Published : 31 Jan 2026, 05:35 PM
বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী ও কুতুবদিয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-২ সংসদীয় আসন।
ভৌগোলিক অবস্থান, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্পের কারণে এই আসনকে দেশের অর্থনীতির ধারক ও বাহক এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম ‘হাব’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে কারণেই এই আসনে বরাবরই ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-২ আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে দুইবারের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুল্লাহ ফরিদ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ।
আলমগীর ফরিদ ধানের শীষ প্রতীক এবং হামিদুর রহমান আযাদ দাড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা জিয়াউল হক এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মাহমুদুল করিমও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
তবে মাঠের প্রচারে মূলত দুই প্রধান প্রার্থীর মধ্যেই ভোটের লড়াই সীমাবদ্ধ এবং এই আসনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে আওয়ামী লীগের ‘ভোট ব্যাংক’ নিয়ে।
‘ভোট ব্যাংকের’ হিসাব
সম্প্রতি নির্বাচনি প্রচারের সময় কালারমারছড়ায় বিএনপির প্রার্থী আলমগীর ফরিদ এবং ধলঘাটায় জামায়াতের প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
আওয়ামী লীগের ‘ভোট ব্যাংক’ কার দিকে যাবে- এমন প্রশ্নে বিএনপির প্রার্থী আলমগীর ফরিদ বলেন, “আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
“যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, গণহত্যা ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের পক্ষে আওয়ামী লীগের ভোট যাবে বলে আমি মনে করি না। সেই ভোট উন্নয়ন ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার আদর্শের প্রতীক ধানের শীষের পক্ষেই আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
তিনি দাবি করেন, মহেশখালীর মোট ভোটার প্রায় ২ লাখ ৮৪ হাজার এবং এখানে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে।
“আগে কিছু ভুল বোঝাবুঝি ছিল। এখন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, কৃষক দল—সবাই ঐক্যবদ্ধ। আমি নির্বাচনে কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছি না।”
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ আওয়ামী লীগের ‘ভোট ব্যাংক’ প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চারটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত একটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও বঞ্চিত এলাকা। মানুষ অতীতের গ্লানি ও ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে এসে পরিবর্তন চায়। প্রচারে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে পাচ্ছি।”
তবে জামায়াতের যুব শাখার মহেশখালী ধলঘাটা ইউনিয়ন সভাপতি মোরশেদ আলী সোহাগ বলছিলেন, “মাঠে-ময়দানে পর্যবেক্ষণ করে দেখছি, সিনিয়র নেতাকর্মীরা সাড়া না দিলেও আওয়ামী লীগের নিচের স্তরের অনেক কর্মী জামায়াতের হামিদ ভাইয়ের পক্ষে সায় দিচ্ছেন।”
ভোটের জোরে অবস্থানের দাবি
নির্বাচনি মাঠে নিজেদের অবস্থান আরও জোরালো করতে দুই প্রধান প্রার্থীই অতীত নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। বিএনপির প্রার্থী আলমগীর ফরিদ বলেন, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনে ভোটের ধারা বরাবরই তার অনুকূলে ছিল।
১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আমি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সিরাজ মোস্তফাকে ১২ থেকে ১৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করি। আর ২০০১ সালে মহেশখালীতে আমাকে ৫৩ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে কুতুবদিয়া পার করে দেওয়া হয়েছিল।”
২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “চারদলীয় জোটের সময় আমি জেলে থাকা অবস্থায় নির্বাচন হয়েছিল। আমাকে জেল থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। তখন যারা নমিনেশন পেয়েছিল, তারা এমপি হলেও এলাকায় একটি ইটও বসাতে পারেননি।”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আলমগীর ফরিদ বলেন, “আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ৩৯ লাখ মামলা মাথায় নিয়ে নির্বাচনে এসেছি। অনেক নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছে, আমাকে ২৩ মাস জেলে থাকতে হয়েছে। তারপরও মানুষ বিএনপির পাশে আছে।”
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অতীতে সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় তিনি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে চাইলেও সেই সময়ে ভিন্ন সরকার ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “আমি যখন সংসদ সদস্য ছিলাম, তখন মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি থাকায় দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারিনি। অল্প যে সময় সুযোগ পেয়েছি, তখন মাতারবাড়ী-কুতুবদিয়া ফেরিঘাট, বেড়িবাঁধসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন করা গেছে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতে বড় পরিকল্পনা ছিল। জনগণের সমর্থন পেলে সেগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।”
‘কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছি না’
নির্বাচনে কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছেন কি না- এমন প্রশ্নে আলমগীর ফরিদ বলেন, “না, আমি কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছি না। বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, কৃষক দল- সবাই এখন ঐক্যবদ্ধ।”
তিনি বলেন, “খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এবং তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে দেওয়া আট দফা কর্মসূচি- ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষি কার্ড এসব মানুষের মধ্যে নতুন আশার আলো সৃষ্টি করেছে। মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় মানুষ সেই আশার দিকেই তাকিয়ে আছে।”
আর হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ থাকবে, চ্যালেঞ্জ থাকলেই তো আনন্দ। কোথাও কোথাও অপপ্রচার ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে। এসব বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। মানুষ এখন সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ।”
ভোটের মাঠে নজর
নির্বাচনি প্রচারে দুই প্রধান প্রার্থীই নিয়মিত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
মহেশখালীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহবুব রোকন বলেন, এবার কক্সবাজার-২ আসনে ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ‘ভোট ব্যাংকের’ অবস্থান; যা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কৌতূহল ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ আসন
১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে জহিরুল ইসলাম এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য হন মোহাম্মদ ইসহাক বি.এ। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এ টি এম নুরুল বাশার চৌধুরী জয়ী হন। একই বছরের জুন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলমগীর ফরিদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের হামিদুর রহমান আযাদ জয়ী হন। পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আশেক উল্লাহ রফিক টানা তিনবার জয়ী হয়ে এই আসন থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন।
ভোটার ও জনসংখ্যা
২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলার মোট জনসংখ্যা পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ১২২ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৮৬ হাজার ৮৫১ জন। এর মধ্যে মহেশখালীতে দুই লাখ ৮২ হাজার ৯৩২ জন এবং কুতুবদিয়াতে এক লাখ চার হাজার ৯১৯ জন ভোটার রয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত কক্সবাজার-২ আসনে ভোটের ফল নির্ধারণে উন্নয়ন, অতীত অভিজ্ঞতা এবং আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের অবস্থান- এই তিনটি বিষয়ই মুখ্য হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।