Published : 21 Apr 2026, 04:54 PM
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার প্রত্যন্ত পল্লীতে দুই শিশুসহ এক পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যার পেছনে জমি নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধের কথা সামনে আসছে স্বজনদের কথায়।
ঘরে দেয়ালে দলিল চেয়ে ‘খুনিদের’ লেখা একটি বার্তা সেই ধারণাকেই আরো উসকে দিচ্ছে।
এ ঘটনায় নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা, দুই বোন ও ভাগ্নেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।
তবে পুলিশ এখনই কোনো সিদ্ধান্তে আসছে না। নওগাঁর পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।
এ ঘটনায় নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ।
নিহতরা হলেন, ওই গ্রামের নমির হোসেনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২), তার স্ত্রী সুলতানা পপি (২৫), তাদের ছেলে পারভেজ (৯) এবং মেয়ে সাদিয়া রহমান (৩)।
হাবিবুর রহমানের বাবা নমির হোসেন এবং দুই বোন ডালিমা, হালিমা এবং ভাগ্নে সুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে গৃহকর্তা নমির উদ্দিন তার ছেলে হাবিবুর রহমান ও ছেলের বউ পপির পৃথক দুটি ঘর থেকে দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে চিৎকার দিয়ে ওঠেন।
এ সময় প্রতিবেশীরা এসে একটি ঘরে হাবিবুর রহমান এবং পাশের ঘরে পপি ও দুই সন্তানের গলাকাটা দেখতে পান।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গলা কাটা চারটি মরদেহ হেফাজতে নেয়। গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
স্থানীয়রা জানান, নমির হোসেনের পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে। সম্প্রতি তিনি একমাত্র ছেলে হাবিবুর রহমানকে ভিটা বাড়িসহ প্রায় ১০ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। অন্যদিকে পাঁচ মেয়েকে দেন ১০ কাঠা করে জমি। এই জমি বণ্টনকে কেন্দ্র করে ভাই-বোনদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
নিহত পপির মামা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “কিছুদিন আগে জমি নিয়ে বোনেদের সঙ্গে হাবিবুরের দ্বন্দ্ব হয়। এ নিয়ে কয়েকদিন সালিশ হলেও ঘটনার সমাধান হয়নি। বার বার বলার পরও তার বাবা (নমির) এ সমস্যার সমাধান করেননি।”

তিনি অভিযোগ করেন, কয়েকদিন আগে ‘নুডুলসে বিষ মিশিয়ে’ ছেলে-মেয়েসহ তার ভাগ্নিকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার পর তারা সুস্থ হয়।
পপির খালা বলেন, “জমি নিয়ে বিরোধের জেরে পপির ননদ-ভাগ্নেরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের নির্যাতন করছিল। তার জের ধরেই এখন ওদের খুন করা হয়েছে।”
পপি সুলতানার মা সাবিনা বেগম বলেন, “আপনারা আমাকে ন্যায্য বিচার করে দেন। ন্যায্য বিচার, আমি কোনো কিছু চাই না- ওর বাপ শুধু একটা অঘটন ঘটালো আর চারটা কেন খুন করল? ওর বাপ তো বেঁচে আছে, ওই কেন বেঁচে থাকলো? খুন করলে পাঁচজনাকেই খুন করবে।"
তিনি প্রশ্ন তোলেন, "তাহলে এই চারটা লাশ ফেললো আর একটা কেন করলো না কেন? ওকে কেন বাঁচালো? তাহলে এর ভিতর কে করে বাঁচল? আপনারাই বিচার করে দেন আমার।"
পপির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “আমার মেয়ে, জামাই ও নাতি-নাতনিকে যারা হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
এদিকে ওই পরিবারের ঘরের দেয়ালে লেখা দেখা যায় ‘নমির তুই বেঁচে গেলি, দলিল দে। এবার তোর পালা।’
ওই লেখা দেখিয়ে জমির বিরোধের বিষয়টিকেই সামনে আনছেন পপির পরিবারের লোকজন।
তবে অন্য একটি ধারণার কথাও প্রতিবেশীরা বলছেন।
তাদের ভাষ্য, পেশায় গরু ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান সোমবার মান্দার চৌবাড়িয়া হাটে গরু বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। সেই টাকা ডাকাতির উদ্দেশ্যেও এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতে পারে।
এসব বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, “কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটা আমরা তদন্ত ছাড়া বলতে পারছি না। তদন্ত শেষে আমরা জানাব।