবি স্বজনদের।

সাতক্ষীরায় যুবককে পিটিয়ে হত্যা: দুদিন পর মামলায় আসামি ২৫০, গ্রেপ্তার ২

গ্রেপ্তার মোক্তার হোসেন খান এবং আসাদুল ইসলাম মোল্যা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 16 Oct 2026, 05:48 PM

Updated : 16 Oct 2026, 05:48 PM

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলার করা হয়েছে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঘটনার দুই দিন পর বৃহস্পতিবার রাতে নিহতের বড় ভাই ১০ জনের নাম ছাড়াও অজ্ঞাত পরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেন বলে জানিয়েছেন দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন।

মামলার পর শুক্রবার ভোরে উপজেলার সুবর্ণাবাদ ও নাজিরের ঘের এলাকার আলাদা অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়; যারা এজাহারভুক্ত আসামি বলে জানান তিনি।

গ্রেপ্তাররা হলেন- উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের প্রয়াত মাহতাব উদ্দিন খানের ছেলে মোক্তার হোসেন খান (৫৩) এবং নাজিরের ঘের গ্রামের রহিম বক্স মোল্লার ছেলে আসাদুল ইসলাম মোল্যা (৪৬)।

তবে মামলায় প্রধান আসামি উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনীকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪৩) উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমান সানার ছেলে। তার দুটি ছেলে রয়েছে। বড় ছেলের বয়স ১২ বছর এবং ছোট ছেলের বয়স ৭ থেকে ৮ মাস।

শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল সানা বলেন, ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ঘটনায় সঠিক তদন্ত পূর্বক আসামিদের গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির দাবি করেছেন তিনি।

ওসি শাহীন বলেন, ঘটনার শুরু থেকে পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার পর দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

যেভাবে হত্যার শিকার হলেন শামীম

শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র থাকাকালীন বাড়ি ফেরার পথে কয়েক বছর আগে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে আনার পর থেকে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন বলে দাবি স্বজনদের।

শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে শামীমের কথা কাটাকাটি হয়। সেই সময় স্ত্রীকে গালিগালাজও করেন শামীম। তবে ঘটনার সময় স্থানীয় এক ব্যক্তির মোবাইলে ধারণ করা একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ওই অডিওতে শামীম ধর্ম নিয়ে ‘কটূক্তি’ করেছেন দাবি করে ফজলুল হক আমিনী ফেইসবুকে লাইভ করে জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর একদল লোক বাড়ির গেইট ভাঙচুর করে শামীমকে সুবর্ণাবাদ বাজারে নিয়ে মারধর করেন।

পরদিন মঙ্গলবার রাতে শামীম স্থানীয় এক পল্লি চিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তখন একদল লোক শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে আকার পিটুনি দেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

পরে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক সখীপুর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন শামীমকে দেয়ালে আছাড় মারেন এবং বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ফেলে রেখে চলে যান। তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন।

‘মব’ সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে শামীমকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আব্দুল জলিলের।

ফেইসবুকে সরব প্রধান আসামি আমিনী

শামীম নিহতের পর নিজ ফেইসবুকে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন ফজলুল হক আমিনী। এমনকি ঘটনার আগে ফেইসবুক লাইভ ও পোস্ট দিয়ে ‘তৌহিদী জনতা’কে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ফেইসবুক পেইজটি তিনি ‘Fh Ameni’ নামে চালান।

সবশেষ ছয় ঘণ্টা আগে দেওয়া এক পোস্টে আমিনী বলেন, “আমি আপনাদের মাঝে থাকবো না, যে কোন সময় আমাকে এরেস্ট করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন, তামাম বিশ্ববাসী আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও কিছু যায় আসে না যদি আল্লাহ পাক আমাকে মাফ করে দেন, এ যুগের গাজী ইলমুদ্দিন হিসেবে আমাকে এবং এই অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে যেন কবুল করে নেন।

“হে আল্লাহ আমার পরিবারকে আপনার কুদরতি হাতে সোফোরদো করলাম তাদের উপর রহম করুন, সবর করার তৌফিক নসিব করুন, বিশেষ করে আমার বড় পুত্র মাওলানা মুফতি শেখ সাদী ডেঙ্গু পজেটিভ আক্রান্ত তাকে আপনি পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করুন এবং আমাকে ঈমানের উপরে অবিচল রাখবেন আমরণ, আল্লাহুম্মা আমীন।”

এর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে ফেইসবুকে দেওয়া এক অডিও বার্তায় আমিনী বলেন, প্রশাসন তাকে গ্রেপ্তার করলে করবে এবং এর পরিণামে তার জেল-জুলুম বা ফাঁসি হলেও কোনো পরোয়া নেই।

বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার ক্ষোভ

প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও উস্কানির পরেও প্রধান আসামির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সাতক্ষীরা জেলা পর্ষদের সদস্যসচিব মুনির উদ্দিন বলেন, ধর্ম অবমাননার অজুহাতে ফেইসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উস্কানি ছড়িয়ে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটার পরও মূল প্ররোচনাকারী আমিনী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে দেয়ালে আছাড় মারা ও পিটিয়ে হত্যার মতো বর্বরোচিত অপরাধের দায় নিজ মুখে স্বীকার করার পরও তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার না করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।

ঘটনাটিকে রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতা বলে মনে করেন আইন ও শালিস কেন্দ্রের সাতক্ষীরা জেলা শাখার প্রধান সংগঠক মাধব দত্ত।

তিনি বলেন, “একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতাল থেকে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, আর যে লোক মাইকিং বা ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী মব সৃষ্টি করল, সে এখনও আইনের আওতার বাইরে থাকা মানে দেশে ‘মবকে’ প্রশ্রয় দেওয়া।”

ঘটনার পর থেকে শামীমের স্বজনরা আতঙ্কে রয়েছে। আমামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শামীমের ছোট ভাই সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাহসিভ রহমান সাগর বলেন, “তৌহিদী জনতা নামের হামলাকারীদের ভয়ে আমরা প্রচণ্ড ভীত সন্ত্রস্ত। কথা বললে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে; তা থেকে আমাদের রক্ষা করার মতো কেউ নেই।”