Published : 29 Mar 2026, 06:58 PM
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দিন দিন বাড়ছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চলতি মাসে এ রোগে আক্রান্ত ১০৬ জন ভর্তি হয়েছেন; তাদের মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
অত্যন্ত ছোঁয়াচে এ রোগের পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। গঠন করা হয়েছে বিশেষ মেডিকেল টিম এবং চালু করা হয়েছে পৃথক চিকিৎসা কর্নার।
হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২৪ মার্চ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাম রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে।
শিশু বিভাগের তিনটি কক্ষকে ‘হাম কর্নার’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি কক্ষে দশটি করে শয্যা রয়েছে, যেখানে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, “মার্চের ১৭ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত ১৩ দিনে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত
১০৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মোট পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে; তারা সবাই শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে দুই শিশু।”

শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, “হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় আক্রান্তদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখা ও সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।
“হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণ রোগীদের থেকে হাম আক্রান্তদের আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপাতত তিনটি পৃথক কক্ষে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে নেত্রকোণার কলমাকান্দার কামরুল ইসলামের ছেলে কাজলের চিকিৎসা চলছে। এক সপ্তাহ আগে শিশুটিতে ঠান্ডা, সর্দি ও জ্বর দেখা দেয়। স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে যত্ন নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বাবা এক বছর বয়সী কাজলকে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
কামরুল ইসলাম বলেন, “তিন দিন আগে ছেলের শরীরে হাম দেখা দেয়। শুক্রবার হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছি। এখন চিকিৎসা চলছে। আশা করছি শীঘ্রই সে ভালো হবে।”
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার কলাদিয়া গ্রামের শাহানাজ বেগম তার সাড়ে আট মাস বয়সী ছেলে মুসার পাশে বসে ছিলেন আনমনে। শনিবার তিনি ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন।
শাহানাজ বলছিলেন, “ছেলের জন্মের পর সবগুলো টিকা দিয়েছি, কিন্তু এরপরও হাম বের হল এটা বুঝতে পারছি না। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেছি।”
হামকে সাধারণত অনেকে সাধারণ জ্বর-ঠান্ডা মনে করে অবহেলা করলেও এর পরবর্তী জটিলতাগুলো শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডাক্তার বিজন কুমার।
এ চিকিৎসক বলেন, “হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
“হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে ও মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় ও মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যেও নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ অন্যান্য লক্ষণগুলো রয়েছে।”
শিশু বিভাগের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, “হামের টিকা নিয়েছে এবং নেয়নি-দুই ধরণের রোগীই আমরা পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে আইসিইউতে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি হয়নি।
“কয়েকমাস ধরে এক-দুজন রোগী পাওয়া গেলেও এ (মার্চ) মাসেই বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তিনটি পৃথক কর্নার করা হয়েছে। কৃষক নার্স এবং কর্মচারীরা সাধ্যমত চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।”
৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিট-২ এর নার্স মোমেনা খাতুন হাসপাতালের নথিপত্র ঘেঁটে চলতি মাসে ভর্তি হওয়া হাম আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান জানিয়েছেন। চলতি ১৮ মার্চ থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের তথ্য তারা পৃথকভাবে সংরক্ষণ করছেন।
নার্স মোমেনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মার্চ ওয়াজকুরুনী নামে চার মাস বয়সী এক শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। শিশুটি জেলার গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকা থেকে এসে ভর্তি হয়েছিল ১৫ মার্চ। ২৬ মার্চ ময়মনসিংহ নগরের নওমহল এলাকায় তনুসা নামে তিন বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন সামিয়া নামে দুই বছর বয়সী আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এই শিশুটি পুলিশ লাইন্স এলাকা থেকে এসেছিল।
শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আক্তারুজ্জামান বলেন, “সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধিরা হাসপাতালে এসে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করছেন। তবে হঠাৎ করে হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”
শিশুদের টিকাদানে ‘ঘাটতি’ থাকা একটি কারণ হতে পারে বলে ধারণা এ চিকিৎসকের।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, “হাম আক্রান্ত রোগী হঠাৎ করে বেড়েছে। আগে এ ধরণের রোগী কখনোই দেখা যায়নি। স্বাস্থ্য সেবা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমরা তিনটি আলাদা কর্নার চালু করেছি, যাতে সাধারণ রোগীদের সংস্পর্শে না যায়। এ রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসুক আমরা সেটা চাই।”
তবে ব্যাপকভাবে হলে আইসোলেশনের জায়গা বাড়ানো হবে জানান তিনি।